মুসলমানদের ধর্ম্মের গোঁড়ামি যেমন হিন্দুদিগকে তাহাদের প্রতি বিমুখ করিয়াছিল, হিন্দুদের সামাজিক গোঁড়ামিও মুসলমানগণকে তাহাদের প্রতি সেইরূপ বিমুখ করিয়াছিল। হিন্দুরা মুসলমানদিগকে অস্পৃশ্য ম্লেচ্ছ যবন বলিয়া ঘৃণা করিত, তাহাদের সহিত কোন প্রকার সামাজিক বন্ধন রাখিত না। গৃহের অভ্যন্তরে তাহাদের প্রবেশ করিতে দিত না, তাহাদের সৃষ্ট কোন জিনিষ ব্যবহার করিত না। তৃষ্ণার্ত মুসলমান পথিক জল চাহিলে বাসন অপবিত্র হইবে বলিয়া হিন্দু তাহা দেয় নাই, ইবন্ বতুতা এরূপ ঘটনার উল্লেখ করিয়াছেন। ইহার সপক্ষে শাস্ত্রের দোহাই দিয়া হিন্দুরা যেমন নিজেদের আচরণ সমর্থন করিত, মুসলমানরাও তেমনি শাস্ত্রের দোহাই দিয়া মন্দির ও দেবমূর্ত্তি ধ্বংসের সমর্থন করিত। বস্তুত উভয় পক্ষের আচরণের মূল কারণ একই যুক্তি ও বিচার নিরপেক্ষ ধর্ম্মান্ধতা। কিন্তু ন্যায্য হউক বা অন্যায্য হউক পরস্পরের প্রতি এরূপ আচরণ যে উভয়ের মধ্যে প্রীতির সম্বন্ধ স্থাপনের দুস্তর বাধা সৃষ্টি করিয়াছিল ইহা অস্বীকার করিবার উপায় নাই। অনেক দিন যাবৎ অভ্যস্ত হইলে অত্যাচারও গা-সহা হইয়া যায়, যেমন সতীদাহ বা অন্যান্য নিষ্ঠুর প্রথাও হিন্দুর মনে এক সময়ে কোন বিকার আনিতে পারিত না। হিন্দু-মুসলমানও তেমনি এই সব সত্ত্বেও পাশাপাশি বাস করিয়াছে কিন্তু দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে ভ্রাতৃভাব তো দূরের কথা স্থায়ী প্রীতির বন্ধনও প্রকৃতরূপে স্থাপিত হয় নাই।
অনেকে ছোটখাট বিষয়ের উল্লেখ করিয়া এই সত্যকে অস্বীকার করেন। পূর্ব্বোল্লিখিত ‘কাজী দলন’ প্রসঙ্গে ‘চৈতন্যচরিতামৃতে [আদি লীলা, ১৭শ পরিচ্ছেদ] আছে যে যখন চৈতন্যের বহুসংখ্যক অনুচর তাঁহার পূহ ধ্বংস করিল তখন কাজী চৈতন্যের সঙ্গে আপোষ করিবার জন্য বলিলেন :
গ্রাম সম্বন্ধে চক্রবর্তী হয় মোর চাচা।
দেহ সম্বন্ধ হৈতে হয় গ্রাম সম্বন্ধ সাঁচা ॥
নীলাম্বর চক্রবর্তী হয় তোমার নানা।
সে সম্বন্ধে হও তুমি আমার ভাগিনা ॥
ইহার উপর নির্ভর করিয়া অনেকে মধ্যযুগে হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে একটি অচ্ছেদ্য উদার সামাজিক প্রীতির সম্বন্ধ কল্পনা করিয়াছেন। কিন্তু এই কাজীই যখন শুনিলেন যে তাঁহার আজ্ঞা লঙ্ঘন করিয়া চৈতন্য কীর্তন করিতে বাহির হইয়াছিলেন তখন ‘ভাগিনেয়’ সম্বন্ধে বলিয়াছিলেন :
(নিমাই পণ্ডিত)
মোরে লজ্জি হিন্দুয়ানি করে।
তবে জাতি নিমু আজি সবার নগরে ॥ [চৈতন্যভাগবত, মধ্যখণ্ড, ২৩শ অধ্যায়]
ইহাও স্মরণ রাখা কর্তব্য যে এই ‘কাজী মামা’ চৈতন্যের বাড়িতে আসিলে যে আসনে বসিতেন তাহা গঙ্গাজল দিয়া ধুইয়া শোধন করিতে হইত, জল চাহিলে যে পাত্রে জল দেওয়া হইত তাহাও ভাঙ্গিয়া ফেলিতে অথবা শোধন করিতে হইত। খাদ্যের কোন প্রশ্নই উঠিত না। নিমাই পণ্ডিত কাজী মামার বাড়ি গিয়া কিছু পান বা আহার করিলে জাতিচ্যুত হইতেন। ইহাতে আর যাহাই হউক মামা-ভাগিনেয়ের মধুর প্রীতি-সম্বন্ধ স্থাপিত হয় না।
ক্রমে ক্রমে মুসলমান সমাজেও ইহার প্রতিক্রিয়া দেখা দিল। মুসলমানেরা হিন্দুর ভাত খাইত না। কেহ হিন্দুর আচার অনুকরণ করিলে তাহাকে কঠোর শাস্তি পাইতে হইত। যবন হরিদাস বৈষ্ণব ধর্ম গ্রহণ করিলে ‘মুলুকের পতি’ তাহাকে বলিলেন :
কত ভাগ্যে দেখ তুমি হঞাছ যবন।
তবে কেন হিন্দুর আচারে দেহ মন ॥
আমরা হিন্দুরে দেখি নাহি খাই ভাত।
তাহা তুমি ছাড় হই মহাবংশ-জাত ॥ [চৈতন্যভাগবত, আদিখণ্ড, ১৪শ অধ্যায়]
হরিদাসের প্রতি অতি কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা হইল। হুকুম হইল বাইশ বাজারে নিয়া গিয়া কঠোর বেত্রাঘাতে হরিদাসকে হত্যা করিতে হইবে। চৈতন্যভাগবতের এই কাহিনী কিছু অতিরঞ্জিত হইলেও সে যুগে হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে কাল্পনিক মধুর প্রীতি-সম্বন্ধের সমর্থন করে না।
এ সম্বন্ধে সমসাময়িক সাহিত্যে যে দুই একটি সাধারণ ভাবের উক্তি আছে তাহাও এই মতের সমর্থন করে না। বিখ্যাত মুসলমান কবি আলাওল বাংলায় কবিতা লিখিয়াছেন বলিয়া অনেকে তাঁহার কাব্যের মধ্যে হিন্দু-মুসলমানের মিলনের সূত্র খুঁজিয়া পাইয়াছেন। কিন্তু তিনি নিঃসঙ্কোচে ইহাই প্রতিপাদন করিতে চেষ্টা করিয়াছেন যে হিন্দুর দেবতা মূর্খের দেবতা এবং ইসলামই সর্বশ্রেষ্ঠ ধর্ম এবং মোক্ষলাভের একমাত্র উপায়। [T.K. Ray Chaudhuri, Bengal under Akbar and Jahangir, pp. 142-3] অপরদিকে বৈষ্ণব গ্রন্থ প্রেমবিলাসে মুসলিম শাসনকে সকল দুঃখের হেতু বলিয়া বর্ণনা করা হইয়াছে। অদ্বৈতপ্রকাশে মুসলমানদের আচার-ব্যবহারের নিন্দা করা হইয়াছে। জয়ানন্দের মতে ব্রাহ্মণদের পক্ষে মুসলমানদের আদব-কায়দা গ্রহণ কলিযুগের কলুষতারই একটি নিদর্শন মাত্র, ইত্যাদি।
হিন্দুরা যাহাতে মুসলমান সমাজের দিকে বিন্দুমাত্রও সহানুভূতি দেখাইতে না পারে তাঁহার জন্য হিন্দু সমাজের নেতাগণ কঠোর হইতে কঠোরতর বিধানের ব্যবস্থা করিয়াছিলেন। এ বিষয়ে অনিচ্ছাকৃত সামান্য অপরাধেও হিন্দুরা সমাজে পতিত হইত। ইহার ফলে যে হিন্দুর সংখ্যা কমিতেছে এবং মুসলমানের সংখ্যা বাড়িতেছে তাহা হিন্দু সমাজপতিরা যে বুঝিতেন না তাহা নহে, কিন্তু তাহারা হিন্দুত্ব রক্ষা করিবার জন্য হিন্দুকে বিসর্জন দিতে প্রস্তুত ছিলেন। ফলে বাংলা দেশে মুসলমানেরা হিন্দু অপেক্ষা সংখ্যায় বেশি হইয়াছে; কিন্তু হিন্দুর ধর্ম, সমাজ ও সংস্কৃতি অক্ষত ও অবিকৃত আকারে অব্যাহতভাবে মধ্যযুগের শেষ পর্যন্ত স্বীয় বৈশিষ্ট্য ও স্বাতন্ত্র্য রক্ষা করিতে সমর্থ হইয়াছে। অনেকে ইহা স্বীকার করেন না, সুতরাং এ বিষয়ে একটু বিস্তৃত আলোচনার প্রয়োজন।
