এই সম্বন্ধে যে লৌকিক কাহিনী প্রচলিত আছে তাহাতে বিশ্বাস করিয়া হিন্দু ও মুসলমান উভয়েই বিপদ হইতে মুক্তি ও ভবিষ্যৎ মঙ্গল কামনায় সত্যনারায়ণ ও সত্যপীরের পূজা দিবে ইহা অস্বাভাবিক নহে। ধর্মসমন্বয় অর্থাৎ দু ধর্ম্মের মিশ্রণের ফলে নূতন ধর্মমতের প্রবর্তনের সঙ্গে ইহার কোন সম্বন্ধ নাই। আজিকার দিনেও এমন বহু গোঁড়া হিন্দু পুরোহিত ডাকিয়া নিয়মিত সত্যনারায়ণের পূজা করেন, যাঁহারা মুসলমানের সঙ্গে কোন ধর্ম বা সামাজিক সম্বন্ধের কথা শুনিলে শিহরিয়া উঠিবেন।
প্রাচীনকালে অর্থাৎ ১২০০ খ্রীষ্টাব্দের পূর্বে হিন্দুধর্ম্মের যাহা মূল নীতি ছিল, অর্থাৎ দেবদেবীর মূর্ত্তি পূজা ও তদানুষঙ্গিক অনুষ্ঠান, বেদ, পুরাণ প্রভৃতি ধর্মশাস্ত্রে অচল বিশ্বাস, ব্রাহ্মণ পুরোহিতের সাহায্যে শাস্ত্রের বিধান মত পূজাপার্ব্বণ, অন্তে বৃষ্টিক্রিয়া ও শ্রাদ্ধ, এবং ভগবান, পরলোক, জন্মান্তর, কর্মফল, অদৃষ্ট, স্বর্গ, নরক ইত্যাদিতে বিশ্বাস, দেবদ্বিজে ভক্তি ইত্যাদি, ১৮০০ খ্রীষ্টাব্দে ঠিক তাহাই ছিল। যদি কিছু যোগ বা পরিবর্তন হইয়া থাকে যেমন নূতন বৈষ্ণব মত, সহজিয়া মত ও নূতন লৌকিক দেবতার পূজা, ব্ৰতানুষ্ঠান প্রভৃতি–তাহাও কালের পরিবর্তনেই হইয়াছে, ইসলামের প্রভাবে নহে। হিন্দু সমাজ সম্বন্ধেও এই কথা খাটে। হিন্দু সমাজের প্রধান প্রধান বৈশিষ্ট্য–কঠোর জাতিভেদ ও অস্পৃশ্যতা, স্ত্রীলোকের বাল্যবিবাহ, বিধবা-বিবাহ নিষেধ, বাল্য-বিধবার দুর্দশা ও কঠোর জীবনযাত্রা, কৌলীন্যপ্রথা, সতীদাহ, স্বামীর সম্পত্তিতে অনধিকার-সকলই পূর্ববৎ ছিল। এই সকল দোষত্রুটি মুসলমান সমাজে ছিল না এবং প্রতিবেশী মুসলমানদের দৃষ্টান্তে এইগুলির অনৌচিত্য ও অপকারিতা হিন্দুর মনে প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করিবে, ইহাই স্বাভাবিকভাবে প্রত্যাশা করা যায়। কিন্তু কার্যতঃ তাহা হয় নাই। অপরদিকে সর্ব ধর্মই যে সত্য এবং মুক্তির সোপান, হিন্দুর এই উদার ধর্মমত মুসলমান গ্রহণ করে নাই।
ভক্ষ্য, পানীয়, ভোজনপ্রণালী, বিবাহাদি লৌকিক সংস্কার ও অনুষ্ঠান বিষয়ে হিন্দুর উপর মুসলমানের বিশেষ কিছু প্রভাব লক্ষ্য করা যায় না। যাহারা দরবারে যাইতেন তাঁহাদের পোশাক-পরিচ্ছদ কতকটা মুসলমানী ধরনের ছিল, কিন্তু বাংলা দেশের বিরাট হিন্দু সমাজে ইহার প্রভাব স্থান ও সংখ্যায় খুবই সীমাবদ্ধ ছিল। প্রকৃত সংস্কৃতির সহিত ইহার সম্বন্ধ এতই ক্ষীণ যে ইংরেজেরা এদেশে আসিবার পর মুসলমানী পোশাকের বদলে বিলাতী পোশাকেরই চল হইল। আজ বাঙালী হিন্দুদের পোশাকের মধ্যে মুসলমানী প্রভাব বিশেষ কিছুই লক্ষ্য করা যায় না। হিন্দুর উপর মুসলমানের অনেক ছোটখাট প্রভাব হিন্দুরা এই পোশাকের ন্যায়ই ত্যাগ করিয়াছে। আজ আর তাঁহার চিহ্ন নাই। কারণ সেগুলি সংস্কৃতি নহে, তাঁহার বহিরাবরণ মাত্র। কিন্তু যদিও হিন্দুরা মুসলমানদের প্রভাব হইতে আত্মরক্ষা করিয়াছে, মুসলমানেরা যে হিন্দুর প্রভাব এড়াইতে পারে নাই তাহা পূর্বেই বলা হইয়াছে। ইহার প্রধান কারণ বাঙালী মুসলমানদের অনেকেই ধর্ম্মান্তরিত হিন্দু বা তাহাদের বংশধর। সুতরাং হিন্দুর ধর্ম ও সামাজিক সংস্কার তাহারা একেবারে ত্যাগ করিতে পারে নাই এবং তাহাদের সঙ্গে ইহার কতকগুলি মুসলমান-সমাজেও গৃহীত হইয়াছে। কিন্তু এই হিন্দু প্রভাবের ফলে যে ইসলাম-সংস্কৃতির মৌলিক কোন পরিবর্তন ঘটিয়াছে, এরূপ মনে করিবার কোন কারণ নাই।
এই প্রসঙ্গে উল্লেখ করা আবশ্যক যে অনেকে মনে করেন মুসলমান সুলতান ও ওমরাহের উৎসাহেই বাংলা সাহিত্য প্রতিষ্ঠা লাভ করিতে সমর্থ হইয়াছে। দুইটি বাস্তব ঘটনার উল্লেখ করিলেই এই ধারণার অসারতা প্রতিপন্ন হইবে।
প্রথমতঃ, বাংলা দেশে প্রায় ছয় শত বৎসর ব্যাপী মুসলমান রাজত্বে মুসলমান সুলতান ও তাঁহাদের অনুচরের মধ্যে বাংলা সাহিত্যের পৃষ্ঠপোষক যাহাদের নাম জানা গিয়াছে, তাহাদের সংখ্যা ছয় জনের বেশি নহে।
দ্বিতীয়তঃ, মধ্যযুগে কেবল বাংলায় নহে ভারতের সকল প্রদেশেই–এমন কি যেখানে মুসলমানদের আধিপত্য ছিল না এবং মুসলমান সুলতানের পৃষ্ঠপোষকতার কোন উল্লেখ পাওয়া যায় না, সেইসব প্রদেশেও স্থানীয় কথ্যভাষা সাহিত্যের ভাষায় উন্নীত হইয়াছিল।
সুতরাং বাংলার মুসলমান সুলতানদের অনুগ্রহ না হইলে যে বাংলা সাহিত্যের প্রতিষ্ঠা হইত না এরূপ মনে করিবার কোন যুক্তিসঙ্গত কারণ নাই। আর দেশের রাজা দেশের সাহিত্যিককে উৎসাহ দিবেন ইহাই স্বাভাবিক। ইহা না করিলে প্রত্যবায়, করিলে অত্যধিক প্রশংসার কোন কারণ নাই।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হইতে প্রকাশিত ইংরেজীতে লিখিত বাংলার ইতিহাস দ্বিতীয় ভাগে (History of Bengal, Vol. II.) সুলতান হোসেন শাহের বংশ সম্বন্ধে অধ্যাপক হাবীবুল্লাহ্ যে উক্তি করিয়াছেন, তাঁহার প্রথম অংশের সারমর্ম এই যে-উক্ত বংশের উদার শাসননীতির আশ্রয়েই বাঙালীর যে সাহিত্যিক প্রতিভা এতদিন রুদ্ধগতি হইয়াছিল তাহা অবরোধমুক্ত হইয়া বেগবতী নদীর মত প্রবাহিত হইয়াছিল এবং চরম উন্নতি লাভ করিয়াছিল। [Thus was a new dynasty established under whose enlightened rule the creative genius of the Bengali people reached its zenith. It was a period in which the vernacular found its due recognition as the literary medium through which the repressed intellect of Bengal v’as to find its release.
* * *
With this renaissance, the rulers of the house of Husain Shah are inseparably connected. It is almost impossible to conceive of the rise and progress of Vaishnavism or the development of Bengali literature at this period without recalling to mind the tolerant and enlightened rule of the Muslim Lord of gaur (The History of Bengal, published by the University of Dacca, Vol. II. pp. 143-44)]
