হোসেন শাহের রাজত্বকাল ১৪৩৯ হইতে ১৫১৯ খ্রীষ্টাব্দ। ইহার পূর্বেই চণ্ডীদাসের পদাবলী, কৃত্তিবাসের বাংলা রামায়ণ, বিজয় গুপ্তের মনসামঙ্গল এবং মালাধর বসুর ‘শ্রীকৃষ্ণবিজয় বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করিয়াছে। বিপ্রদাস পিপিলাই হোসেন শাহের রাজত্ব লাভের দুই বৎসরের মধ্যে তাঁহার মনসামঙ্গল রচনা করেন। সুতরাং মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যের যে তিনটি প্রধান বিভাগ-অনুবাদ সাহিত্য, মঙ্গলকাব্য ও বৈষ্ণব পদাবলী–তাঁহার প্রতি বিভাগেই উৎকৃষ্ট কাব্য হোসেন শাহী আমলের পূর্বেই রচিত হইয়াছে। সুতরাং বাঙালী কবির সৃজনীশক্তি যে হোসেন শাহের পূর্বেই রুদ্ধ হইয়াছিল, এরূপ মনে করিবার কোন কারণ নাই। পদাবলী-সাহিত্য ও অনুবাদ-সাহিত্য যে চণ্ডীদাস ও কৃত্তিবাসের হাতে চরম উন্নতি লাভ করিয়াছিল, তাহাতে সন্দেহ নাই। মঙ্গলকাব্যের মধ্যে যে দুইখানি বিজয় গুপ্তের মনসামঙ্গল অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ বলিয়া গ্রহণ করা যাইতে পারে তাঁহার মধ্যে একখানি-মুকুন্দরামের চণ্ডীমঙ্গল কাব্য-হোসেন শাহী বংশের অবসানের ৬০/৭০ বৎসর পর, এবং আর একখানি-ভারতচন্দ্রের ‘অন্নদামঙ্গল–তাঁহারও দেড়শত বৎসর পরে রচিত হইয়াছিল। সুতরাং হোসেন শাহী শাসনের আশ্রয়েই যে বাংলা সাহিত্যের চরম উন্নতি হইয়াছিল এই উক্তির সপক্ষে কোন যুক্তিই নাই।
এই উক্তির পর চৈতন্য এবং বৈষ্ণব ধর্ম ও পদাবলীর উল্লেখ করিয়া অধ্যাপক হবীবুল্লাহ্ আরও বলিয়াছেন যে হোসেন শাহের রাজত্বের মত উদার ও পরধর্ম সহিষ্ণু শাসন না থাকিলে বৈষ্ণব ধর্ম্মের অভ্যুদয় ও প্রসার এবং এই যুগে বাংলার সাংস্কৃতিক নব-জাগরণ (Renaissance) সম্ভবপর হইত না। হোসেন শাহের রাজত্বে নবদ্বীপের কাজী বৈষ্ণব ভক্তগণের প্রতি কিরূপ অত্যাচার করিয়াছিলেন। এবং চৈতন্যদেব যে কাজীর বিরুদ্ধে লড়াই করিয়াই বৈষ্ণবধর্ম্মের একটি প্রধান অঙ্গ হরিনাম সংকীর্তন প্রচলিত করিতে পারিয়াছিলেন, তাহা পূর্বেই বলা হইয়াছে। [এই অধ্যায়ের ‘বাস্তব জীবনে ধর্ম ও নীতি’ অংশে আলোচিত] হোসেন শাহের মন্ত্রী ও পারিষদেরা যে তাঁহার ভয়ে চৈতন্যদেবকে রাজধানী গৌড়ের সান্নিধ্য ত্যাগ করিয়া যাইতে বাধ্য করিয়াছিলেন, তাঁহারও উল্লেখ করা হইয়াছে। [এই অধ্যায়ের ‘বাস্তব জীবনে ধর্ম ও নীতি’ অংশে আলোচিত] আর ইহাও বিশেষভাবে স্মরণ রাখিতে হইবে যে শ্রীচৈতন্যদেব দীক্ষার পরে চব্বিশ বৎসর (১৫১০-৩৩ খ্রী) জীবিত ছিলেন–ইহার মধ্যে সর্বসাকুল্যে পুরা একটি বছরও তিনি হোসেন শাহী রাজ্যে অর্থাৎ বাংলা দেশে কাটান নাই। তাঁহার পরম ভক্ত ও হোসেন শাহের পরম শত্রু উড়িষ্যার পরাক্রান্ত স্বাধীন রাজা প্রতাপরুদ্রের আশ্রয়েই তিনি অবশিষ্ট জীবনের বেশির ভাগ সময় কাটাইয়াছেন।
এই সমুদয় মনে রাখিলে সহজেই বুঝিতে পারা যাইবে যে অধ্যাপক হবীবুল্লাহর উক্তি এত অসার ও সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন যে তাহা আলোচনার যোগ্য নহে। তথাপি একটি বিশ্ববিদ্যালয় হইতে প্রকাশিত এবং আচার্য যদুনাথ সরকার কর্ত্তৃক সম্পাদিত বাংলার ইতিহাসের কোন উক্তিই অগ্রাহ্য করা যায় না। কারণ সাধারণ লোকে যে বিনা বিচারে তাহা সত্য বলিয়া মানিয়া লইবে ইহা অস্বাভাবিক বা আশ্চর্যের বিষয় নহে। এই জন্যই নিতান্ত অসার হইলেও অধ্যাপক হবীবুল্লাহর উক্তির বিস্তৃত সমালোচনা করিতে বাধ্য হইয়াছি।
১৪. সংস্কৃত সাহিত্য
চতুর্দ্দশ পরিচ্ছেদ – সংস্কৃত সাহিত্য
মধ্যযুগীয় বাংলা দেশের সংস্কৃত সাহিত্যকে নিম্নলিখিত কয়েকটি শ্রেণীতে বিভক্ত করা যাইতে পারে :
(ক) স্মৃতিশাস্ত্র, (খ) নব্যন্যায় ও দর্শনশাস্ত্রের অন্যান্য শাখা, (গ) তন্ত্র, (ঘ) কাব্য, (ঙ) নাট্যসাহিত্য, (চ) পুরাণ, (ছ) গৌড়ীয় বৈষ্ণবদর্শন, ধর্মতত্ত্ব ও ভক্তিতত্ত্ব, (জ) অলঙ্কার, ছন্দ, নাট্যশাস্ত্র ও বৈষ্ণবরসশাস্ত্র, (ঝ) ব্যাকরণ, (ঞ) অভিধান, (ট) বিবিধ।
১
স্মৃতিশাস্ত্র
বাংলার মধ্যযুগীয় সংস্কৃত সাহিত্যের প্রধান কীর্তিস্তম্ভ তিনটি,–নব্যস্মৃতি, নব্যন্যায় এবং তন্ত্র। বাংলা দেশের স্মৃতিনিবন্ধকারগণের মধ্যে সর্বাধিক প্রসিদ্ধ রঘুনন্দন; তিনি স্মার্ত ভট্টাচার্য নামে সুধীসমাজে সুপরিচিত। তাঁহার পরেও এই দেশে বহু স্মৃতিকার জন্মিয়াছিলেন; তবে তাঁহাদের রচিত গ্রন্থাবলী তেমন প্রসিদ্ধ নহে এবং বিশেষ কোন মৌলিক চিন্তার সাক্ষ্য বহন করে না। বঙ্গীয় প্রসিদ্ধ স্মৃতিকারগণের গ্রন্থে, বিশেষত রঘুনন্দনের অষ্টাবিংশতি তত্ত্বে, স্বাধীন চিন্তা ও সূক্ষ্ম বিচার বিশ্লেষণের পরিচয় পাওয়া যায়। এই দেশের স্মৃতিনিবন্ধগুলিতে অসংখ্য স্মৃতিকার ও স্মৃতিগ্রন্থের উল্লেখ আছে; তন্মধ্যে অনেক স্মৃতিকার মৈথিল। বঙ্গীয় স্মৃতি সম্প্রদায়ের ন্যায় মৈথিল স্মৃতিসম্প্রদায়ও সবিশেষ প্রসিদ্ধি লাভ করিয়াছিল এবং এই উভয় সম্প্রদায়ের মধ্যে পারস্পরিক প্রভাব বিদ্যমান। স্মৃতিশাস্ত্রের আলোচ্য বিষয় প্রধানত তিনটি–আচার, প্রায়শ্চিত্ত ও ব্যবহার। এই সকল বিষয়েই বঙ্গীয় পণ্ডিতগণ স্মৃতি-নিবন্ধ রচনা করিয়াছিলেন। তাঁহাদের মধ্যে কেহ কেহ প্রাচীন স্মৃতির উল্লেখযোগ্য টীকাও রচনা করিয়াছিলেন।
‘সাহুড়িয়ান’ শূলপাণি প্রাক-রঘুনন্দন যুগের অন্যতম খ্যাতনামা স্মৃতিনিবন্ধকার। তিনি সম্ভবত চতুর্দ্দশ শতকের শেষ পাদে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁহার গ্রন্থসমূহের নাম ‘বিবেক’-অন্ত। তাঁহার বিবিধ-বিষয়ক গ্রন্থাবলীর মধ্যে ‘প্রায়শ্চিত্তবিবেক’ ও ‘শ্রাদ্ধবিবেক’ সমধিক প্রসিদ্ধ। যাজ্ঞবল্ক্য-স্মৃতির ‘দীপকলিকা’ নামক টীকা শূলপাণির নামাঙ্কিত।
