আরও যে কয়েকটি যুক্তির অবতারণা করা হয় তাহা অকিঞ্চিৎকর। হিন্দু ও মুসলমান উভয়েই উভয় সম্প্রদায়ের সাধুসন্ত পীর ফকিরকে শ্রদ্ধা করিত। ইহা হইতে অনেকে হিন্দু-মুসলমানের ধর্ম্মের সমন্বয়ের কল্পনা করিয়াছেন। বাস্ত বিকপক্ষে এইরূপ শ্ৰদ্ধার কারণ ইহাদের অলৌকিক ক্ষমতায় বিশ্বাস। বিপদে পড়িলে লোকে নানা কাজ করে, সুতরাং আধিব্যাধি ও সমূহ বিপদ হইতে ত্রাণ বা ভবিষ্যৎ মঙ্গলের আশায় সাধারণ লোক অর্থাৎ হিন্দু-মুসলমান উভয়েই সাধু ও পীরদের সাহায্য প্রার্থনা করিত এবং তাহাদের দরগায় শিরনি মানিত। ইহা মানুষের একটি স্বাভাবিক প্রভৃত্তি। ইহাতে ধর্মসমন্বয়ের কোন প্রশ্নই উঠে না। হিন্দুরা মুসলমান পীরকে ভক্তি করিত, কিন্তু গৃহের মধ্যে ঢুকিতে দিত না এবং তাহাদের সৃষ্ট পানীয় বা খাদ্য গ্রহণ করিত না। নবাব মীরজাফরের মৃত্যুশয্যায় নাকি তাঁহাকে কিরীটেশ্বরী দেবীর চরণামৃত পান করান হইয়াছিল। এই ঘটনাটিও হিন্দু মুসলমানের মিলনচিহ্নস্বরূপ ব্যাখ্যাত হইয়াছে। বাঁচিয়া উঠিলে হয়ত তিনি ঐ দেবীর মন্দিরটিই ধ্বংস করিতেন। তাঁহার অনতিকাল পূর্বে নবাব মুর্শিদকুলী খান উহার নিকটবর্তী অনেক মন্দির ভাঙ্গিয়া মসজিদ নির্মাণ করিয়াছিলেন এবং ইহা মীরজাফরের জীবিতকালেই স্মৃটিয়াছিল। মুসলমানেরা হোলি খেলিত এবং হিন্দুরা মহরমের শোভাযাত্রায় যোগ দিত, ইহা স্বাভাবিক কৌতূহলের ও আমোদ-উৎসবের প্রবৃত্তির পরিচয় দেয়। ইহাতে ধর্মমত পরিবর্তনের কোন চিহ্ন খুঁজিতে যাওয়া বিড়ম্বনা মাত্র। আর কোটি কোটি মুসলমানদের মধ্যে একজন কি দুইজন হিন্দু দেবদেবীর পূজা করিলে তাহা ব্যক্তিগত উদারতার পরিচয় হইতে পারে, কিন্তু হিন্দু-মুসলমান ধর্ম্মের সমন্বয় সূচিত করে না। পূর্বে উল্লিখিত মুসলমান কর্ত্তৃক হিন্দুর মন্দির ধ্বংস ও ধর্ম্মানুষ্ঠানে বাধা দেওয়ার অসংখ্য কাহিনী ও সমসাময়িক বর্ণনা সত্ত্বেও যাঁহারা ধর্ম্মের ক্ষেত্রে হিন্দু-মুসলমানদের মধ্যে সমন্বয়ের বা সম্প্রীতির প্রমাণ খুঁজিয়া বেড়ান, এই শ্রেণীর কতকগুলি দৃষ্টান্ত ছাড়া স্মরণ রাখিতে হইবে যে সত্যনারায়ণ ও সত্যপীরের কাহিনী অনেকটা এক হইলেও এখন পর্যন্তও হিন্দুরা তাহাদের অন্যান্য ধর্ম্মানুষ্ঠানের ন্যায় সত্যনারায়ণকে পূজা করে আর মুসলমানেরা অন্যান্য পীরের ন্যায় সত্যপীরকে শিরনি দেয়। সত্যপীরের পূজা তাঁহারা একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ বলিয়া মনে করেন। সুতরাং এ বিষয়ে একটু বিস্তারিত আলোচনা প্রয়োজন।
মধ্যযুগে হিন্দুরা যেমন সাধুসন্তদের ভক্তি করিতেন এবং কখনও কখনও তাঁহাদের পূজা করিতেন, মুসলমানেরাও সেইরূপ সুফীদরবেশদিগকে ভক্তি করিতেন এবং কোন কোন স্থলে তাহাদিগকে অলৌকিক শক্তিসম্পন্ন মনে করিয়া ‘পীর’ আখ্যা দিয়া পূজা করিতেন। স্কন্দ পুরাণে সত্যনারায়ণের পূজার বিধান আছে–এবং এই পূজা হিন্দুদের মধ্যে এখন পর্যন্ত প্রচলিত। মধ্যযুগে সত্যপীরের পূজা হিন্দু ও মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের মধ্যেই প্রচলিত ছিল। কিন্তু ষোড়শ শতাব্দীর পূর্বে ইহার প্রচলনের কোন প্রমাণ নাই। সত্যনারায়ণ ও সত্যপীরের পূজার ব্যবস্থা প্রায় অভিন্ন বলিলেও চলে, এবং এই দুয়ের কাহিনী অবলম্বনে অনেক পুঁথি ও পাঁচালী রচিত হয়। ‘ময়মনসিংহ গীতিকা’য় কঙ্কনামক ব্রাহ্মণ রচিত ‘সত্যপীরের পাঁচালী’র উল্লেখ আছে–সনাতনপন্থী হিন্দুরা নাকি এই পাঁচালী নষ্ট করে এবং কঙ্ককে বধ করিবার জন্য ষড়যন্ত্র করে। এই কাহিনীর সত্যতা এবং ‘ময়মনসিংহ গীতিকা’ কোন্ সময়ে রচিত এ সম্বন্ধে নিশ্চিত কিছু বলা যায় না। কেহ কেহ মনে করেন যে ষোড়শ শতাব্দীর শেষ পাদে শেখ ফয়জুল্লা রচিত ‘সত্যপীরের কাব্যই এই শ্রেণীর সর্বপ্রথম গ্রন্থ। অষ্টাদশ শতাব্দীতে হিন্দু ও মুসলমান রচিত বহু সংখ্যক সত্যপীরের পাঁচালী পাওয়া গিয়াছে–এ সম্বন্ধে সাহিত্য প্রসঙ্গে বিস্তৃত বিবরণ দেওয়া হইয়াছে। সত্যনারায়ণের পাঁচালীগুলিও প্রায় ঐ সময়ে লিখিত হয় এবং হিন্দু গ্রন্থকার রামেশ্বর ভট্টাচার্য, ভারতচন্দ্র প্রভৃতি সত্যপীর ও নারায়ণ যে অভিন্ন ইহা ঘোষণা করেন। রামেশ্বরের সত্যপীর ভক্তকে বলেন ‘রাম রহিম অভেদ’ আবার নারায়ণের রূপ ধারণ করিয়া ভক্তকে উপদেশ দেন।
নামভেদ তাহাতে নৈবেদ্য মাত্র ভেদ।
পীর বলি না জানিবে না ছাড়িবে বেদ ॥
সত্যপীর-সত্যনারায়ণের পূজার উৎপত্তি সম্বন্ধে দুইটি প্রচলিত মত যুক্তিযুক্ত বলিয়া মনে করা যাইতে পারে। যে সব হিন্দু ইসলাম ধর্ম্মে দীক্ষিত হইয়াছিলেন তাঁহারা দেবদেবী পূজার সংস্কারে এত আরক্ত ছিলেন যে তাঁহার পরিবর্তে পীরদের পূজায় আকৃষ্ট হন-এবং ইহার ফলেই সত্যনারায়ণের স্থলে সত্যপীরের পূজা প্রতিষ্ঠিত হয়। অপর মত এই যে সত্যপীরের পূজা প্রসিদ্ধি লাভ করার ফলে হিন্দু সমাজে ইহার পরিবর্তে সত্যনারায়ণের পূজা প্রচলিত হয়। প্রথম মতের সপক্ষে বলা যাইতে পারে যে স্কন্দ পুরাণে বর্ণিত সত্যনারায়ণ পূজার বিধি যদি মধ্যযুগে প্রক্ষিপ্ত বলিয়া অগ্রাহ্য না হয় তবে সত্যনারায়ণই যে সত্যপীরে পরিণত হইয়াছেন ইহা স্বীকার করিতেই হইবে। অপর দিকে সত্যপীরের পূজায় কোন দেবমূর্ত্তি বা শালগ্রাম থাকে না এবং পূজার শেষে দুধ, আটা, গুড়, কলার মিশ্রণে প্রস্তুত যে সিনি প্রসাদ রূপে বিতরিত হয় হিন্দুর অন্য কোন দেবদেবীর পূজায় তাঁহার প্রচলন ছিল এরূপ কোন প্রমাণ পাওয়া যায় না। কিন্তু উৎপত্তি যাহাই হউক “মধ্যযুগের শেষে বাংলায় সত্যপীরের পূজা হিন্দু-মুসলিম ধর্ম সমন্বয়ের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত” [শ্ৰীঅমিতাভ মুখোপাধ্যায় সতী পীরের সম্বন্ধে বিস্তৃত ও পাণ্ডিত্যপূর্ণ আলোচনার উপসংহারে এই মন্তব্য করিয়াছেন। (শতরূপা, বৈশাখ-আষাঢ়, ১৩৭৯, ৫৬-৬৪ পৃষ্ঠা)] বলিয়া যে গ্রহণ করা যায় না তাহা পূর্বেই বলা হইয়াছে।
