রঘুনন্দন সশ্রদ্ধভাবে যাহাদের নামোল্লেখ করিয়াছেন, ‘রায়মুকুট’ উপাধিধারী বৃহস্পতি তাঁহাদের অন্যতম। রাজা গণেশের পুত্র যদু বা জলালুদ্দীনের সমকালীন বৃহস্পতি খ্রীষ্টীয় পঞ্চদশ শতকের প্রথমভাগে তাঁহার স্মৃতিরত্নহার ও ‘রায়মুকুটপদ্ধতি’ নামক গ্রন্থদ্বয় রচনা করিয়াছিলেন।
শ্রীনাথ আচার্যচূড়ামণি ছিলেন রঘুনন্দনের অধ্যাপক। শূলপাণির কতক গ্রন্থের, জীমূতবাহনের ‘দায়ভাগ’-এর এবং নারায়ণ-রচিত ছন্দোগ-পরিশিষ্টপ্রকাশ এর টীকা ছাড়াও শ্রীনাথ বহু নিবন্ধ রচনা করিয়াছিলেন; নিবন্ধগুলির নামের অন্ত ভাগ হিসাবে এইগুলিকে ‘অর্ণব’-বর্গ, ‘দীপিকা’-বর্গ, ‘চন্দ্রিকা’-বর্গ ও ‘বিবেক’-বর্গে শ্রেণীভুক্ত করা যায়। তাঁহার ‘কৃত্যতত্ত্বার্ণব’ ও ‘দুর্গোৎসববিবেক’ সমধিক প্রসিদ্ধ।
বঙ্গের স্মার্তকুলতিলক নবদ্বীপ-গৌরব রঘুনন্দন ১৫০০ হইতে ১৬০০ খ্রষ্টাব্দের অন্তর্বর্তী লেখক। প্রসিদ্ধ অষ্টাবিংশতিতত্ত্ব ছাড়াও তিনি ‘দায়ভাগটীকা’, ‘তীর্থতত্ত্ব’ ‘যাত্ৰাতত্ত্ব’, ‘গয়াশ্রাদ্ধপদ্ধতি’, ‘রাসযাত্ৰাপদ্ধতি’, ‘ত্রিপুষ্করশান্তিতত্ত্ব’ ও ‘গ্রহযাগতত্ত্ব’ নামক গ্রন্থসমূহ রচনা করিয়াছিলেন। আলোচ্য বিষয়সমূহের বৈচিত্র্যে এবং ন্যায় ও মীমাংসাশাস্ত্রের সাহায্যে সূক্ষ্ম বিচার বিশ্লেষণে এই ‘স্মার্ত ভট্টাচার্য’ ছিলেন অদ্বিতীয়।
বাগড়ি (= ব্যাঘ্রতটী) নিবাসী গোবিন্দানন্দ কবিকঙ্কণাচার্য ছিলেন সম্ভবত রঘুনন্দনের সমসাময়িক অথবা কিঞ্চিৎ পূর্ববর্তী। ‘দানক্রিয়াকৌমুদী’, ‘শুদ্ধিকৌমুদী’, শ্রাদ্ধক্রিয়াকৌমুদী’ ‘বর্ষক্রিয়াকৌমুদী’ ও ‘ক্রিয়াকৌমুদী’ নামক নিবন্ধাবলী ছাড়াও গোবিন্দানন্দ শূলপাণির ‘প্রায়শ্চিত্তবিবেক’-এর ‘তত্ত্বার্থকৌমুদী’ এবং শ্রীনিবাসের ‘শুদ্ধিদীপিকা’র অর্থকৌমুদী নামক টীকা রচনা করিয়াছিলেন। শূলপাণির ‘শ্রাদ্ধবিবেকে’র একখানি টীকাও সম্ভবত গোবিন্দানন্দ রচনা করিয়াছিলেন।
রঘুনন্দন ও গোবিন্দানন্দের পরে এই দেশে স্মৃতিশাস্ত্রের অবনতির সূত্রপাত হয়। বিভিন্ন স্থানে রক্ষিত পুঁথিসমূহ হইতে মনে হয়, সত্তর জনেরও অধিক সংখ্যক লেখক এই যুগে নিবন্ধ বা টীকা রচনা করিয়াছিলেন। এই সকল গ্রন্থে বিশেষ কোন মৌলিকতার পরিচয় নাই; ইহাদের মধ্যে কতক পূর্ববর্তী নিবন্ধসমূহের, বিশেষত রঘুনন্দনের প্রখ্যাত নিবন্ধাবলীর সারসংকলন অথবা টীকা-টিপ্পনী। কোন কোন গ্রন্থে আছে অশৌচাদির ব্যবস্থা বা বিভিন্ন অনুষ্ঠানের পদ্ধতি। এই যুগের নিবন্ধকারগণের মধ্যে উল্লেখযোগ্য গোপাল ন্যায়পঞ্চানন। ইঁহার রচিত গ্রন্থসমূহের সংখ্যা অষ্টাদশ এবং নাম ‘নির্ণয়ান্ত’; যথা-‘অশৌচনিৰ্ণয়’, ‘সম্বন্ধনির্ণয়’ ইত্যাদি। টীকাকারগণের মধ্যে সবিশেষ উল্লেখের দাবি রাখেন কাশীরাম বাচস্পতি এবং শ্রীকৃষ্ণ তর্কালঙ্কার; কাশীরাম রঘুনন্দনের অনেক তত্ত্বে’র টীকা করিয়াছেন এবং শ্রীকৃষ্ণ জীমূতবাহনের দায়ভাগে’র এবং শূলপাণির শ্রাদ্ধবিবেক’-এর টীকা রচনা করিয়াছেন।
দত্তকপুত্র-সংক্রান্ত ব্যাপারে বাংলা দেশে ‘দত্তকচন্দ্রিকা’ নামক গ্রন্থখানি সর্বাপেক্ষা প্রামাণিক বলিয়া গণ্য হয়। ইহা কুবেরের নামাঙ্কিত; এই কুবের সম্ভবত রঘুনন্দনের পূর্ববর্তী। কেহ কেহ মনে করেন যে, গ্রন্থখানি অর্ব্বাচীন এবং নদীয়ায় রাজগুরু রঘুমণি বিদ্যাভূষণ কর্ত্তৃক রচিত; এই গ্রন্থের অন্তিম শ্লোকের প্রথম ও দ্বিতীয় পংক্তির আদ্য ও অন্ত বর্ণগুলি একত্র করিলে ‘রঘুমণি’ নামটি পাওয়া যায়।
২
নব্যন্যায় ও দর্শনশাস্ত্রের অন্যান্য শাখা
বাঙালীর বহুমুখী মনীষা দর্শনশাস্ত্রের কঠিন আবরণ ভেদ করিয়া উহার গভীরে প্রবেশ করিতে প্রয়াসী হইয়াছিল; এই কথা অবশ্য নব্যন্যায়ের ক্ষেত্রেই সর্বাধিক প্রযোজ্য, দর্শনের অন্যান্য শাখায় বাঙালীর কীর্তি তেমন উল্লেখযোগ্য নহে।
প্রাচীন ন্যায় ও নব্যন্যায়ের প্রভেদ এক কথায় বলিতে গেলে এই যে, প্রথমটি পদার্থশাস্ত্র এবং দ্বিতীয়টি প্রমাণশাস্ত্র। নব্যন্যায়ে প্রত্যক্ষাদি প্রমাণের সংজ্ঞা বা লক্ষণ অব্যাপ্তি, অতিব্যাপ্তি ও অসম্ভব প্রভৃতি দোষমুক্ত করিবার উদ্দেশ্যে লেখকগণ ছিলেন সতর্ক। প্রমাণসমূহের স্বরূপ বিশ্লেষণে তাঁহারা সূক্ষ্ম বিচারশক্তির পরিচয় দিয়াছেন।
বাংলার নবান্যায়ে নবদ্বীপের রঘুনাথ শিরোমণি সর্বাধিক প্রসিদ্ধি লাভ করিয়াছিলেন। তাঁহাকে কেন্দ্রস্থলে রাখিয়া এই শাস্ত্রকে তিনটি যুগে বিভক্ত করা যায় : প্রাক্-শিরোমণি যুগ, শিরোমণি-যুগ ও শিরোমণি-উত্তর যুগ। এই দেশে নব্যন্যায়ের চর্চ্চা কত প্রাচীন তাহা ঠিক বলা যায় না। প্রাক্-শিরোমণি যুগে যাহার নাম আমরা সর্বপ্রথম জানিতে পারি তিনি বিখ্যাত বাসুদেব সার্বভৌম। আনুমানিক খ্রষ্টীয় পঞ্চদশ শতকের তৃতীয় দর্শকে তাঁহার জন্ম হয়। তিনি উৎকলরাজ পুরুষোত্তমদেব ও প্রতাপরুদ্রদেবের সভা-পণ্ডিত ছিলেন। পুরীতে চৈতন্যের সঙ্গে সার্বভৌমের বেদান্ত সংক্রান্ত বিচারের উল্লেখ আছে কৃষ্ণদাস কবিরাজের ‘‘চৈতন্যচরিতামৃতে’ (মধ্যলীলা–ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ)। বাসুদেবের ‘অনুমানমণি পরীক্ষা’ মৈথিল গঙ্গেশের ‘তত্ত্বচিন্তামণি’র অনুমানখণ্ডের টীকা।
বাসুদেব সার্বভৌমের পুত্র জলেশ্বর বাহিনীপতি মহাপাত্র ভট্টাচার্য সম্ভবত খ্রীষ্টীয় পঞ্চদশ শতকের শেষভাগে জন্মগ্রহণ করিয়াছিলেন। তাঁহার ‘শব্দালোকোদ্দ্যোত’ পক্ষধর মিশ্রের ‘শব্দালোকে’র টীকা।
