ইউরোপীয় লেখকেরা যে বাঙালীর ভীরুতার উল্লেখ করিয়াছেন ঊনবিংশ শতকের পটভূমিতে দেখিলে তাহা অস্বীকার করিবার কোন সঙ্গত কারণ নাই। মধ্যযুগের ইতিহাসে বাঙালী সৈন্য যুদ্ধ করিয়াছে এবং সাহস ও বীরত্বের পরিচয় দিয়াছে, ইহার বহু বিবরণ পাওয়া যায়। কিন্তু সমসাময়িক সাহিত্য হইতে এ সিদ্ধান্ত করা অসঙ্গত হইবে না যে সাধারণত হাড়ী, ডোম, বাগদী প্রভৃতি নিম্নশ্রেণীর হিন্দুরাই পাইকের দলে ভর্তি হইয়া যুদ্ধ করিত। উচ্চতর শ্রেণীর হিন্দুগণ যে কিরূপ সাহসী ও সমরকুশল ছিল মাধবাচার্যের চণ্ডীকাব্য হইতে যে অংশ উদ্ধৃত করা হইয়াছে [চৈতন্য-ভাগবতে-৫৩, ২৩৭ পৃ.] তাহাতেই তাঁহার বর্ণনা পাওয়া যাইবে। অষ্টাদশ শতাব্দীতে বাঙালীদের যে সাহস ও সামরিক শক্তির যথেষ্ট অভাব ছিল তাহা মধ্যযুগের–অন্তত ইহার শেষভাগের–অবস্থা সূচিত করে।
মানরিক বাঙালীর ভীরুতা ও উদ্যমহীনতার প্রসঙ্গে বলিয়াছেন যে ইহারা দাসত্ব ও বন্দিজীবনে অভ্যস্ত। মধ্যযুগের বাঙালী হিন্দুরা যে সুলতানী ও মুঘল আমলে স্বাধীনতা লাভের বিশেষ কোন চেষ্টা করে নাই ইহাই তাঁহার প্রকৃষ্ট প্রমাণ। এই দুই শাসনের মধ্যবর্তী অরাজক অবস্থার সময়ে বাঙালী হিন্দু জমিদারেরা স্বীয় প্রতিপত্তির জন্য লড়াই করিয়াছিলেন–কিন্তু তাহা বেশি দিন স্থায়ী হয় নাই। এ বিষয়ে পাঠান জাতীয় মুসলমানেরা অনেক বেশি উদ্যম ও সাহস দেখাইয়াছিল। হিন্দুর মধ্যে রাজা সীতারাম রায় একমাত্র ব্যতিক্রম। সুপ্রতিষ্ঠিত মুঘল রাজশক্তির বিরুদ্ধে তিনি স্বাধীনতার জন্য সংগ্রাম করিয়াছিলেন। সমসাময়িক সাহিত্য ইহাই প্রমাণিত করে যে বাঙালী আত্মশক্তিতে বিশ্বাস করিত না। দৈব অনুগ্রহের উপর। নির্ভর করিতেই অভ্যস্ত ছিল।
কাজী যখন কীর্তন বন্ধ করিবার আদেশ দিলেন তখন সাধারণ বাঙালীর ভীরুতা ও দুর্বলতা যেরূপ প্রকট হইয়াছিল চৈতন্য-ভাগবতে তাঁহার বর্ণনা আছে। স্বয়ং চৈতন্যদেবের আদর্শ এবং প্রচেষ্টাও যে কোন স্থায়ী ফল প্রসব করে নাই তাহা পূর্বেই উল্লিখিত হইয়াছে [চৈতন্য ভাগবত (মধ্য খণ্ড) ২৩ অধ্যায়, চৈতন্য ভাগবত (আদি) ১৭ অধ্যায়]। ষোড়শ শতাব্দীর বাঙালীর এই মনোবৃত্তি ঊনবিংশ শতকের বাঙালীরাও উত্তরাধিকার সূত্রে পাইয়াছিল।
টমাস বাউরী (১৬৬৯-৭৯ খ্র) বাঙালী ব্রাহ্মণের মানসিক উৎকর্ষের বিশেষ প্রশংসা করিয়াছেন। যাঁহারা নব্যন্যায়ের জন্য সমগ্র ভারতবর্ষে প্রসিদ্ধি লাভ করিয়াছেন, এ প্রশংসা ন্যায্যত তাঁহাদের প্রাপ্য। এই প্রসঙ্গে ইহাও উল্লেখযোগ্য যে অন্যান্য অনেক বিষয়ে হীন হইলেও বাঙালী চরিত্রের একটি বৈশিষ্ট্য ছিল জ্ঞানার্জনের স্পৃহা, এবং হিন্দু-মুসলমান উভয় সম্প্রদায়েই বিদ্যাশিক্ষার উৎকৃষ্ট ব্যবস্থা ছিল।
কিন্তু বাঙালীর জ্ঞানের আদর্শ ছিল অতিশয় সীমাবদ্ধ। বিদেশীর নিকট হইতে নূতন নূতন জ্ঞানলাভের স্পৃহা তাহাদের মোটেই ছিল না, এবং ভারতের বাহিরে যে বিশাল জগৎ আছে তাঁহার সম্বন্ধে তাহারা কিছুই জানিত না। পঞ্চদশ শতকে একাধিক রাজদূত বাংলা হইতে চীনে গিয়াছিল এবং চীন হইতে বাংলায় আসিয়াছিল। কিন্তু চীন দেশের তুলনায় বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতির সম্বন্ধে বাঙালীর জ্ঞান খুব অল্পই ছিল। চীনদেশের তিনটি আবিষ্কার-মুদ্রণযন্ত্র, আগ্নেয়াস্ত্র ও চুম্বক দিগদর্শন যন্ত্রসভ্য জগতে যথাক্রমে শিক্ষা ও চিন্তার রাজ্যে, যুদ্ধে ও সমুদ্রযাত্রায় যুগান্তর আনয়ন করিয়াছিল; কিন্তু বাঙালীরা ইহার কোন সংবাদ রাখিত না। সপ্তদশ ও অষ্টাদশ শতকে পাশ্চাত্য জগতে–নূতন নূতন চিন্তাধারার বিকাশ ও জ্ঞান-বিজ্ঞানের অদ্ভুত উন্নতি সাধন হইয়াছিল কিন্তু বাংলা দেশে তথা ভারতে ইহার কোন প্রচার হয় নাই। যে সময়ে ইউরোপে নিউটন, লাইবনিজ, বেকন প্রভৃতি মানুষের প্রজ্ঞাশক্তি ও জ্ঞানের পরিধি বিস্তার করিতেছিলেন সেই সময় বাঙালীর মনীষা নব্যন্যায়ের সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম বিচারে, বাঙালীর প্রজ্ঞা কোন্ তিথিতে কোন্ দিকে যাত্রা শুভ বা অশুভ এবং কোন্ ভোজ্য দ্রব্য বিধেয় বা নিষিদ্ধ তাঁহার নির্ণয়ে, এবং বাঙালীর ধর্মচিন্তা ও হৃদয়বৃত্তি স্বকীয়া অপেক্ষা পরকীয়া-প্রেমের আপেক্ষিক উৎকর্ষ প্রতিষ্ঠার জন্য ছয়মাস ব্যাপী তর্কযুদ্ধে নিয়োজিত ছিল।
৬
হিন্দু ও মুসলমান সমাজের সম্বন্ধ
মধ্যযুগে বাংলার হিন্দু ও মুসলমান যে রাজনীতি, ধর্ম ও সমাজের গুরুতর বৈষম্যের জন্য দুইটি পৃথক সম্প্রদায়ে বিভক্ত হইয়া নিজেদের স্বাতন্ত্র্য বজায় রাখিয়াছিল তাহা এই অধ্যায়ের প্রথমেই বলা হইয়াছে। তথাপি ছয় শত বৎসর যাবৎ এই দুই সম্প্রদায় একত্র বা পাশাপাশি বাস করিয়াছে। সুতরাং এ দুইয়ের মধ্যে কি প্রকার সম্বন্ধ গড়িয়া উঠিয়াছিল তাহা জানিবার জন্য স্বতই ঔৎসুক্য হয়। বিশেষত, যদিও এ বিষয়ে নিরপেক্ষ বিচারসহ তথ্য খুব কমই আমরা জানি, তথাপি কল্পনার দ্বারা এই অভাব পূরণ করিয়া অনেকেই ইহাদের মধ্যে একটি বিশেষ সৌহার্দ্য, মৈত্রী ও ভ্রাতৃত্বভাবের চিত্র আঁকিয়াছেন। ইতিহাসে এই সকল অবাস্তব ভাব-প্রবণতার স্থান নাই। সুতরাং এই দুই সম্প্রদায়ের পরস্পরের প্রতি আচরণের যে কয়েকটি গুরুতর ও প্রয়োজনীয় তথ্য সম্বন্ধে নিশ্চিত হওয়া যায় তাঁহার উল্লেখ করিতেছি।
