সেকালে লোকের পশুপক্ষী পালিবার খুব সখ ছিল। রাজা গোবিন্দচন্দ্র যখন সন্ন্যাস গ্রহণ করিয়া রাজপ্রাসাদ হইতে বাহির হইলেন তখন তাঁহার পোষা পাখী, গরু, হাতি ও কুকুর আর্তনাদ করিয়া উঠিল। “নও বুড়ি কুত্তা কান্দে চরণেত পড়িয়া”। অর্থাৎ তাঁহার ১৮০টি পোষা কুকুর ছিল। লোকে পোষা পাখীর পায়ে নূপুর লাগাইত ও অনেক খরচ করিয়া পাখীর খাঁচা নির্মাণ করিত।
ধনী বিলাসীদের গৃহে বহু আসবাবের বর্ণনা পাওয়া যায়। স্বর্ণরৌপ্যখচিত পালঙ্ক, মশারি, শীতলপাটি, কম্বল, গালিচা, আয়না, স্বর্ণখচিত দোলা, রথ বা শকট, শামিয়ানা, নানাপ্রকার চামর ও পাখা, গজদন্ত নির্মিত পাশা, সোনার পিড়ি, প্রভৃতি উল্লেখ আছে।
বাংলা দেশে জিনিসপত্র খুব সস্তা হওয়ায় বহু বিদেশী এখানে বসবাস করিত। সপ্তদশ খ্রীষ্টাব্দে বার্নিয়ার লিখিয়াছেন যে এই কারণে ওলন্দাজ কর্ত্তৃক বিতাড়িত বহু পর্তুগীজ ও ট্যাঁস ফিরিঙ্গী (halfcaste) এই দেশে আশ্রয় লয়। এ দেশে অনেক গীর্জা আছে এবং এক হুগলি (Hogouli) শহরেই প্রায় আট নয় হাজার খ্রীষ্টান বাস করে। ইহা ছাড়া আরও পঁচিশ হাজার খ্রীষ্টান এ দেশে বাস করে। এই দেশের ঐশ্বর্য, জীবনযাত্রার স্বাচ্ছন্দ্য ও এদেশের মেয়েদের মধুর স্বভাবের ফলে ইংরেজ, পর্তুগীজ ও ওলন্দাজদের মধ্যে একটি প্রবাদ-বাক্যের উৎপত্তি হইয়াছে যে “বাংলা দেশে শতশত প্রবেশের দ্বার আছে কিন্তু বাহিরে যাইবার একটিও পথ নাই।” এই সমুদয় বিদেশীদের প্রভাবে বাংলা দেশে যে সকল নূতন খাদ্য, পানীয়, কৃষিজাত দ্রব্য, আসবাবপত্র ও নিত্যব্যবহার্য দ্রব্যের প্রচলন হইয়াছে তাহা পূর্বে ও পঞ্চদশ পরিচ্ছেদের পরিশিষ্টে উল্লিখিত হইয়াছে। রালফ ফিচ কোচবিহারে ছাগল, মেষ, কুকুর, বিড়াল, পাখী ও অন্যান্য জীবজন্তুর জন্য আরাগ্যশালা (হাসপাতাল) ছিল বলিয়া উল্লেখ করিয়াছেন।
৯। বাঙালীর নীতি ও চরিত্র : মধ্যযুগে বাঙালীর নীতি ও চরিত্র সম্বন্ধে বৈদেশিক ভ্রমণকারীরা পরস্পর-বিরুদ্ধ মত প্রকাশ করিয়াছেন। জোয়ানেস্ ডি লায়েট (Joannes De Leat) বলিয়াছেন (১৬৩০ খ্রীষ্টাব্দে) যে তাহারা খুব চতুর চালাক কিন্তু স্বভাব চরিত্র খুবই খারাপ; পুরুষেরা চুরি ডাকাতি করে, স্ত্রীলোক লজ্জাহীনা ও অসতী। সপ্তদশ শতকে শুটেন (Gautier Schouten) বলেন যে লাম্পট্য ও দুর্নীতি ভারতের সর্বত্রই আছে তবে বাংলা দেশে অন্য প্রদেশ হইতে বেশি। মানরিক (Sebastiao Manrique) লিখিয়াছেন (১৬২৮ খ্রীষ্টাব্দে) যে বাঙালীরা ভীরু ও উদ্যমহীন, পরের পা চাটিতে অভ্যস্ত। তাহাদের মধ্যে একটি ছড়া প্রচলিত আছে ‘মারে ঠাকুর না মারে কুকুর’–অর্থাৎ যে প্রহার করিতে পারে তাহাকে ঠাকুরের মত মান্য করিব আর যে না মারে তাহাকে কুকুরের মত ঘৃণা করিব। এই ছড়াটির মধ্য দিয়াই তাহাদের স্বভাব ফুটিয়া উঠিয়াছে।
অপর দিকে চীনাদের বিবরণে (পঞ্চদশ শতকের প্রারম্ভে) বাঙালীর সতোর ও দয়া-দাক্ষিণ্যের উচ্চ প্রশংসা আছে। তাহারা কোন চুক্তি করিলে তাহা ভঙ্গ করে না, এমন কি দশ হাজার মুদ্রার চুক্তি করিলেও তাহারা কাহাকেও ঠকায় না এবং নিজ গ্রামের দুঃস্থ লোকদিগকে নিজেরাই পোষণ করে, সাহায্যের জন্য অন্য গ্রামে যাইতে দেয় না। [Visva-bharati Annals, I. p. 112, 113, 116] তবে চীনাদের বাঙালী সমাজের সম্বন্ধে জ্ঞান খুব বেশি ছিল বলিয়া মনে হয় না; কারণ তাহারা লিখিয়াছে যে এদেশে হিন্দুদের মধ্যে স্বামী মরিলে স্ত্রীলোক এবং স্ত্রী মরিলে স্বামী আর দ্বিতীয়বার বিবাহ করে না। ইউরোপীয় বিদেশীদের কথা কতদূর সত্য তাহা বলা যায় না। অসম্ভব নহে যে পঞ্চদশ শতকের খুলনায় সপ্তদশ শতকে বাঙালী চরিত্রের অবনতি হইয়াছিল। কিন্তু দুর্নীতি ও ধূর্ততা বিষয়ে ইউরোপীয় লেখকেরা যে খুব অতিরঞ্জিত করেন নাই, ঊনবিংশ শতকের বাঙালী চরিত্র তাহা অনেকটা সমর্থন করে। মুকুন্দরাম বর্ণিত ভাঁড়দত্তের চরিত্র বাঙালী সমাজের একটি শ্রেণীর প্রতীক বলিয়া গ্রহণ করা যাইতে পারে।
ধনী ও সম্ভ্রান্ত বাঙালীরা আহার, পরিচ্ছদ, অলঙ্কার প্রভৃতি বিষয়ে যে বিলাসিতার চূড়ান্ত করিতেন; নারীদেহ ভোগ, মদ্যপান ও অন্যান্য ব্যভিচারে খুবই আসক্ত ছিলেন এবং ইহা যে অস্বাভাবিক বলিয়া গণ্য হইত না তাঁহার যথেষ্ট প্রমাণ আছে। গণিকাগৃহে গমন ও স্বগৃহে বাইজীর নৃত্যগীত ও অবাধ মদ্যপান, ধনী লোকের একটি বৈশিষ্ট্য বলিয়াই গণ্য হইত।
অশ্লীলতা ও নর-নারীর দৈহিক সম্ভোগ সম্বন্ধে যে আদর্শ বর্তমানে প্রচলিত মধ্যযুগের আদর্শ তাহা হইতে অন্যরূপ ছিল বলিয়াই মনে হয়। ধর্ম্মানুষ্ঠানের সহিত যে সকল অশ্লীল আচার ও আচরণ জড়িত ছিল, তান্ত্রিক ও সহজিয়া সম্প্রদায় এবং দুর্গাপূজার শবরোৎসব উপলক্ষে তাহা বর্ণিত হইয়াছে। এগুলি সে যুগের স্মৃতিশাস্ত্রে ধর্ম্মের অঙ্গ বলিয়া স্বীকৃতি লাভ করিয়াছে। জয়দেবের গীতগোবিন্দ, চণ্ডীদাসের ‘শ্রীকৃষ্ণকীর্তন, বৈষ্ণব পদাবলী ও ভারতচন্দ্রের ‘অন্নদামঙ্গল প্রভৃতি গ্রন্থে, অর্থাৎ মধ্যযুগের প্রথম হইতে শেষ পর্যন্ত, শৃঙ্গার রসের যে উৎকট বর্ণনা আছে, বর্তমান কালের আদর্শ অনুসারে তাহা সুরুচি ও নীতির দিক দিয়া সমাজের খুব অধঃপতিত অবস্থাই সূচিত করে। সুতরাং মধ্যবিত্ত ও নিম্নশ্রেণীর মধ্যেও যে নীতির আদর্শ খুব উচ্চ ছিল তাহা বলা যায় না। অবশ্য বর্তমান যুগের আদর্শের মাপকাঠিতে বিচার করিয়াই এই ভাল মন্দ স্থির করা হইয়াছে। ইহার মধ্যে কোন্ যুগের আদর্শ ভাল, তাঁহার বিচার বর্তমান ক্ষেত্রে অপ্রাসঙ্গিক।
