জলেশ্বর-পুত্র স্বপ্নেশ্বরও বোধহয় নব্যন্যায়ের গ্রন্থ রচনা করিয়াছিলেন।
আনুমানিক খ্রীষ্টীয় পঞ্চদশ শতকের শেষভাগের লেখক কাশীনাথ বিদ্যানিবাস ‘তত্ত্বমণিবিবেচন’ নামক একখানি গ্রন্থ রচনা করিয়াছিলেন; ইহা উল্লিখিত ‘তত্ত্বচিন্তামণি’র টীকার প্রত্যক্ষখণ্ডের অংশমাত্র।
এই যুগের শ্রীনাথ ভট্টাচার্য চক্রবর্তী, বিষ্ণুদাস বিদ্যাবাচস্পতি, পুণ্ডরীকাক্ষ বিদ্যাসাগর, পুরুষোত্তম ভট্টাচার্য, কবিমণি ভট্টাচার্য, ঈশান ন্যায়াচার্য, কৃষ্ণানন্দ বিদ্যাবিরিঞ্চি এবং শূলপাণি মহামহোপাধ্যায় (বঙ্গীয় স্মৃতিনিবন্ধকার?) প্রভৃতিও নব্যান্যায়ের গ্রন্থ রচনা করিয়াছিলেন বলিয়া গ্রন্থান্তরে সন্ধান পাওয়া যায়; কিন্তু ইঁহাদের কোন গ্রন্থ আবিষ্কৃত হয় নাই।
খ্রীষ্টীয় পঞ্চদশ শতকের শেষার্ধে (?) আবির্ভূত রঘুনাথ ছিলেন যুগন্ধর পুরুষ। ‘তত্ত্বাচিন্তামণি’র প্রত্যক্ষ, অনুমান ও শব্দখণ্ডের উপর, রঘুনাথ-রচিত টীকার নাম যথাক্রমে প্রত্যক্ষমণিদীধিতি’, ‘অনুমানদীধিতি’ এবং ‘শব্দমণিদীধিতি’। তাঁহার অন্যান্য গ্রন্থের নাম ‘আখ্যাতবাদ’, ‘নঞবাদ’, ‘পদার্থখণ্ডন’, ‘দ্রব্যকিরণাবলীপ্রকাশদীধিতি’, ‘গুণকিরণাবলীদীধিতি’, ‘আত্মতত্ত্ববিবেকদীধিতি’, ‘ন্যায়লীলাবতীপ্রকাশদীধিতি’, ‘কৃতিসাধ্যতানুমান’, ‘বাজপেয়বাদ’ ও ‘নিযোজ্যান্বয়বাদ’।
শিরোমণি-যুগের অপর একজন উল্লেখযোগ্য নৈয়ায়িক জানকীনাথ খ্রীষ্টীয় পঞ্চদশ শতকে আবির্ভূত হইয়াছিলেন। ‘ন্যায়সিদ্ধান্তমঞ্জরী’ ও ‘আম্বীক্ষিকীতত্ত্ব’ বিবরণ জানকীনাথ-রচিত। প্রথমোক্ত গ্রন্থে তিনি স্বরচিত মণিমরীচি ও ‘তাৎপর্যদীপিকা’র উল্লেখ করিয়াছেন।
জানকীনাথের শিষ্য কণাদ তর্কবাগীশের গ্রন্থ ‘ভাষারত্ন’ এবং ‘তত্ত্বচিন্তামণি’র অনুমানখণ্ডের টীকা; প্রথমোক্ত গ্রন্থে তিনি স্বরচিত ‘তর্কবাদাৰ্থমঞ্জরী’র উল্লেখ করিয়াছেন।
শিরোমণি-উত্তর যুগে বঙ্গীয় নৈয়ায়িকগণের প্রতিভার তেমন সমুজ্জ্বল স্ফুরণ দেখা যায় না। এই যুগকে টীকা-যুগ ও পত্রিকা-যুগে বিভক্ত করা যায়। এই যুগে মৌলিক গ্রন্থ যে রচিত হয় নাই, তাহা নহে; তবে শিরোমণি-যুগের গ্রন্থাবলীর ন্যায় ইহারা উচ্চকোটির নহে। টীকা-যুগের লেখকগণের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হরিদাস ন্যায়ালঙ্কার ভট্টাচার্য, কৃষ্ণদাস সার্বভৌম, রামভদ্র সার্বভৌম, শ্রীরাম তর্কালঙ্কার, ভবানন্দ সিদ্ধান্তবাগীশ, গুণানন্দ বিদ্যাবাগীশ, মথুরানাথ তর্কবাগীশ, জগদীশ তর্কালঙ্কার এবং গদাধর ভট্টাচার্য চক্রবর্তী। ইঁহাদের মধ্যে শেষোক্ত লেখকত্রয় বিশেষভাবে প্রসিদ্ধি লাভ করিয়াছেন।
মোটামুটিভাবে খ্রীষ্টীয় সপ্তদশ শতকের মধ্যভাগ হইতে উনবিংশ শতকের প্রথম দর্শক পর্যন্ত কালকে পত্রিকা-যুগ বলা যায়। এই যুগের নৈয়ায়িকগণের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল মথুরানাথ, জগদীশ ও গদাধরের সর্বাধিক প্রচলিত গ্রন্থসমূহে অনুপপত্তি উত্থাপন করিয়া তাঁহার সমাধান। তাঁহাদের এইরূপ রচনাগুলি পত্রিকা নামে পরিচিত। পত্রিকাগুলি প্রধানতঃ শিরোমণির দীধিতি’ গ্রন্থ অবলম্বনে রচিত হইলেও অনুমানখণ্ডের চর্চ্চাই এগুলিতে প্রাধান্য লাভ করিয়াছে। এই যুগেও কিছু কিছু টীকা-টিপ্পনী রচিত হইয়াছিল।
খ্ৰীষ্টীয় পঞ্চদশ শতকেই কাশীধামে নব্যন্যায়চর্চ্চার সূত্রপাত করেন বাঙালী নৈয়ায়িক। তদবধি বহু বাঙালী নৈয়ায়িক যুগে যুগে ভারতীয় সংস্কৃতির এই কেন্দ্রে জীবনযাপন করেন ও গ্রন্থাদি প্রণয়ন করেন। ইঁহাদিগকে প্রধানতঃ তিন সম্প্রদায়ে বিভক্ত করা যায়; যথা–প্রগল্ভ-সম্প্রদায়, শিরোমণি-সম্প্রদায় এবং চূড়ামণি সম্প্রদায়।
‘প্রশস্তপাদভাষ্যে’র উপর প্রসিদ্ধ নৈয়ায়িক জগদীশ-রচিত টীকার নাম ‘দ্রব্যসূক্তি’। গুণসূক্তি’ নামক টীকাও জগদীশ-রচিত বলিয়া সন্ধান পাওয়া যায়। কেহ কেহ মনে করেন, তর্কামৃত’ নামক বৈশেষিক প্রকরণ গ্রন্থখানি জগদীশের রচনা। ময়মনসিংহ জিলার চন্দ্রকান্ত তর্কালঙ্কার (১৮৩৬-১৯০৯ খ্রী) বৈশেষিক দর্শন সম্বন্ধে তত্ত্বাবলি’ নামক পদ্যগ্রন্থ ছাড়াও কণাদের বৈশেষিক দর্শনের এবং উদয়নের কুসুমাঞ্জলি’র টীকা রচনা করিয়াছিলেন। গঙ্গাধর কবিরাজ (১৭৯৮ ১৮৮৫ খ্রী) বৈশেষিক সূত্রের ভাষ্য রচনা করিয়াছিলেন।
মহামহোপাধ্যায় রামকৃষ্ণ ভট্টাচার্যের মীমাংসাগ্রন্থের নাম ‘অধিকরণকৌমুদী’। ইনি খ্রীষ্টীয় পঞ্চদশ শতকের পূর্ববর্তী লেখক নহেন। খ্রীষ্টীয় অষ্টাদশ শতকের আদিভাগের চন্দ্রশেখর বাচস্পতির ‘ধর্মদীপিকা’ ও ‘তত্ত্বসংবোধিনী’ নামক দুইখানি মীমাংসাগ্রন্থ আছে। আনুমানিক খ্রীষ্টীয় ষোড়শ শতকের কাশীবাসী নৈয়ায়িক রঘুনাথ বিদ্যালঙ্কার মীমাংসারত্ন’ নামক গ্রন্থে প্রমাণ ও মেয়ের আলোচনা করিয়াছেন।
কিম্বদন্তী এই যে, সাংখ্যদর্শনের প্রবর্তক কপিল ছিলেন বাংলা দেশের গঙ্গা সাগরসঙ্গমবাসী। নৈয়ায়িক জলেশ্বর বাহিনীপতি-পুত্র স্বপ্নেশ্বরের সাংখ্যগ্রন্থের নাম ‘সংখ্যাতত্ত্বকৌমুদীপ্রভা। সাংখ্যকারিকা’র উপর সাংখ্যবৃত্তিপ্রকাশ’ (বা ‘সাংখ্যতত্ত্ববিলাস’) এবং ‘সাংখ্যকৌমুদী’ যথাক্রমে তর্কবাগীশ ও রামকৃষ্ণ ভট্টাচার্য রচিত। শ্রীনাথ ভট্টাচার্যের নামাঙ্কিত গ্রন্থ সাংখ্যপ্রয়োগ’। নদীয়ারাজ কৃষ্ণচন্দ্রের সভা-পণ্ডিত রামানন্দ রচনা করেন সাংখ্যপদার্থমঞ্জরী’, ভট্টপল্লীর পঞ্চানন তর্করত্ত্ব ‘সাংখ্যকারিকা’র ‘পূর্ণিমা’ নামক ব্যাখ্যার রচয়িতা। খ্রীষ্টীয় ষোড়শ-সপ্তদশ শতকের বিজ্ঞানভিক্ষুর নামাঙ্কিত গ্রন্থ সাংখ্যপ্রবচনভাষ্য’ ও ‘সাংখ্যসার’। সাংখ্যসূত্রের টীকাকার অনিরুদ্ধ কাহারও কাহারও মতে বল্লালসেনের গুরু, কেহ বা তাহাকে খ্রীষ্টীয় ষোড়শ শতকের লেখক বলিয়া মনে করেন। গঙ্গাধর কবিরাজ সাংখ্যসূত্রের ভাষ্য রচনা করেন।
