ভারতচন্দ্রের ‘অন্নদামঙ্গল’ অষ্টাদশ শতাব্দীর মধ্যভাগে রচিত হয়। ইহার মুখবন্ধে আছে, ‘দুরাত্মা’ নবাব আলিবর্দী খান উড়িষ্যায় হিন্দুধর্ম্মের প্রতি ‘দৌরাত্ম্য’ করায় নন্দী ক্রুদ্ধ হইয়া :
মারিতে লইলা হাতে প্রলয়ে শূল।
করিব যবন সব সমূল নির্মূল।
তখন শিব তাহাকে নিষেধ করিয়া বলিলেন–যে সাতারায় বর্গীর (মহারাষ্ট্র) রাজাই নবাবকে দমন করিবেন। [প্রথম ভাগ-১৬ পৃষ্ঠা] অন্যত্র কবি দেবী অন্নদার মুখ দিয়া বলাইয়াছেন, মুসলমানেরা–
যতেক বেদের মত, সকলি করিল হত, নাহি মানে আগম পুরাণ।
মিছা মালা ছিলি মিলি, মিছা জপে ইলি মিলি, মিছা পড়ে কলমা কোরাণ ॥
যত দেবতার মঠ, ভাঙ্গি ফেলে করি হঠ, নানা মতে করে অনাচার।
বামণ পণ্ডিত পায় থুথু দেয় তার গায়, পৈতা ছেড়ে খোঁটা মোছে আর ॥ [দ্বিতীয় ভাগ-১৯৬ পৃষ্ঠা]
এই কাব্যের মধ্যেই আছে যে সেনাপতি মানসিংহ যখন প্রতাপাদিত্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেন তখন ভবানন্দ মজুমদার রসদ দিয়া মোগল সৈন্যদের প্রাণ রক্ষা করিয়াছিলেন এবং ইহার পুরস্কারস্বরূপ তিনি প্রতাপাদিত্যের রাজ্য ভবানন্দকে দিবার জন্য সম্রাট জাহাঙ্গীরকে অনুরোধ করেন। ইহাতে কূপিত হইয়া জাহাঙ্গীর হিন্দুধর্ম্মের অশেষ নিন্দা করিলেন এবং বলিলেন :
দেহ জ্বলি যায় মোর বামন দেখিয়া।
বামনেরে রাজ্য দিতে বল কি বুঝিয়া ॥
মুসলমান ধর্ম্মের সহিত হিন্দুধর্ম্মের বিস্তৃত আলোচনা করিয়া তিনি সখেদে নিঃশ্বাস ছাড়িয়া বলিলেন :
হায় হায় আখেরে কি হইবে হিন্দুর
এবং মনের গুপ্ত বাসনা ব্যক্ত করিয়া বলিলেন :
আমার বাসনা হয় যত হিন্দু পাই।
সুন্নত দেওয়াই আর কলমা পড়াই ॥ [দ্বিতীয় ভাগ-১৮৮ পৃষ্ঠা]
এই কথোপকথন যে সম্পূর্ণ কাল্পনিক তাহাতে কোন সন্দেহ নাই। কিন্তু মুসলমান রাজত্ব অবসানের পাঁচ বৎসর পূর্বেও হিন্দুর প্রতি মুসলমানের মনোভাব সম্বন্ধে বাঙালী হিন্দুর কি ধারণা ছিল ‘অন্নদামঙ্গলের উক্তি হইতে তাঁহার পরিচয় পাওয়া যায়। বখতিয়ার খিলজী হইতে আলিবর্দী খানের রাজত্ব পর্যন্ত যে হিন্দু মুসলমানের সম্বন্ধ মনোবৃত্তির মৌলিক বিশেষ কোন পরিবর্তন হয় নাই, ‘অন্নদামঙ্গল তাঁহার সাক্ষ্য দেয়।
ধর্ম্মের দিক দিয়া যেমন মন্দিরে দেবদেবীর মূর্ত্তিপূজা, সমাজের দিক দিয়া তেমনি স্ত্রীলোকের শুচিতা ও সতীত্ব রক্ষা হিন্দুরা জীবনযাত্রায় প্রধান স্থান দিত। এদিক দিয়াও মুসলমানেরা হিন্দুদের প্রাণে মর্মান্তিক আঘাত দিয়াছে। দীনেশচন্দ্র সেন হিন্দু-মুসলমানের প্রীতির সম্বন্ধ উচ্ছ্বসিত ভাষায় বর্ণনা করিয়াছেন। কিন্তু তিনিও লিখিয়াছেন, “মুসলমান রাজা এবং শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিগণ ‘সিন্ধুকী’ (গুপ্তচর) লাগাইয়া ক্রমাগত সুন্দরী হিন্দু ললনাগণকে অপহরণ করিয়াছেন। ষোড়শ শতাব্দীতে ময়মনসিংহের জঙ্গলবাড়ীর দেওয়ানগণ এবং শ্রীহট্টের বানিয়াচঙ্গের দেওয়ানেরা এইরূপ যে কত হিন্দু রমণীকে বলপূর্বক বিবাহ করিয়াছেন তাঁহার অবধি নাই। পল্লীগীতিকাগুলিতে সেই সকল করুণ কাহিনী বিবৃত আছে।” [ বৃহৎ বঙ্গ–৬৫৩ পৃষ্ঠা] পঞ্চদশ শতাব্দীর বাংলা কাব্যেও এই প্রকার বলপূর্বক হিন্দু নারীর সতীত্ব নাশের উল্লেখ আছে।
সেন মহাশয়ের মতে এই প্রকার অপহরণের ফলে হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে রক্তের সম্বন্ধ হইয়া তাহাদের মধ্যে “যেরূপ মেশামেশি হইয়াছিল, বোধ হয় ভারতের আর কোনও দেশে তাদৃশ ঘনিষ্ঠতা হয় নাই।” বিংশ শতাব্দীতে ‘ সেন মহাশয় এই “মেশামেশি” যে চোখে দেখিয়াছেন মধ্যযুগের হিন্দুরা ঠিক সেভাবে দেখে নাই। ইহা তাহাদের মর্মান্তিক দুঃখের কারণ হইয়াছিল এবং সেন মহাশয় এই সমুদয় কাহিনীকে করুণ’ আখ্যা দিয়া তাহা প্রকারান্তরে স্বীকার করিয়াছেন।
মধ্যযুগে রাজনীতিক অধিকার, ধর্ম্মানুষ্ঠান ও সামাজিক পবিত্রতা রক্ষা বিষয়ে আঘাতের পর আঘাত পাইয়া হিন্দুর যে অবস্থা হওয়া স্বাভাবিক তাহা মুসলমানদের সহিত প্রীতির সম্বন্ধ স্থাপনের অনুকূল নহে। এ বিষয়ে হিন্দু সাহিত্য হইতে যে ইঙ্গিত পাওয়া যায় তাহাও এই অনুমানের পোষকতা করে। সুলতান হোসেন শাহ হিন্দুদিগের প্রতি উদারতার জন্য বর্তমান কালে প্রসিদ্ধি লাভ করিয়াছেন। কিন্তু তাঁহার কালেই নবদ্বীপে উল্লিখিত কাজীর অত্যাচার ঘটিয়াছিল এবং বিজয় গুপ্তও তাঁহার সমসাময়িক। ‘চৈতন্যচরিতামৃত’ গ্রন্থ হইতে জানা যায় যে তাঁহার বাল্যকালের প্রভু এক ব্রাহ্মণ তাঁহাকে কার্যে অবহেলার জন্য বেত্রাঘাত করিয়াছিলেন এইজন্য সুলতান হইয়া তিনি মুসলমান-শৃষ্ট জল খাওয়াইয়া তাঁহার জাতি নষ্ট করিয়াছিলেন। তিনি চৈতন্যদেবের জনপ্রিয়তা দেখিয়া কর্মচারীদিগকে বলিয়াছিলেন যেন তাঁহার প্রতি কোন অত্যাচার না হয়। কিন্তু তাঁহার হিন্দু কর্মচারীরা তাঁহার হিন্দু-বিদ্বেষ সম্বন্ধে জানিতেন সুতরাং তাঁহার কথায় আশ্বাস না পাইয়া গোপনে চৈতন্যকে সংবাদ পাঠাইলেন যেন তিনি অবিলম্বে হোসেন শাহের রাজধানী হইতে দূরে প্রস্থান করেন। [চৈতন্যভাগবত, অন্ত্যখণ্ড, ৪র্থ অধ্যায়] হোসেন শাহের মন্ত্রী সনাতন উড়িষ্যার বিরুদ্ধে অভিযানের সময় প্রভুর আদেশ সত্ত্বেও তাঁহার সঙ্গে যান নাই, কারণ তিনি দেবমূর্ত্তি ধ্বংস করিবেন। এই অপরাধে হোসেন শাহ তাঁহাকে কারারুদ্ধ করিয়াছিলেন। এই মন্ত্রীই তাঁহার ভ্রাতা রূপকে সঙ্গে লইয়া গোপনে চৈতন্যের সঙ্গে দেখা করিয়া তাঁহাকে রাজধানীর নিকট হইতে দূরে যাইতে বলিয়াছিলেন। এই সাক্ষাতের সময় দুই ভ্রাতা দুঃখ করিয়া বলিয়াছিলেন যে ‘গো-ব্রাহ্মণদ্রোহী স্নেচ্ছের অধীনে কার্য করিয়া’ তাঁহারা নিজেদের ‘অধম পতিত পাপী’ বলিয়া মনে করেন। [‘চৈতন্যচরিতামৃত, মধ্যলীলা, ১ম পরিচ্ছেদ] ‘উদার-হৃদয়’ হোসেন শাহের প্রতি সমসাময়িক হিন্দুর মনোভাব যে বিংশ শতাব্দীর হিন্দুদের মনোভাবের সম্পূর্ণ বিপরীত ছিল সে বিষয়ে সন্দেহ নাই। তবে এই সুলতানের বা তাঁহার অনুচরদের প্রসাদপুষ্ট কবিগণ তাঁহাকে যথেষ্ট প্রশংসা করিয়াছেন। যশোরাজ খান নামক কবি তাঁহাকে ‘জগত ভূষণ’ এবং কবীন্দ্র পরমেশ্বর তাঁহাকে কলিযুগের কৃষ্ণ বলিয়া উল্লেখ করিয়াছেন। ইহা হোসেন শাহের স্বরূপ বর্ণনা মনে না করিয়া মধ্যযুগের বাঙালী কবির দীর্ঘ-দাসত্ব জনিত নৈতিক অধঃপতনের পরিচায়ক বলিয়া গ্রহণ করাই অধিকতর সঙ্গত। কারণ মধ্যযুগের শেষে যখন ইংরেজ গভর্নর জেনারেল ওয়ারেন হেষ্টিংস বিলাতের পার্লামেন্টে ভারতবাসীর প্রতি অত্যাচারের জন্য অভিযুক্ত হইয়াছিলেন তখন কাশীবাসী বাঙালী পণ্ডিতেরা তাঁহাকে এক প্রশস্তিপত্র দিয়াছিলেন। তাহাতে লেখা ছিল যে অর্থের প্রতি হেষ্টিংসের কোন লোভ ছিল না এবং তিনি কখনও কাহারও কোন অনিষ্ট করেন নাই। অথচ এই হেষ্টিংসই উক্ত পণ্ডিতদের জীবদ্দশায় অর্থের লোভে কাশীর রাজা চৈৎসিংহের ও অযোধ্যার বেগমদের সর্বনাশ করিয়াছিলেন এবং অনেকের মতে মহারাজা নন্দকুমারের ফাঁসির জন্য প্রধানত তিনিই দায়ী। সুতরাং মধ্যযুগে কবির মুখে রাজার স্তুতির প্রকৃত মূল্য কতটুকু তাহা সহজেই অনুমেয়।
