সম্ভবত সর্বদেশে সর্বযুগেই যুদ্ধ বিগ্রহের সময় সৈন্যদের হস্তে স্ত্রীজাতির লাঞ্ছনা ও অপমানের সীমা থাকে না। মধ্যযুগের বাংলা দেশেও ইহার দৃষ্টান্ত আছে। বহারিস্তান-ই-ঘায়েবি নামক সমসাময়িক প্রামাণিক গ্রন্থে মুঘলসৈন্য কর্ত্তৃক প্রতাপাদিত্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধের কাহিনী বর্ণিত হইয়াছে। গ্রন্থকার নিজেই এই অভিযানের সেনানায়ক ছিলেন। তিনি লিখিয়াছেন যে তাঁহার সৈন্যেরা চারি হাজার স্ত্রীলোক বন্দী করিয়া আনিয়া সকলকে বিবস্ত্রা করিয়া রাখিয়াছিল। সেনাপতি সংবাদ পাইয়া যখন তাহাদিগকে মুক্তি দিবার আদেশ দিলেন, তখনও কাহারও অঙ্গে কোন পরিধান ছিল না। পাজামা, বিছানার চাদর, আলোয়ান প্রভৃতি দ্বারা কোন মতে লজ্জা নিবারণ করিয়া তাহাদিগকে গৃহে পাঠান হইল।
সতীদাহের ন্যায় বর্বরোচিত প্রথা তখনও প্রচলিত ছিল। কোন কোন স্ত্রীলোক স্বেচ্ছায় সতী হইতেন, কোন বাধা মানিতেন না এবং জ্বলন্ত চিতায় ঝাঁপ দিয়াও কোন কাতরতা প্রকাশ করিতেন না। আবার অনিচ্ছুক বিধবাকে শাস্ত্রের দোহাই দিয়া বা অন্য উপায়ে একবার রাজি করাইয়া তারপর সে মরিতে না চাহিলেও তাহাকে জোর করিয়া পোড়াইয়া মারা হইত। প্রত্যক্ষদর্শীরা এই দুই রকমেরই বর্ণনা করিয়াছেন। [১৮১৮ খৃষ্টাব্দে রাজা রামমোহন রায় সরকারের নিকট যে দরখাস্ত করিয়াছিলেন তাহাতে এইরূপ জোর করিয়া পোড়ইয়া মারার বহু দৃষ্টান্ত আছে, এরূপ উল্লেখ করিয়াছেন।]
৪। আহার : সমসাময়িক বাংলা সাহিত্যে বাঙালী হিন্দুর ভোজন-দ্রব্যের যথেষ্ট পরিচয় পাওয়া যায়। ভাঁড়দত্ত রাজাকে ভেট দিবার জন্য লইল কাঁচকলা, পুঁইশাক, কদলীর মোচা, বেগুন, কচু ও মুলা। সুতরাং এগুলি প্রিয় খাদ্যদ্রব্যের মধ্যে পরিগণিত ছিল। চৈতন্যদেব শাক ভালবাসিতেন। তাঁহার মাতা ‘বিংশতি প্রকার শাক’ রাঁধিলেন। ভোজনে বসিয়া প্রভু শাক পাইয়া খুব খুশী হইলেন এবং অচ্যুতা, পটোল, হেলঞ্চা প্রভৃতি শাকের মহিমা কীর্তন করিলেন। [চৈতন্য-ভাগবত-অন্ত্যখণ্ড, ৪র্থ অধ্যায়]
ভোজন বিলাসেরও অনেক বর্ণনা আছে :
ওদন পায়স পিঠা পঞ্চাশ ব্যঞ্জন মিঠা
অবশেষে ক্ষীর খণ্ড কলা ॥
‘চৈতন্যচরিতামৃতে সার্বভৌমের গৃহে চৈতন্যদেবের যে ভোজনের বর্ণনা আছে তাহাতে নিরামিষ আহার্যের বিপুল বর্ণনা পাই :
পীত সুগন্ধি ঘৃতে অন্ন সিক্ত কৈল।
চারিদিকে পাতে [কলার পাতা] ঘৃত বাহিয়া চলিল ॥ ২০৬
কেয়াপত্র কলার খোলা ডোঙ্গা সারি সারি।
চারিদিগে ধরিয়াছে নানা ব্যঞ্জন ভরি ॥ ২০৭
দশ প্রকার শাক, নিম্ব সুকুতার ঝোল।
মরিচের ঝাল, ছানাবড়া, বড়ী, ঘোল ॥ ২০৮
দুগ্ধতুষী, দুগ্ধকুষ্মাণ্ড, বেসারি, লাফরা।
মোচা ঘণ্ট, মোচা ভাজা বিবিধ শাকরা ॥ ২০৯
বৃদ্ধকুম্মাণ্ডবড়ীর ব্যঞ্জন অপার।
ফুলবড়ী ফলমূলে বিবিধ প্রকার ॥ ২১০
নব-নিষপত্রসহ ভৃষ্ট বার্তাকী।
ফুল বড়ী পটোলভাজা কুণ্ড মানচাকী ॥ ২১১
ভৃষ্ট-মাষ, মুদ্গসূপ অমৃতে নিন্দয়।
মধুরা বড়াম্লাদি অম্ল পাঁচ ছয় ॥ ২১২
মুদাবড়া মাঝবড়া কলাবড়া মিষ্ট ॥
ক্ষীরপুলী নারিকেলপুলী আর যত পিষ্ট ॥ ২১৩
কাঞ্জিবড়া দুগ্ধচিড়া দুগ্ধলকলকী।
আর যত পিঠা কৈল কহিতে না শকি ॥ ২১৪
ঘৃতসিক্ত পরমান্ন মৃকুণ্ডিকা ভরি।
চাপাকলা ঘনদুগ্ধ আম্র তাহা ধরি ॥ ২১৫
রসালা, মথিত দধি, সন্দেশ অপার।
গৌড়ে উৎকলে যত ভক্ষ্যের প্রকার ॥ ২১৬
(‘চৈতন্যচরিতামৃত, মধ্যলীলা, পঞ্চদশ পরিচ্ছেদ)
আর এক শ্রেণীর ভক্ষ্যদ্রব্যের কথা ‘‘চৈতন্যচরিতামৃতে’ পাওয়া যায়। রাঘব পণ্ডিত যখন অন্যান্য ভক্তগণ সহ প্রভুর দর্শনের জন্য প্রতি বৎসর নীলাচলে যাইতেন তখন সংবৎসরের উপযোগী এই সমুদয় দ্রব্য ঝালিতে করিয়া লইয়া যাইতেন। ইহার মধ্যে থাকিত :
আম্রকাসুন্দী আদাকাসুন্দী ঝালকাসুন্দী নাম।
নেষু আদা আম্র-কোলি [কুল] বিবিধ বিধান ॥ ১৪
আমসী আম্রখণ্ড তৈলা আমতা।
যত্ন করি গুণ্ডি করি পুরাণ সুকুতা [পুরাতন পাটপাতা] ॥ ১৫
* * *
ধনিয়া মহুরী [মৌরী]-তণ্ডুল চূর্ণ করিয়া।
লাড় বান্ধিয়াছে চিনি পাক করিয়া ॥ ২০
শুণ্ঠিখণ্ড নাড় আর আমপিত্তহর।
পৃথক পৃথক বান্ধি বস্ত্রের কোথলী ভিতর ॥ ২১
কোলি শুণ্ঠি কোলিচূর্ণ কোলিখণ্ড আর।
কত নাম লৈব, শত প্রকার আচার ॥ ২২
নারিকেলখণ্ডনাড় আর নাড় গঙ্গাজল।
চিরস্থায়ী খণ্ডবিকার করিল সকল ॥ ২৩
চিরস্থায়ী ক্ষীরসার মণ্ডাদি বিকার।
অমৃত কর্পূর আদি অনেক প্রকার ॥ ২৪
শালিকাঁচুটি-ধান্যের আতব-চিড়া করি।
নূতন বস্ত্রের বড় থলী সব ভরি ॥ ২৫
কথোক চিড়া হুড়ুম [মুড়ি] করি ঘৃতেতে ভাজিয়া।
চিনি পাকে নাড় কৈল কপূরাদি দিয়া ॥ ২৬
শালিতণ্ডুলভাজা চূর্ণ করিয়া।
ঘৃতসিক্ত চূর্ণ কৈল চিনি পাক দিয়া ॥ ২৭
কর্পূর মরিচ এলাচি লবঙ্গ রসবাস [কাবাব চিনি]।
চূর্ণ দিয়া নাড় কৈল পরম সুবাস ॥ ২৮
শালিধান্যের খৈ পুন ঘৃতেতে ভাজিয়া।
চিনি পাকে উখরা [মুড়কি] কৈল কপূরাদি দিয়া ॥ ২৯
ফুটকলাই চূর্ণ করি ঘৃতে ভাজাইল।
চিনিপাকে কপূরাদি দিয়া নাড় কৈল ॥৩০
(‘চৈতন্যচরিতামৃত, অন্ত্যলীলা-দশম পরিচ্ছেদ)
ফল ও মিষ্টান্নের তালিকায় আছে :
“ছেনা [ছানা] পানা [সরবৎ] পৈড় [পেঁড়া] আম্র নারিকেল কাঁঠাল।
নানাবিধ কদলক আর বীজতাল [তালশাঁস] ॥ ২৪
নারঙ্গ ছোলঙ্গ টাবা কমলা বীজপুর [পাঁচ জাতীয় লেবুর নাম]।
বাদাম ছোহরা দ্রাক্ষা পিণ্ড খর্জুর [পর্তুগীজেরা যে অনেক নূতন ফল এদেশে আমদানি করিয়াছিল তাহা অন্যত্র উল্লিখিত হইয়াছে] ॥ ২৫
মনোহরা-লাড় আদি শতেক প্রকার।
অমৃত গুটিকা আদি ক্ষীরসা অপার ॥ ২৬
