… ইত্যাদি। (মধ্যলীলা-১৪শ পরিচ্ছেদ।)
মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যে আরও বহু রন্ধনের ও ভোজনদ্রব্যের বর্ণনা আছে [নারায়ণ দেবের পদ্মা পুরাণ, ৫৬-৫৭ পৃ.। কবিকঙ্কণ-চণ্ডী, দ্বিতীয় ভাগ, ৩৭৯, ৫১৫-১৮, ৬০৮ পৃ.। দ্বিজ হরিরামের ও মাধবাচার্যের চণ্ডীকাব্য ও দ্বিজ বংশীদাসের মনসামঙ্গল (দীনেশচন্দ্র সেন, বঙ্গসাহিত্য পরিচয়, পৃ. ২২১-২৪, ৩৩৫, ৩৩৯)]। সপ্তদশ শতকের আরম্ভে ভারতে গোলআলুর প্রচলন হইয়াছিল। কিন্তু বাংলা সাহিত্যে তাঁহার স্পষ্ট উল্লেখ নাই।
অন্যান্য তান্ত্রিক আচারের সঙ্গে বৈষ্ণবগণ মৎস্য মাংস আহার বর্জন করেন। সুতরাং বৈষ্ণব সাহিত্যে কেবল নিরামিষ ভোজ্যের তালিকা পাই। কিন্তু শাক্ত গ্রন্থে নিরামিষ আমিষ দুইরূপ ভোজ্য দ্রব্যেরই বর্ণনা আছে। নারায়ণ দেবের পদ্ম-পুরাণে বেহুলার বিবাহ উপলক্ষে রন্ধনের বিস্তৃত বর্ণনা আছে [তমোনাশচন্দ্র দাসগুপ্ত সম্পাদিত পদ্মা-পুরাণ, ৫৬-৫৭ পৃ.]। নিরামিষের মধ্যে আছে :
১। বেতআগ = বেতের কচি অগ্রভাগ, স্বাদে তিক্ত। সিদ্ধ করিয়া অথবা সুক্ত ইত্যাদিতে খাওয়া হইত। (ব্যাতাগ?); ২। বাইঙ্গন (বেগুন?); ৩। পাটশাক; ৪। ঘৃতে ভাজা হেলের্চা (হ্যালাঞ্চ?); ৫। লাউয়ের আগ (লাউয়ের ডগা?); ৬। মুগ দাইল আর মুগের বড়ি; ৭। ঘৃতে ভাজা সিঙ্গারি; ৮। তিলুয়া, তিলের বড়া, তিল কুমড়া; ৯। মউয়া আলু; ১০। পাকা কলার অম্বল; ১১। পোর লতার শাক ও আদা দিয়া সুখত (শুক্তা বা শুকতুনি)।
নিরামিষ রান্না সব ঘৃতে সম্ভার হইত।
মৎস্যের ব্যঞ্জন : ১। (বেসন দিয়া) চিথলের কোল ভাজা; ২। মাগুর মৎস্য দিয়া মরিচের ঝোল; ৩। বড় বড় কৈ মৎস্যে কাটার দাগ দিয়া জিরা লবঙ্গ মাখিয়া তৈলে ভাজা; ৪। মহাশৌলের অম্বল; ৫। ইচা (চিংড়ী) মাছের রসলাস; ৬। রোহিত মৎস্যের মুড়া দিয়া মাসদাইল; ৭। আম দিয়া কাতল মাছ; ৮। পাবদা মৎস্য ও আদা দিয়া সুখত (শুকতুনি); ৯। আমচুর দিয়া শৌল মৎস্যের পোনা; ১০। বোয়াল মৎস্যের ঝাটি (তেঁতুল মরিচ সহ); ১১। ইলিস মাছ ভাজা; ১২। বাঁচা, ইচা, শৌল, শৌলপোনা, ভাঙ্গনা, রিঠা, পুঠা (পুঁটিমাছ) ও বড় বড় চিংড়ী মাছ ভাজা।
সমস্ত ভাজাই তৈল দিয়া হইত।
মাংসের ব্যঞ্জন : খাসী, হরিণ, মেষ, কবুতর, কাউঠা (কেঠো, কচ্ছপ) প্রভৃতির মাংস দিয়া নানাবিধ ব্যঞ্জন ও অম্বল।
পিঠা : খিরিসা (ক্ষীরের পিঠা), চন্দ্রপুলি, মনোহরা, নালবড়া, চন্দ্ৰকাতি (চন্দ্ৰকান্তি?), পাতপিঠা।
প্রকাশ্যে মদ্যপান হিন্দু-মুসলমান উভয় সমাজেই নিন্দনীয় ছিল কিন্তু গোপনে মাদক দ্রব্যের খুবই প্রচলন ছিল।
মুসলমানেরা নানাবিধ পশুপক্ষীর মাংস, মিষ্টান্ন এবং তাজা শুকনা ও কাবুলী ফল, আচার প্রভৃতি খাইতে ভালবাসিত। রুটি খাওয়ারও প্রচলন ছিল কিন্তু অধিকাংশ মুসলমানই ভাত খাইত। হিন্দু মুসলমান উভয়েই পান খাইত এবং পান-সুপারি দিয়া অতিথিকে সমাদর করিত।
মানরিক গৌড়ে এক মুসলমান বাড়িতে নিমন্ত্রিত হইয়াছিলেন। ভোজ্য দ্রব্যের এত প্রাচুর্য ছিল যে আহার করিতে তিন ঘণ্টা লাগিয়াছিল।
দরিদ্রদের আহারের ব্যবস্থাও বাংলা সাহিত্যে বর্ণিত হইয়াছে।
ব্যাধ কালকেতুর পশু শিকার করিয়া সচ্ছল অবস্থা হইলে–
চারি হাড়ি মহাবীর খায় খুদ-জাউ।
ছয় হাণ্ডি মুসুরী-সুপ মিশ্যা তথি লাউ।
ঝুড়ি দুই তিন খায় আলু ওল পোড়া।
কচুর সহিত খায় করঞ্জা আমড়া ॥ [কবিকঙ্কণ চণ্ডী, ১ম ভাগ, পৃ. ১৮৮]
কোন কোন দিন হরিণী বেচিয়া দধিরও যোগাড় হইত। কিন্তু যখন শিকার জুটিত না এবং বাসী মাংস বিক্রয় হইত না, তখন ধার করিয়া খুদ ও লবণ আনিয়া ‘বনাতি (নালিতা) শাক’সহ খুদের জাউ দিয়াই উদর পূর্তি করিতে হইত। [কবিকঙ্কণ চণ্ডী, ১ম ভাগ, ২৩০ পৃ.] বাটির অভাবে মাটিতে গর্ত করিয়া তাঁহার মধ্যেই খাদ্য দ্রব্য রাখিয়া খাইতে হইত। [কবিকঙ্কণ চণ্ডী, দ্বিতীয় ভাগ ৬৪৬ পৃ.]
মানরিক লিখিয়াছেন, “গরীব লোকেরা ভাত, লবণ ও শাক এবং সামান্য কিছু তরকারীর ঝোল খাইত। কদাচিৎ দধি ও সস্তা মিঠাই জুটিত। মাছও খুব সুলভ ছিল না। পান্তাভাতের জল (আমানি) গরীবদের প্রধান খাদ্য ছিল।”
প্রাচীন যুগেও বর্তমান যুগের ন্যায় আহারান্তে পান, সুপারি, হরিতকী প্রভৃতি খাওয়ার অভ্যাস ছিল। অভ্যাগতকে পান-সুপারি দিয়া অভ্যর্থনা করা হইত।
৫। পোশাক-পরিচ্ছদ। সেকালে বাঙালী পুরুষেরা ধুতি, চাদর ও স্ত্রীলোকেরা সাধারণত খালি গায়ে শাড়ি পরিত। পুরুষের ‘চরণে পাদুকা’ ও মস্তকে পাগড়ির কথাও কবিকঙ্কণে আছে। লম্বা কোঁচা দিয়া কাপড় পরা হইত। নাগর অর্থাৎ বিলাসীদের রূপা ও ভেলভেটের জুতা, কানে সোনার অলঙ্কার, দেহ চন্দনচর্চিতা ও পরিধানে তসরের বস্ত্র থাকিত। ধনী পুরুষেরা বর্তমান কোটের ন্যায় ‘অঙ্গরাখা’ ও পাগড়ি পরিত। কোমরে পুরুষেরা পটুকা ও স্ত্রীলোকেরা নীবিবন্ধ পরিত। নীবিবন্ধের সঙ্গে কখনও কখনও ঘুঙ্গুর বাঁধা থাকিত। দরবারের পোশাক ছিল আলাদা ইজার, কোমরবন্ধ, কাবাই প্রভৃতি। ধনী স্ত্রীলোকের নানা রংয়ের রেশমের শাড়ীর বিচিত্র বর্ণনা পাওয়া যায়। কোন কোন স্ত্রীলোক পৌরাণিক পালার ছবি আঁকা কাঁচুলি ও ওড়না পরিত। নটীরা ইজার পরিত। গরীব লোকেরা কোমরে নেংটী জড়াইয়াই বেশির ভাগ সময় থাকিত। স্নানের সময় মেয়েরা হলুদ-কুঙ্কুম দিয়া গাত্র এবং আমলকী দিয়া কেশ ধৌত করিত। তারপর কেশ মার্জনা করিয়া ধুপ দিয়া চুল শুকাইত এবং চন্দন দিয়া দেহ লেপন করিত। অভ্রের চিরুনী দিয়া চুল আঁচড়াইত। বাঙালী বেহার, নব বেহার, পচিমা বেহার, দেব মহল প্রভৃতি নামের নানা প্রকার খোঁপা প্রচলিত ছিল। [নারায়ণ দেবের পদ্ম-পুরাণ, ৫০-৫১ পৃ.] সধবা স্ত্রীলোকেরা শাখা, সিন্দুর ও কাজল ব্যবহার করিত। ধনী গৃহিণীরা ‘কস্তুরীর পত্রাবলী’ কপালে, গালে ও স্তনে অঙ্কিত করিত। সমসাময়িক সাহিত্যে বঙ্গনারীর বহুবিধ অলঙ্কারের উল্লেখ আছে; যথা সিঁথি, বেশর (নর্থ), কুণ্ডল (কানবালা), হার, চক্রাবলী, অনন্ত, কেয়ূর, রাজু, তাবিচ, কবচ, জসম, রতনচূড়, শাখা ও খাড়। আরও কয়েকটি নূতন অলঙ্কারের নাম পাওয়া যায়–(১) হীরামঙ্গল কড়ি অথবা মদন কড়ি, সম্ভবত কড়ির ন্যায়। আকৃতির কর্ণভূষণ; (২) গ্রীবাপত্র–সম্ভবত চিক বা হাঁসুলির ন্যায় গলদেশে আঁটিয়া পরা হইত; (৩) হাতপদ্ম-হাতের পাতার উপরের দিকে পরিবার জন্য কঙ্কণের সহিত যুক্ত পদ্মাকৃতি অলঙ্কার; (৪) উজ্বটিকা বা উট সম্ভবত চুটকির ন্যায় পায়ের আঙ্গুলে পরা হইত।
