ইসলামে ধর্ম ও রাষ্ট্রের নায়ক একই এবং উভয়ই শাস্ত্রের বিধান দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। এই শাস্ত্রমতে মুসলমান রাজ্যে কাফের হিন্দুদের কোন স্থান নাই; ইহারা জিম্মি অর্থাৎ আশ্রিতের ন্যায় জীবনযাপন করিবে এবং নাগরিকের প্রধান প্রধান অধিকার হইতে বঞ্চিত থাকিবে। কুড়ি পঁচিশ দফায় ইহাদের দায়িত্ব ও কর্তব্য নির্দিষ্ট হইয়াছে। ইহাদের মধ্যে মাত্র তিনটির উল্লেখ করিলেই যথেষ্ট হইবে।
১। হিন্দুদিগকে নিজের জন্মভূমিতে বাস করিতে হইলে বিনীতভাবে মাথা পিছু একটি কর দিতে হইবে–ইহার নাম জিজিয়া।
২। হিন্দুরা দেবদেবীর মূর্ত্তির জন্য কোন মন্দির নির্মাণ করিতে পারিবে না। কার্যত ইহার ব্যাপক অর্থ দাঁড়াইয়াছিল যে, যে সকল মন্দির আছে তাহা ভাঙ্গিয়া ফেলাও পুণ্যের কাজ।
৩। যদি কোন অমুসলমান ইসলামের প্রতি অনুরক্ত হয় তাহাকে কেহ বাধা দিতে পারিবে না, কিন্তু যদি কেহ কোন মুসলমানকে অন্য ধর্ম্মে দীক্ষিত করে তাহা হইলে যে কোন মুসলমান ঐ দুই জনকেই স্বহস্তে বধ করিতে পারিবে।
ইসলামই একমাত্র সত্য ধর্ম–এইরূপ বিশ্বাস হইতেই এই সমুদয় বিধির প্রবর্তন হইয়াছে। মধ্যযুগ পৃথিবীতে ধর্ম্মান্ধতার যুগ। হিন্দু সমাজের অনেক কদাচার, নিষ্ঠুরতা, অবিচার ও অত্যাচার এই ধর্ম্মান্ধতারই ফল। সুতরাং আশ্চর্য বোধ করার কিছুই নাই।
উক্ত মৌলিক তিনটি নীতিই যে ভারতের অন্য স্থানের ন্যায় বাংলা দেশের মুসলমানেরা অনুসরণ করিত তাহাতে সন্দেহের কোন অবকাশ নাই। দুই একটি দৃষ্টান্ত দিতেছি।
বর্তমান যুগে এক সম্প্রদায়ের হিন্দু প্রচার করিয়াছেন যে ইংরেজ শাসনের পূর্বে ভারত কখনও পরাধীন হয় নাই, কারণ মুসলমানেরা এদেশেই বসবাস করিত। এ যুক্তির অনুসরণ করিলে বলিতে হয় যে অষ্ট্রেলিয়ার ‘মাওরি জাতি এবং আমেরিকার ‘রেড ইণ্ডিয়ান’ অর্থাৎ আদিম অধিবাসীরা ধ্বংস হইয়াছে বটে কিন্তু কখনও পরাধীন হয় নাই, কারণ ইংরেজ শাসকেরা তাহাদেরই দেশেই বাস করিত। এ সম্বন্ধে ইহাও বলা আবশ্যক যে সুদীর্ঘ ছয় শত বৎসরের মধ্যে মাত্র একজন হিন্দু রাজা গণেশ–গৌড়ের সিংহাসনে আরোহণ করেন। কিন্তু বাংলার মুসলমানেরা জৌনপুরের মুসলমান সুলতানকে এই কাফেরকে সিংহাসনচ্যুত করার জন্য সনির্বন্ধ অনুরোধ করেন। তাঁহার ফলে গণেশ সিংহাসনচ্যুত হন এবং তাঁহার পুত্র ইসলাম ধর্ম অবলম্বন করিয়া রাজসিংহাসন অধিকারে রাখিতে সমর্থ হন।
কিন্তু হিন্দু রাজা হওয়া তো দূরের কথা ইহার সম্ভাবনামাত্রও মুসলমান সুলতানকে বিচলিত করিত। গৌড়ে ব্রাহ্মণ রাজা হইবে নবদ্বীপে এই রূপ একটি ভবিষ্যদ্বাণীর প্রচার হওয়ায় সুলতানের আজ্ঞায় নবদ্বীপে যে কী ভীষণ অত্যাচার হইয়াছিল তাহা প্রায়-সমসাময়িক গ্রন্থ জয়ানন্দের ‘চৈতন্যমঙ্গলে বর্ণিত আছে।
রাজনীতি ক্ষেত্রে হিন্দুর প্রতি সদ্ব্যবহারের প্রমাণস্বরূপ হিন্দুদের উচ্চ রাজপদে নিয়োগের কথা অনেকেই উল্লেখ করিয়াছেন। প্রথম দুইশত বৎসর সুলতানী রাজত্বের ইতিহাসে এইরূপ নিয়োগের কোন উল্লেখ নাই। পরবর্তীকালে দেখা যায় যে, রাজ-দরবারে বিরোধী মুসলমানদিগকে দমাইয়া রাখিবার জন্য হিন্দুদিগকে উচ্চপদে নিয়োগ করা হইত। যে কারণেই হউক গিয়াসুদ্দীন আজম শাহই (১৩৯০-১৪১০ খ্রী) প্রথমে হিন্দুদের উচ্চপদে নিয়োগ করেন। কিন্তু ইহাতে মুসলমান সমাজ বিচলিত হইল। সুফী দরবেশ হজরৎ মৌলানা মুজফফর শামস বলখি সুলতানকে চিঠি লিখিলেন যে এইরূপ নিয়োগ ধর্মশাস্ত্রের বিধিবিরুদ্ধ। তাহার সংখ্যা হাতের আঙ্গুলে গোণা যায়। আকবরের পরবর্তী যুগে আবার প্রাচীন ধ্বংসলীলা আরম্ভ হয় এবং ঔরংজেবের সময় ইহা চরমে ওঠে।
কিন্তু কেবল মন্দির ধ্বংস নহে, হিন্দুর ধর্ম্মানুষ্ঠানেও মুসলমানেরা বাধা দিত। নবদ্বীপে কাজীর আদেশে কীর্তন করা বন্ধ হইয়াছিল। পথে যাইতে যাইতে কাজী শুনিলেন যে গৃহমধ্যে বাদ্য-সহযোগে কীর্তন হইতেছে–ইহাতে কুপিত হইয়া
যাহারে পাইল কাজি মারিল তাহারে।
ভাঙ্গিল মৃদঙ্গ, অনাচার কৈল দ্বারে ॥ [চৈতন্যভাগবত, মধ্যখণ্ড, ২৩শ অধ্যায়]
কাজি বলে হিন্দুয়ানি হইল নদীয়া।
করিব ইহার শাস্তি নাগালি পাইয়া ॥ [চৈতন্যভাগবত মধ্যখণ্ড, ২৩শ অধ্যায়]
চৈতন্যদেব কি করিয়া কাজীকে নিবৃত্ত করিয়াছিলেন তাহা পূর্বে বর্ণিত হইয়াছে।
বিজয় গুপ্তের মনসামঙ্গলে (পঞ্চদশ শতাব্দী) হিন্দুর প্রতি মুসলমান কর্মচারীর অকথ্য অত্যাচারের বর্ণনা আছে।
যাহার মাথায় দেখে তুলসীর পাত।
হাতে গলে বান্ধি নেয় কাজির সাক্ষাৎ ॥
বৃক্ষতলে থুইয়া মারে বজ্র কিল।
পাথরের প্রমাণ যেন ঝড়ে পড়ে শিল ॥
* * *
ব্রাহ্মণ পাইলে লাগ পরম কৌতুকে।
কার পৈতা ছিড়ি ফেলে থুতু দেয় মুখে।
রাখাল বালকেরা ঘট পাতিয়া মনসা পূজা করিতেছিল, তাহাদের প্রতি অকথ্য নিষ্ঠুর অত্যাচার হইল। ঘট ভাঙ্গিয়া ফেলিল, যে কুম্ভকার ঘট গড়াইয়াছিল, তাহাকেও গ্রেপ্তার করা হইল। এই প্রসঙ্গে কাজীর উক্তি প্রণিধানযোগ্য :
হারামজাত হিন্দুর এত বড় প্রাণ।
আমার গ্রামতে বেটা করে হিন্দুয়ান ॥
গোটে গোটো ধরিব গিয়া যতেক ছেমরা।
এড়া রুটি খাওয়াইয়া করিব জাতি মারা ॥
এইভাবে “জাতি মারা”ই বাংলায় মুসলমান বৃদ্ধির অন্যতম কারণ।
