রূপরামের বর্ণনা কাল্পনিক হইলেও ইহা হইতে সেকালের সামরিক শ্রেণীর ও যুদ্ধযাত্রার কিছু আভাস পাওয়া যায়।
কলিঙ্গরাজ ও কালকেতুর প্রসঙ্গে কবিকঙ্কণ-চণ্ডীতেও [৬৬. প্রথম ভাগ, ৩৮০-৮১ পৃ.] যুদ্ধের বর্ণনা আছে–
কাট কাট বলি তাজে কলিঙ্গ নৃপতি সাজে
গজঘণ্টা বাজে উতরোল।
সাজ সাজ পড়ে ডাক বাজে দামা রণ-ঢাক
কলিঙ্গে উঠিল গণ্ডগোল ॥
শত শত মত্ত হাতী লইলেন সেনাপতি
শুণ্ডে বান্ধে লোহার মুদ্গর।
* * *
আশী গণ্ডা বাজে ঢোল তের কাহন সাজে কোল
করে ধরে তিন তিরকাঠি।
পরিধান পীতধড়ি মাথাতে জালের দড়ি
অঙ্গে সবে মাখে রাঙা মাটি ॥
বাজন-নূপুর পায় বিবিধ পাইক ধায়
রায়বাশ ধরে খরশান।
সোনার টোপর শিরে ঘন সিংহনাদ পুরে
বাঁশে বান্ধে চামর নিশান ॥
এই বর্ণনায় চারি ঘোড়ায় টানা রথের উল্লেখ আছে। কিন্তু এই যুগের যুদ্ধে রথ ব্যবহার হইত, এরূপ কোন প্রমাণ নাই। সম্ভবত এই বর্ণনায় রামায়ণ-মহাভারতের কিছু প্রভাব আছে। ঢাক, ঢোল, ভেরী, জগঝম্প, দামামা, রণশিঙ্গা, কাংস্য করতাল, কাঁসি, ঘণ্টা, কাড়া প্রভৃতি বাদ্যের শব্দে রণক্ষেত্র মুখরিত হইত।
সমসাময়িক সাহিত্যে নানা প্রকার অস্ত্রশস্ত্রের উল্লেখ দেখা যায়, কিন্তু সবগুলিই ব্যবহৃত হইত কিনা বলা কঠিন। শূল জাতীয়—’নেঞ্জা’ (বর্তমান ল্যাজা), বর্শা, শক্তি বা শেল; কুঠার জাতীয়-পরশু, ডাবুশ, পরশ্বধ, পটিশ; মুগুর জাতীয়–ভূষণ্ডী, ভোমর, মুদার; পাশ ও চক্রেরও উল্লেখ আছে। বাঙালীর প্রধান অস্ত্র ছিল রায়বাশ, ধনুকবাণ, অসি বা খড়গ এবং ঢাল। ‘শ্রীকৃষ্ণকীর্তনে ‘টাকার’ নামে অস্ত্রের উল্লেখ আছে। ইহা ঠিক কোন্ জাতীয়, তাহা বলা যায় না।
ষোড়শ শতাব্দীর প্রথম পাদ শেষ হইবার পূর্বেই বাংলা দেশে যুদ্ধে আগ্নেয়াস্ত্র–কামান, বন্দুক ব্যবহৃত হইত। তখনও উত্তর-ভারতের অন্য কোন অঞ্চলে ইহা প্রচলিত হয় নাই।
যুদ্ধপ্রসঙ্গে মাধবাচার্যের চণ্ডীকাব্যের [৮২ পৃ.। বঙ্গ সাহিত্য পরিচয় পৃ. ৩২৭] নিম্নলিখিত অংশটি বিশেষ প্রণিধানযোগ্য।
পলাইল যোগী পাইক মনে ভয় পায়্যা।
সমরে রহিল কাটামুণ্ড শিরে দিয়া ॥
কর্মকার পাইক বলে করিয়া বিনয়।
বীর গুরু বধিতে তোমার ধর্ম নয় ॥
নট পাইক বলে বাপু আমি পাইক নহি।
বেগার ধরি আনিছে পরের ভার বহি ॥
পলায় বিশ্বাস পাইক ভয় ত্রাস পায়্যা।
আকুল হইয়া কান্দে মুখে হাত দিয়া ॥
যতেক ব্রাহ্মণ পাইক পৈতা ধরি করে।
দন্তে তৃণ ধরি তারা সন্ধ্যা মন্ত্র পড়ে ॥
যত যত যোগী পাইক দণ্ড ধরি করে।
রক্ষ রক্ষ বলি তারা বিনয় ত করে ॥
ইহা হইতে অনুমিত হয় যে ব্রাহ্মণাদি সমস্ত জাতির লোকই সৈনিকের কার্য করিত (অথবা করিতে বাধ্য হইত)। কিন্তু সে যুগে (এবং এ যুগেও) যে ডোম বাগদিরা সমাজের সর্বনিম্নস্তরে অবস্থিত এবং অবহেলিত, তাহারা যে সাহস ও বীরত্বের পরিচয় দিত উচ্চশ্রেণীর বাঙালীরা তাহা পারে নাই। ‘অন্নদামঙ্গলে বর্ধমানের গড়ের যে বর্ণনা আছে তাহাতে ইউরোপীয়, মোগল, পাঠান, ক্ষত্রিয়, রাজপুত, বুন্দেলা প্রভৃতি বিদেশী সৈন্যের কথা আছে কিন্তু বাঙালী হিন্দু সৈন্যের কোন উল্লেখ নাই। ইহাও প্রকারান্তরে উক্ত মতের সমর্থন করে। অবশ্য অন্য প্রমাণের সমর্থন ব্যতীত এই সিদ্ধান্ত সত্য বলিয়া গ্রহণ করা যায় না। কারণ মুসলমানদের ঐতিহাসিক গ্রন্থে বাঙালী পাইকের সাহস বীরত্ব ও সমরকৌশলের ভূয়সী প্রশংসা আছে। আর বাঙালী পাইকের মধ্যে যে উচ্চশ্রেণীয় ছিল না তাহা নিঃসংশয়ে বলা যায় না।
নদীমাতৃক বাংলা দেশে রণতরীর খুব ব্যবহার ছিল এবং নৌযুদ্ধে বাঙালীদের সহিত দিল্লির ফৌজ আঁটিয়া উঠিতে পারিত না।
৮। বিবিধ : মধ্যযুগে সাধারণ লোকের মধ্যে বহু কুসংস্কার প্রচলিত ছিল। মন্ত্র বা ঔষধ দ্বারা উচাটন, বশীকরণ, বন্ধ্যার সন্তানলাভ প্রভৃতির উল্লেখ আছে।
জ্যোতিষ-গণনার প্রতি লোকের অগাধ বিশ্বাস ছিল। শিশুর জন্ম হইবার পরই গণক ডাকাইয়া কোষ্ঠী তৈরী করা হইত। যাত্রা, বিবাহ প্রভৃতি ব্যাপারে শুভদিন দেখিতে হইত। তবে কেহ কেহ ইহা মানিতেন না। ধনপতির বাণিজ্যর যাত্রার সময় দৈবজ্ঞ রাশিচক্র গণনা করিয়া এবং পঞ্জিকা দেখিয়া বলিল :
এমন যাত্রীর সাধু শুন অভিসন্ধি।
এ যাত্রায় লোক গেলে তথা হয় বন্দী ॥
এমন শুনিয়া সাধু মুখ কৈল বাঁকা।
নফরে হুকুম দিয়া মারে ঘাড়ধাক্কা ॥ [কবিকঙ্কণ-চণ্ডী, ২য় ভাগ ৬১৯ পৃ.]
বলা বাহুল্য গণকের গণনা পুরাপুরিই ফলিয়াছিল এবং এই কাহিনী শুনিয়া জ্যোতিষ গণনার প্রতি লোকের বিশ্বাস আরও দৃঢ় হইয়াছিল। ঝাঁড়-ফুঁক, মন্ত্র-তন্ত্র, তুক তাকে লোকের খুব বিশ্বাস ছিল। ওঝা মন্ত্র পড়িয়া ভূত ছাড়াইত, ব্যারাম-পীড়া সারাইত।
গর্ভাধান হইতে আরম্ভ করিয়া জাতকের মৃত্যু পর্যন্ত যে সব লৌকিক আচার অনুষ্ঠান এখনও রক্ষণশীল সমাজে প্রচলিত আছে, মধ্যযুগের সাহিত্যে তাঁহার প্রায় সবগুলিরই উল্লেখ আছে। ধনপতি ও খুল্লনার বিবাহ, অন্তঃসত্ত্বা কালে খুল্লনার অবস্থা ও আনুসঙ্গিক সাধভক্ষণাদির অনুষ্ঠান, তাঁহার পুত্রের জন্ম ও পরবর্তী অনুষ্ঠান, পুত্রের ষষ্ঠী, আটকলাই, নামকরণ, ঘুম-পাড়ানী গান, শ্রীমন্তের বাল্যক্রীড়া, কর্ণবেধ, বিদ্যারম্ভ, উচ্চ শিক্ষা, ধনপতির পিতৃশ্রাদ্ধ প্রভৃতির বিস্তৃত বর্ণনা পড়িতে পড়িতে মনে হয় মধ্যযুগের বাঙালীর সংস্কার ও লৌকিক আচারের বিশেষ কোন পরিবর্তন হয় নাই।
