সোনা, রূপা ও হাতির দাঁতে গয়না তৈরী হইত এবং মণিমাণিক্যে খচিত হইত।
৬। ক্রীড়া-কৌতুক : সে যুগে পাশাখেলা খুব প্রচলিত ছিল। ধনপতি সদাগর গৌড়ের রাজার সহিত “রাত্রিদিন খেলে পাশা ভক্ষণ সময় বাসা”। মেয়ে পুরুষ পাশা খেলায় মত্ত হইয়া কর্তব্য কাজ অবহেলা করিতেন এরূপ বহু কাহিনী আছে। বিষ্ণুপুরে গোল তাস খেলার প্রচলন ছিল। সম্ভবত পর্তুগীজরা এই তাসখেলা আমদানি করে। পায়রা উড়ান প্রতিযোগিতা একটি খুব জনপ্রিয় ক্রীড়া ছিল। আলাওলয়ের পদ্মাবতীতে চৌগাঁ খেলার উল্লেখ আছে। ইহা বর্তমান পোলা (Polo) খেলার ন্যায়। গেণ্ডুয়া অর্থাৎ কাঠের বল লোফালুফির খেলাও প্রচলিত ছিল। ‘শ্রীকৃষ্ণকীর্তনে চচরী খেলার কথা আছে কিন্তু ইহা ঠিক কি রকম খেলা ছিল বলা যায় না। মল্ল ক্রীড়াও জনপ্রিয় ছিল। কবিকঙ্কণ-চণ্ডীতে [প্রথম ভাগ, ৩৫১ পৃ.] আছে–
দোসর যমের দূত বৈসে যত রাজপুত
মল্লবিদ্যা শেখে অবিরতি।
তারপর আখড়া-ঘরে মল্লযুদ্ধ অর্থাৎ কুস্তির বৈঠক হইত। ঘনরামের ধর্মমঙ্গলে [৬২. ৭৯-৮২ পৃ.] মল্লযুদ্ধ বা কুস্তির বিস্তৃত বিবরণ আছে। দৈহিক শক্তির দৃষ্টান্তস্বরূপ লোহার বাঁটুল চূর্ণ করা, বুকে বেলভাঙ্গা, মুঠা করিয়া সরিষা হইতে তৈল নিষ্কাশন, ঊর্ধ্বে তরবারি নিক্ষেপ করিয়া পুনরায় তাহা মুঠার মধ্যে ধরা প্রভৃতি মাণিক গাঙ্গুলীর ধর্মমঙ্গলে আছে।
নৃত্যগীতের খুবই প্রচলন ছিল। চৈতন্য-ভাগবতে রামায়ণের কাহিনী ও কৃষ্ণলীলা অবলম্বনে যাত্রা অভিনয়ের কথা আছে। সীতা হরণের কাহিনী শুনিয়া যবন দর্শকেরাও কাঁদিত এবং দশরথের ভূমিকা অভিনয় করিতে করিতে এক অভিনেতার সত্যসত্যই প্রাণবিয়োগ হইয়াছিল। স্বয়ং শ্রীচৈতন্যও কৃষ্ণলীলার অভিনয় করিতেন। [চৈতন্য-ভাগবত-৫৩, ২৩৭ পৃ.] অনেক বাদ্যযন্ত্রের উল্লেখ আছে–যথা শঙ্খ, ঘণ্টা, ডফ, মৃদঙ্গ, জগঝম্প, ডরু ও বিষাণ।
সর্বাপেক্ষা জনপ্রিয় ছিল পাঁচালী গান। প্রাচীন বাংলা কাব্যগুলি প্রায় সবই ছিল এই শ্রেণীর। প্রধান গায়ক (মূল গায়েন) এক হাতে চামর ও আর এক হাতে মন্দিরা এবং পায়ে নূপুর পরিয়া নাচের ভঙ্গীতে গাহিতেন, সঙ্গে সঙ্গে মৃদঙ্গবাদক তাল দিত। যাত্রাদলের ন্যায় দুইজন দোহারও ধুয়া ধরিত। ইহা ব্যতীত ছিল তরজা ও কবি গান (দুই পক্ষের মধ্যে গানে ও কবিতায় প্রশ্নোত্তরের ও উত্তর প্রত্যুত্তরের প্রতিযোগিতা)। এই শ্রেণীর গানের মধ্যে মাঝে মাঝে অশ্লীলতার প্রাধান্য থাকিত–এগুলিকে খেউড় বলা হইত।
চীনদেশীয় পর্যটকেরা লিখিয়াছেন যে প্রতিদিন খুব ভোরে এক শ্রেণীর পেশাদার লোক ধনী ও উচ্চপদস্থ কর্মচারীদের পাড়ায় দ্বারে দ্বারে গিয়া সানাই, ঢোল প্রভৃতি শ্রেণীর বাদ্য বাজায়। তারপর প্রাতরাশের কালে প্রতি বাড়িতে গিয়া মদ্য, ভোজ্যদ্রব্য, টাকা-পয়সা ও অন্যান্য দ্রব্য উপহার পায়।
চীনারা বাঘের সাথে খেলারও বর্ণনা দিয়াছেন। এক শ্রেণীর লোক বাজারে কিংবা বাড়িতে লোহার শিকলে বাঁধা একটি বাঘ নিয়া যায়। শিকল খুলিয়া দিলে বাঘটি মাটিতে শুইয়া পড়ে। তারপর লোকটি বাঘকে মারিতে থাকে এবং বাঘ উত্তেজিত হইয়া তাঁহার উপর লাফাইয়া পড়ে। লোকটিও বাঘকে লইয়া মাটিতে পড়ে। কয়েকবার এইরূপ করিয়া লোকটি বাঘের গলায় হাত ঢুকাইয়া দেয়। [বাংলার ইতিহাসের দুশো বছর, ২য় সং, পৃ. ৪৭৯] তারপর বাঘটাকে আবার শিকল দিয়া বাঁধিয়া রাখে। খেলা শেষ হইলে দর্শকেরা লোকটিকে টাকা এবং বাঘের খাওয়ার জন্য মাংস দেয়। এটি অনেকটা বর্তমান যুগে সার্কাসের বাঘের খেলার মত।
৭। যুদ্ধ-প্রণালী : মধ্যযুগে বাঙালীরা যে বেশে লড়াই করিত সমসাময়িক সাহিত্যে তাঁহার চিত্র অঙ্কিত হইয়াছে। রূপরাম চক্রবর্তীর ধর্মমঙ্গলে লাউসেনের যুদ্ধকালীন পোশাকের বর্ণনা :
পরিলা ইজার খাসা নাম মেঘমালা।
কাবাই পরিলা দশদিগ করে আলা ॥
পামরি পটুকা দিয়া বান্ধে কোমরবন্ধ।
মোগল ও পাঠান সৈন্যের “কাল ধল রাঙ্গা টুপি সভাকার মাথে” এবং পায়ে মোজা। হাতি ও ঘোড়ার সওয়ার এবং পদাতিক–এই তিন শ্রেণীর সৈন্য ধনুক, খড়গ, ঢাল, বর্শা ও কামান লইয়া কাড়া দামামা বাজাইয়া যুদ্ধযাত্রা করিত। ডোম, হাড়ি প্রভৃতি নিম্নশ্রেণীর পাইকেরা বহু সংখ্যায় সৈন্যদলে যোগ দিত। অধীনস্থ রাজা ও জমিদারেরা হাজার হাজার সৈন্য লইয়া যুদ্ধে যোগ দিত। কেহ চারি হাজার ‘চৌহান সিপাই’, কেহ ‘বিয়াল্লিশ কাহন’ তীরন্দাজ, কেহ সাত হাজার ঘোড়া, কেহ দশ হাজার রাণা, কেহ আট বা আশী হাজার ঢালি নিয়া আসিত। বাগদি সেনাপতির ‘হাতে বালা, কানে সোনা’ এবং তাঁহার পাইকদের ‘কোমরে ঘাঘর, গলায় ওড়ের মালা, হাতে ধনুক বাণ’। পঞ্চাশ হাজার ডোম সৈন্য চলিল :
কড়া বাজে ডিগ-ডিগ টিঙ্গ-টিঙ্গ পড়া।
হাড়ি পাইক সাজিল সর্দার লোহার-গড়া ॥
পায় বাজে নূপুর ঘাঘর বাজে ঢালে।
ঘুরুল্যা বাতাস পারা ঘুরা ঘুরা বুলে ॥
কালু ডোম সেনাপতির পদে উন্নীত হইয়াছিল। তাঁহার স্ত্রীও যুদ্ধ করিত। সৈন্যদলের মধ্যে হিন্দু, মুসলমান, বাঙালী, রাজপুত, উড়িয়া, তেলেঙ্গীর উল্লেখ আছে। কোল সৈন্যেরাও জয়ঢাক বাজাইতে বাজাইতে আসিত। তাহাদের
চিকুরে চিরনি আছে অঙ্গে রাঙামাটি।
জাত্যের স্বভাবে তীর ধরে দিবারাতি ॥ [সুকুমার সেন, মধ্যযুগের বাংলা ও বাঙালী, ৩৩-৩৭ পৃ.]
