কিন্তু এইরূপ কয়েকটি মহিলার কথা জানা গেলেও অষ্টাদশ শতাব্দীতে স্ত্রীশিক্ষার [শ্রীব্রজেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, চতুস্পাঠী যুগে বিদুষী বঙ্গমহিলা (৭-১১ পৃ.)] খুব বেশি প্রচলন ছিল না। সম্ভ্রান্ত ঘরে এবং বৈষ্ণব সম্প্রদায়ে মেয়েদের শিক্ষাদানের ব্যবস্থা ছিল। কিন্তু সাধারণ গৃহস্থ ঘরে মেয়েদের লেখাপড়ার প্রথা এক রকম উঠিয়া গিয়াছিল বলিলেও অত্যুক্তি হইবে না। ইহার প্রধান কারণ দুইটি। প্রথমত, হিন্দুদের দৃঢ় বিশ্বাস জন্মিয়াছিল যে লেখাপড়া শিখিলে মেয়ে বিধবা হইবে। দ্বিতীয়ত, বাল্যাবস্থা পার হইতে না হইতেই মেয়েদের বিবাহ দেওয়ার রীতি। সপ্তম বৎসরে কন্যাদান খুব প্রশংসনীয় ছিল এবং দশ বৎসরের অধিক বয়স পর্যন্ত কন্যার বিবাহ না দিলে গৃহস্থ নিন্দনীয় হইতেন এবং ইহা অমঙ্গলের কারণ বলিয়া বিবেচিত হইত।
মঙ্গলকাব্যগুলিতে বিবাহের বিস্তৃত বর্ণনা আছে। ইহা পড়িলে মনে হয় উনবিংশ শতাব্দীর শেষে অর্থাৎ অতি আধুনিক যুগের পূর্ব পর্যন্ত রক্ষণশীল হিন্দু পরিবারে এখনও যে সব অনুষ্ঠান প্রচলিত আছে তাহাই মধ্যযুগেও ছিল। অধিবাস, বাসি বিবাহ, বাসর ঘরে পুরস্ত্রীদের নির্লজ্জ ও অশ্লীল আচরণ, কুখাদ্য দিয়া জামাইয়ের সঙ্গে কৌতুক প্রভৃতির বিস্তৃত বর্ণনা মঙ্গলকাব্যগুলিতে আছে।
একটি বিষয়ে মধ্যযুগে বিবাহ-প্রথা বর্তমান যুগের প্রথা হইতে ভিন্ন ছিল। এখন কন্যার পিতা বর-পণ দেন-তখন বরের পিতা কন্যা-পণ দিতেন। নিম্নশ্রেণীর মধ্যে এখনও এই প্রথা প্রচলিত আছে; কিন্তু ক্রমশ বর-পণের প্রথা প্রচলিত হয়।
অল্প বয়সে বিবাহ হওয়ায় বালিকাবধূর শ্বশুরবাড়ি গমনের কালে বিয়োগ বিধুরা কন্যা ও তাঁহার মাতা, ভ্রাতা, ভগ্নীর ব্যথা সে যুগের ছড়ায় ধ্বনিত হইয়াছে।
ভাঙ্গা নাও মাদারের বৈঠা ঢলকে ওঠে পানি।
ধীরে ধীরে বারে মাঝি আমি মায়ের (ভাইয়ের, বুনের) কান্দন শুনি ॥
বাল্যবিবাহের ফলে বাল্যবিধবার সংখ্যাও অনেক ছিল। বর্তমান কালের বিধবাদের ন্যায়ই তাহাদের অশন-বসন-ভূষণ নিয়ন্ত্রিত ছিল। তবু শোকার্ত পিতা-মাতা নিয়ম লঙ্ন না করিয়া বাল্যবিধবা কন্যার শাঁখা সিন্দুরের অভাব দূর করিতে চেষ্টা করিতেন। ক্ষেমানন্দের মনসামঙ্গলে আছে :
“খনি বদলে দিব কাঁচা পাটের শাড়ী।
শঙ্খ (শাখা) বদলে দিব সুবর্ণের চূড়ী।
সিন্দুর বদলে দিব ফাউগের গুঁড়ি ॥”
এ বিষয়ে স্মার্ত রঘুনন্দনের ব্যবস্থা ছিল অতি কঠোর। একাদশীতে বালিকা, বৃদ্ধা সকল বিধবাকেই একেবারে উপবাসী থাকিতে হইবে। বর্তমান যুগেও কোন কোন রক্ষণশীল পরিবারে এই নিষ্ঠুর বিধান নিতান্ত বালিকা বয়সের বিধবাকেও পালন করিতে দেখা গিয়াছে। অষ্টাদশ শতাব্দীর মধ্যভাগে মহারাজা রাজবল্লভ বিধবা বিবাহ প্রবর্তনের চেষ্টা কৰ্বিয়াছিলেন। কিন্তু মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্রের প্রতিকূলতায় কৃতকার্য হন নাই।
পুরুষের বহুবিবাহ তখন খুবই প্রচলিত ছিল। সতীনের দুঃখ এবং প্রতিকার স্বরূপ নানা প্রকার ঔষধ খাওয়াইয়া ও অন্যান্য প্রক্রিয়া দ্বারা স্বামী বশ করার কথা অনেক মঙ্গলকাব্যে উল্লিখিত হইয়াছে। পুরুষের বহুবিবাহের ফলে পারিবারিক অশান্তির কথা সমসাময়িক সাহিত্যে প্রতিধ্বনিত হইয়াছে। ব্রাহ্মণ কুলীনকন্যার দুঃখের কাহিনী পূর্বে বর্ণিত হইয়াছে।
বিবাহের সময় নববধূর সঙ্গে অসংখ্য যুবতী দাসী এমন কি বধূর ভগ্নীকেও যৌতুক স্বরূপ দেওয়া হইত। এই প্রথা নাকি আধুনিক যুগেও উড়িষ্যায় ও অন্যান্য স্থানে প্রচলিত ছিল।
সমাজে যে স্ত্রীলোকের সতীত্বের সম্বন্ধে সন্দেহ ও অবিশ্বাস প্রচলিত ছিল, কবিকঙ্কণ-চণ্ডীতে তাঁহার আভাস পাওয়া যায়। খুল্লনা বনে বনে ছাগল চরাইত, এইজন্য তাঁহার স্বামী ধনপছি সওদাগরের কুটুম্বগণ তাঁহার সতীত্বে সন্দেহ প্রকাশ করিল এবং যতক্ষণ বিধিমতে তাঁহার সতীত্ব পরীক্ষা না হয় ততদিন তাঁহার গৃহে ভোজন করিতে অস্বীকার করিল। পণ্ডিতদের ব্যবস্থামত খুল্লনাকে ক্রমে ক্রমে জলেডোবা, সর্পদংশন, অগ্নিদহন, জতুগৃহদাহ, প্রভৃতি নানাবিধ “দিব্য পরীক্ষা দিয়া নির্দোষিতা প্রমাণ করিতে হইল। এই সমুদয় “দিব্য পরীক্ষার কতটা প্রাচীন প্রথা অনুযায়ী কবির কল্পনা আর কতটা বাস্তব সত্য তাহা বলা শক্ত। [দিব্য পরীক্ষা দ্বারা দোষ নির্ণয়ের কথা অন্যান্য কাব্যেও আছে। বর্তমানকালের জল পড়া, চাউল পড়া, নল চালা, বাটি চালা প্রভৃতি ইহার স্মৃতি বহন করিতেছে। ইউরোপের অনেক দেশে দিব্য পরীক্ষার প্রথা মধ্যযুগেও প্রচলিত ছিল।] কিন্তু ইহার পশ্চাতে যে কুলবধূর সতীত্ব সম্বন্ধে সন্দেহের ও অবিশ্বাসের ভাব বিদ্যমান তাহাতে সন্দেহ নাই। ইহার আর একটি প্রমাণও আছে। ধনপতি সদাগর যখন দীর্ঘকালের জন্য দূরদেশে বাণিজ্যযাত্রা করেন তখন খুল্লনা ছয় মাস গর্ভবতী। পাছে খুল্লনার সন্তান হইলে কোন নিন্দা হয় এইজন্য ধনপতি এক “জয়পত্র লিখিলেন :
অশেষ মঙ্গল-ধাম খুল্লনা যুবতী ॥
তোরে আশীর্বাদ প্রিয়া পরম পিরীতি।
সন্দেহ ভঞ্জন পত্র করিল নির্মিতি ॥
যখন তোমার গর্ভ হইল ছয় মাস।
সেই কালে নৃপাদেশে যাই পরবাস ॥ [কবিকঙ্কণ-চণ্ডী, দ্বিতীয় ভাগ-৬১৮ পৃ]
মধ্যযুগে হিন্দু সমাজে স্ত্রীলোকের অবরোধ প্রথা ছিল কিনা তাহা নিশ্চয় করিয়া বলা যায় না। ‘শ্রীকৃষ্ণকীর্তনে রাধা ও অন্যান্য গোপীগণের স্বচ্ছন্দ ভ্রমণের বিবরণ হইতে মনে হয় অবরোধ প্রথা অথবা ঘোমটার প্রচলন তখনও হয় নাই। কিন্তু কৃত্তিবাসের রামায়ণে দেখিতে পাই যে সীতার চতুর্দোল কাপড় দিয়া ঘেরা হইয়াছিল।
