নদীয়া ব্যতীত আরও কয়েকটি সংস্কৃত শিক্ষার কেন্দ্র ছিল। বাঁশবেড়িয়াতে অনেকগুলি চতুষ্পাঠী ছিল–এগুলিতে প্রধানত ন্যায়শাস্ত্রের অধ্যাপনা হইত। ত্রিবেণী, কুমারহট্ট, ভট্টপল্লী, গোলপাড়া, ভদ্রেশ্বর, জয়নগর, মজিলপুর, আন্দুল
ও বালিতে বহুসংখ্যক চতুষ্পঠী ছিল।
সংস্কৃত সাহিত্যে, বিশেষত স্মৃতি ও ন্যায়ের চর্চ্চায় যে ব্রাহ্মণেরাই অগ্রণী ছিলেন সে বিষয়ে কোন সন্দেহ নাই। তবে অন্যান্য জাতীয় লোকেরা, বিশেষত বৈদ্য জাতি, যে সংস্কৃত শাস্ত্রে অভিজ্ঞ ছিল তাঁহারও বহু প্রমাণ আছে। কয়েকজন মুসলমান পণ্ডিতও নানা সংস্কৃত শাস্ত্রে অভিজ্ঞ ছিলেন। পূর্ব্বোক্ত আলাওল ইহার এক প্রকৃষ্ট দৃষ্টান্ত। ধর্মঠাকুরের পূজারী সাধারণতঃ নীচ জাতীয় হইলেও সংস্কৃত চর্চ্চা করিতেন। শ্রীযুক্ত সুকুমার সেন লিখিয়াছেন : “দক্ষিণ রাঢ়ে স্থানে স্থানে এখনও ডোম ও বাগদী পণ্ডিতের টোল আছে। সেখানে ব্যাকরণ, কাব্য ইত্যাদির পঠন-পাঠন হয় এবং বামুনের ছেলেরাও পড়ে।” [সুকুমার সেন, মধ্যযুগের বাংলা ও বাঙালী, ৪৩ পৃ.] কয়েকজন স্ত্রীলোকও সংস্কৃত কাব্য ও বাংলা পদাবলী রচনা করিয়াছিলেন ও পাণ্ডিত্যের অধিকারী ছিলেন।
বাংলা দেশের নানা স্থানে সংস্কৃত শিক্ষার জন্য বহু চতুস্পাঠী ও টোল ছিল। বর্ধমানের এক চতুষ্পঠীতে দ্রাবিড়, উকল, কাশী, মিথিলা প্রভৃতি স্থানের ছাত্র ছিল। [রামপ্রসাদের গ্রন্থাবলী পৃ. ৫। এই গ্রন্থে পাঠ্য বিষয়েও বর্ণনা আছে। (পৃ. ৫০-১)] রূপরাম চক্রবর্তীর আত্ম-কাহিনীতে আছে যে তিনি বাল্যকালে রঘুরাম ভট্টাচার্যের টোলে অমরকোষ, সংক্ষিপ্তসার ব্যাকরণ, পিঙ্গলের ছন্দঃসূত্র অথবা প্রাকৃতপৈঙ্গল এবং শিশুপালবধ, রঘুবংশ, নৈষধচরিত প্রভৃতি কাব্য পাঠ করিয়াছিলেন।
কবিকঙ্কণ-চণ্ডীতে শ্রীমন্তের বিদ্যাশিক্ষা প্রসঙ্গে সুদীর্ঘ পাঠ্য বিষয়ের তালিকা হইতে তৎকালে এই সম্বন্ধে একটি ধারণা করা যায়। প্রথমেই আছে :
রক্ষিত পঞ্জিকা টীকা ন্যায় কোষ নাটিকা
গণবৃত্তি আর ব্যাকরণ।
তারপর পিঙ্গলের ছন্দঃসূত্র, দণ্ডী, ভারবি, মাঘ, জৈমিনি মহাভারত, নৈষধ, মেঘদূত, কুমারসম্ভব, সপ্তশতী, রাঘবপাণ্ডবীয়, জয়দেব, বাসবদত্তা, কামন্দকীদীপিকা, ভাস্বত, বামন, হিতোপদেশ, বৈদ্য ও জ্যোতিষ শাস্ত্র, স্মৃতি, আগম, পুরাণ প্রভৃতি।
প্রাথমিক শিক্ষা এবং বাংলা ভাষায় উচ্চশিক্ষার কি ব্যবস্থা ছিল তাহা বলা কঠিন। মধ্যযুগের শেষে অর্থাৎ অষ্টাদশ শতাব্দীতে প্রাথমিক শিক্ষার ব্যবস্থা সম্বন্ধে একটি মোটামুটি ধারণা করা যায়। গ্রামে খড়ের ঘরে, কোন বাড়ির চণ্ডীমণ্ডপে বা খোলা জায়গায় পাঠশালা বসিত। গুরুমহাশয়েরা খুব সামান্যই বেতন পাইতেন; কিন্তু ছাত্ররা বিদ্যা সাঙ্গ করিয়া গুরুদক্ষিণা দিত। গুরুমহাশয়েরা বেতের ব্যবহারে কোন কার্পণ্য করিতেন না। হাত-পা বাঁধা, বুকের উপর চাপিয়া বসা প্রভৃতি শাস্তি র ব্যবস্থাও ছিল। সাধারণত গুরুমহাশয়দিগের বিদ্যা-বুদ্ধি খুব সামান্যই থাকিত। ছাত্রেরা ছয় সাত বৎসর পাঠশালায় থাকিয়া বাংলা পড়িতে ও লিখিতে পারিত এবং কিছু কিছু গণিত শিখিত। কড়ি ও পাথরের কুচি দিয়া সংখ্যা গণনা, যোগ বিয়োগ শিক্ষা দেওয়া হইত। হিসাব রাখা, চিঠিপত্র, দলিল ও দরখাস্ত লেখা প্রভৃতি প্রয়োজনীয় শিক্ষা পাঠশালাতেই হইত। শিশুরা প্রথমে বালির উপর খড়ের কুটা দিয়া লিখিত। তারপর খড়ি দিয়া মাটির মেজেতে লিখিত। ক্রমে ক্রমে কলাপাতায়, তালপাতায়, খাগ বা বাঁশের কঞ্চি দিয়া লেখা অভ্যাস করিত। তুলা দিয়া কাগজ তৈরি হইত–যাহারা তৈরি করিত তাহাদিগকে কাগজী বলিত। এই তুলট কাগজ ছাড়া তালপাতা ও ভূর্জপত্রে পুঁথি লেখা হইত। হরিতকী ও বয়ড়ার রস প্রদীপের কাল ভূষায় মিশাইয়া কালী তৈরি হইত।
ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথমে শতকরা আটজনের বেশি ছাত্র পাঠশালায় পড়িত না এবং ছয়জনের বেশি লেখাপড়া জানিত না। তবে এই সংখ্যা সমস্ত মধ্যযুগের পক্ষেই প্রযোজ্য কিনা বলা শক্ত।
টোল ও চতুস্পাঠীতে সংস্কৃত ভাষায় উচ্চশিক্ষা হইত। সাধারণত গুরুর গৃহেই অধ্যয়ন ও অধ্যাপনা চলিত। ইহার ব্যয়ের জন্য রাজা ও ধনী লোকেরা বার্ষিক বৃদ্ধি দিতেন।
পাঠশালা ছাড়াও কীর্তন, কথকতা, যাত্রা প্রভৃতি দ্বারা লোক-শিক্ষার ব্যবস্থা ছিল।
৩। স্ত্রীজাতির অবস্থা : সমসাময়িক সাহিত্যে মেয়েদের পাঠশালায় যাওয়া এবং প্রাথমিক শিক্ষা লাভের কথা আছে। সুতরাং তাহারা মোটামুটি লিখিতে পড়িতে জানিত। ‘কবিকঙ্কণ-চণ্ডী’তে লহনা, ও খুল্লনা ও লীলাবতীর পত্র লেখা ও পত্র পাঠের উল্লেখ আছে। দয়ারামের ‘সারদামঙ্গলে’ রাজকুমার ও রাজকুমারীদের এবং রাসসুন্দরীর আত্মচরিতে ছেলেমেয়েদের একত্রে পাঠশালায় যাওয়ায় কথা আছে। দুই এক স্থলে–যেমন রামপ্রসাদের ‘বিদ্যাসুন্দর ও ভারতচন্দ্রের ‘অন্নদামঙ্গলে–নায়িকা বিদ্যার উচ্চশিক্ষার উল্লেখ আছে, কিন্তু ইহা কতদূর বাস্তব সত্য তাহা বলা যায় না। রাণী ভবানীও সুশিক্ষিতা ছিলেন বলিয়া প্রসিদ্ধি আছে। তবে অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষ ভাগেও বাংলায় কয়েকজন বিদুষী মহিলা ছিলেন। দৃষ্টান্ত স্বরূপ হটী বিদ্যালঙ্কার, হটু বিদ্যালঙ্কার, প্রিয়ম্বদা দেবী, বিক্রমপুরের আনন্দময়ী দেবী এবং কোটালিপাড়ার বৈজয়ন্তী দেবীর সংস্কৃত ভাষায় পাণ্ডিত্যের উল্লেখ করা যাইতে পারে। ইঁহাদের মধ্যে হটী বিদ্যালঙ্কার সমধিক প্রসিদ্ধ। রাঢ় দেশের এই কুলীন বালবিধবা ব্রাহ্মণকন্যা সংস্কৃত ব্যাকরণ, কাব্য, স্মৃতি ও নব্যন্যায়ে পারদর্শী হইয়া কাশীতে একটি চতুম্পাঠী স্থাপন করেন ও বিদ্যালঙ্কার উপাধিতে ভূষিত হন। ইনি সভায় ন্যায়শাস্ত্রের বিচার করিতেন ও পুরুষ ভট্টাচার্যের ন্যায় বিদায় লইতেন। ১৮১০ খ্রীষ্টাব্দে ইনি বৃদ্ধ বয়সে প্রাণত্যাগ করেন। রূপমঞ্জরী, ওরফে হটু বিদ্যালঙ্কার, রাঢ়দেশবাসী নারায়ণ দাসের কন্যা। ব্রাহ্মণবংশে জন্ম না হইলেও নারায়ণ দাস কন্যাকে লেখাপড়া শিখাইয়াছিলেন এবং তাঁহাদের মেধাশক্তি দেখিয়া ষোল সতর বৎসর বয়সের সময় এক ব্রাহ্মণ বৈয়াকরণিকে গৃহে রাখেন। রূপমঞ্জরী গুরুগৃহে টোলের ছাত্রদের সঙ্গে ব্যাকরণ পড়িতেন। তারপর সাহিত্য, আয়ুর্বেদ ও অন্যান্য শাস্ত্র অধ্যয়ন করেন। অনেকে তাঁহার নিকট ব্যাকরণ, চরকসংহিতা ও নিদান প্রভৃতি বৈদ্যশাস্ত্র অধ্যয়ন করিত। অনেক কবিরাজ চিকিৎসাসম্বন্ধে তাঁহার উপদেশ গ্রহণ করিতেন। তিনি চিরকুমারী ছিলেন, মাথা মুড়াইয়া ব্রাহ্মণ পণ্ডিতদের মত শিখা রাখিতেন এবং পুরুষের মত উত্তরীয় ব্যবহার করিতেন। প্রায় একশত বৎসর বয়সে (বাংলা ১২৮২ সন) তাঁহার মৃত্যু হয়।
