৭
হিন্দু ও মুসলমান সংস্কৃতি
বর্তমান শতাব্দীর প্রথম হইতে আমাদের দেশে একটি মতবাদ প্রচলিত হইয়াছে যে মধ্যযুগে হিন্দু ও মুসলমান সংস্কৃতির মিশ্রণের ফলে উভয়েই স্বাতন্ত্র হারাইয়াছে। এবং এমন একটি নূতন সংস্কৃতি গঠিত হইয়াছে যাহা হিন্দু সংস্কৃতিও নহে, ইসলামীয় সংস্কৃতিও নহে– ভারতীয় সংস্কৃতি। ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথম ভাগে রাজা রামমোহন রায়, দ্বারকানাথ ঠাকুর প্রভৃতি এবং শেষভাগে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় প্রভৃতি বাংলার তদানীন্তন শ্রেষ্ঠ নায়কগণ ইহার ঠিক বিপরীত মতই পোষণ করিতেন, এবং উনবিংশ শতাব্দীর বাংলা সাহিত্য এই বিপরীত মতেরই সমর্থন করে। হিন্দু রাজনীতিকেরাই এই নূতন মতের প্রবর্তক ও পৃষ্ঠপোষক। মুসলমান নায়কেরা ভারতে ইসলামীয় সংস্কৃতির পৃথক অস্তিত্বে বিশ্বাস করেন এবং এই বিশ্বাসের ভিত্তির উপরই পাকিস্তান একটি ইসলামীয় রাজ্যরূপে প্রতিষ্ঠিত হইয়াছে।
মুসলমান বিজেতারা ভারতে আসিয়া যে নূতন সংস্কৃতির সহিত পরিচিত হন, নিজেদের স্বাতন্ত্র রক্ষার জন্য তাহাকে হিন্দু সংস্কৃতি বলেন। ইহার পূর্বে ভারতবাসী এবং ভারতে প্রচলিত ধর্ম, সমাজ ও সংস্কৃতি হিন্দু সংজ্ঞায় চিহ্নিত হয় নাই। সুতরাং আলোচ্য বিষয় এই যে ১২০০-১৩০০ খ্রীষ্টাব্দে বাংলা দেশে যে সংস্কৃতি ছিল ১৮০০ সালে মুসলমানের সহিত মিশ্রণের ফলে তাঁহার এমন কোন পরিবর্তন হইয়াছে কিনা যাহা ইহাকে একটি ভিন্ন রূপ ও বৈশিষ্ট্য দিয়াছে। এই আলোচনার পূর্বে দুইটি বিষয় মনে রাখিতে হইবে। প্রথমতঃ, সকল প্রাণবন্ত সমাজেই স্বাভাবিক বিবর্তনের ফলে পরিবর্তন ঘটে। বাংলা দেশের মধ্যযুগের হিন্দুসমাজেও ঘটিয়াছে। কিন্তু এই পরিবর্তন কতটুকু ইসলামীয় সংস্কৃতির সংস্পর্শে ঘটিয়াছে বর্তমান ক্ষেত্রে কেবল তাহাই আমাদের বিবেচ্য।
দ্বিতীয়তঃ, দুই সম্প্রদায় একসঙ্গে বসবাস করিলে ছোটখাট বিষয়ে একে অন্যের উপর প্রভাব বিস্তার করে। কিন্তু সংস্কৃতি অন্তরের জিনিস-ইহার পরিচয় প্রধানতঃ ধর্মবিশ্বাস, সামাজিক নীতি, আইনকানুন, সাহিত্য, দর্শন, শিল্প ইত্যাদির মধ্য দিয়াই আত্মপ্রকাশ করে। সুতরাং সংস্কৃতির পরিবর্তন বুঝিতে হইলে এই সমুদয় বিষয়ে কি পরিবর্তন স্মৃটিয়াছিল তাহাই বুঝিতে হইবে।
হিন্দুর ধর্মবিশ্বাস ও সামাজিক নীতিতে ইসলামীয় ধর্ম্মের ও মুসলমান সমাজের প্রভাবে বিশেষ কোনই পরিবর্তন হয় নাই। জাতিভেদে জর্জরিত হিন্দু সমাজ মুসলমান সমাজের সাম্য ও মৈত্রীর আদর্শ হইতে অনেক শিক্ষা লাভ করিতে পারি, কিন্তু তাহা করে নাই। বহু কষ্ট ও লাঞ্ছনা সহ্য করিয়াও হিন্দু মূর্ত্তিপূজা ও বহু দেবদেবীর অস্তিত্বে বিশ্বাস অটুট রাখিয়াছে। হিন্দু আইনকানুনকে নূতন স্মৃতিকারেরা কিছু কিছু পরিবর্তন করিয়াছেন; কিন্তু তাহা সামাজিক প্রয়োজনে, ইসলামীয় আইনের কোন প্রভাব তাহাতে নাই।
বাংলা সাহিত্যে কতকগুলি আরবী ও ফার্সী শব্দের ব্যবহার ছাড়া আর কোন দিক দিয়া ইসলামীয় প্রভাবের পরিচয় পাওয়া যায় না। একদল মুসলমান লেখক ফার্সী সাহিত্যের আদর্শে অনুপ্রাণিত হইয়া বাংলায় রোমান্টিক সাহিত্যের আমদানি করিতে চেষ্টা করিয়াছিলেন। হিন্দু সাহিত্যিকেরা তাহা সম্পূর্ণরূপে উপেক্ষা করিয়া সাহিত্যকে ধর্ম্মের বাহনরূপেই ব্যবহার করিয়াছেন। [এনামুল হক ও আবদুল করিম, আরাকান রাজসভায় বাংলা সাহিত্য, ৬৯ পৃষ্ঠা] বাংলা দেশে নব্য-ন্যায় ও দর্শনের অন্য কোন শাখার যে সমুদয় আলোচনা হইয়াছে, তাহাতে এবং আয়ুর্বেদ ও অন্যান্য শাস্ত্রে ইসলামের কোন প্রভাব পরিলক্ষিত হয় না।
মধ্যযুগে হিন্দু শিল্পের উপর মুসলমানের প্রভাব বিশেষ কিছুই নাই। যে সকল দোচালা বা চৌচালা মন্দিরের বিষয় ১৫শ পরিচ্ছেদে উল্লিখিত হইয়াছে তাঁহার গঠনপ্রণালী হিন্দুর নিজস্ব নয়, মুসলমানের নিকট হইতে প্রাপ্ত, এ বিশ্বাসের যে কোন যুক্তিসংগত কারণ নাই তাহা সেখানে দেখান হইয়াছে। মন্দিরের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কোন অঙ্গে, যেমন ঢেউ-খেলান খিলানে সম্ভবত মুসলমানের প্রভাব আছে। কিন্তু ইহা সংস্কৃতির পরিবর্তন সূচনা করে না।
কেহ কেহ মনে করেন যে, সুফী দরবেশরা যে উদার ধর্মমত প্রচার করেন, তাহাতে হিন্দু ধর্মমতের পরিবর্তন ঘটিয়াছে। হিন্দুদের সম্বন্ধে সুফী দরবেশদের যে বিদ্বেষের ভাব ছিল তাহা পূর্বেই উল্লিখিত হইয়াছে। তাহারা যে ধর্মমত প্রচার করিত তাঁহার মধ্যে যথেষ্ট পরিমাণে হিন্দুধর্ম্মের প্রভাব ছিল। সর্বশেষে বক্তব্য এই যে, সুফীদের প্রভাব যদি কিছু থাকে তাহা হইলে আউল বাউল প্রভৃতি কয়েকটি অতি ক্ষুদ্র সম্প্রদায়ের মধ্যে আবদ্ধ ছিল। [এই পরিচ্ছেদের ‘বাস্তব জীবনে ধর্ম ও নীতি’ অংশে আলোচিত দ্রষ্টব্য] স্বয়ং চৈতন্যদেব, নানক, কবীরের ন্যায় যে উদার ভক্তিবাদ ও সামাজিক সাম্যবাদের প্রচার করিয়াছিলেন তাহাও শতবর্ষের মধ্যেই নিষ্ফল হইয়াছিল। বিরাট হিন্দুসমাজ পুরাণ ও স্মৃতিশাস্ত্ররূপ বৃহৎ বনস্পতির আশ্রয়ে গড়িয়া উঠিয়াছে। ক্ষুদ্র লতাপাতা চারিদিকে গজাইলেও বেশিদিন বাঁচে নাই এবং বিরাট হিন্দু সমাজের গায়েও কোন দাগই রাখিয়া যাইতে পারে নাই। ১২০০ খ্রীষ্টাব্দে হিন্দু ধর্ম ও সমাজ যাহা ছিল আর ১৮০০ খ্রীষ্টাব্দে হিন্দু ধর্ম ও সমাজ যাহা হইয়াছিল এ দুইয়ের তুলনা করিলেই এই উক্তির সত্যতা প্রমাণিত হইবে। হিন্দু সাধুসন্ত ও সুফী দরবেশ, ফকির প্রভৃতির মধ্যে ধর্মমতের উদারতা ও অপর ধর্ম্মের প্রতি যে শ্রদ্ধা ও সহানুভূতি ছিল তাঁহার ফল স্থায়ী বা ব্যাপক হয় নাই।
