রঘুনাথ শিরোমণি পঞ্চদশ শতকের শেষার্ধে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি বাসুদেব সার্বভৌমের শিষ্য ছিলেন। শ্রীচৈতন্যদেবের জন্মের অব্যবহিত পূর্বে নবদ্বীপে যবনরাজ যে অত্যাচার করেন তাঁহার বিবরণ জয়ানন্দের ‘চৈতন্যমঙ্গল হইতে পরে উদ্ধৃত হইয়াছে। এই অত্যাচারের বর্ণনা করিয়া উপসংহারে জয়ানন্দ লিখিয়াছেন :
বিশারদসুত সার্বভৌম ভট্টাচার্য।
সবংশে উৎকল গেলা ছাড়ি গৌড় রাজ্য ॥
উকলে প্রতাপরুদ্র ধনুর্ময় রাজা।
রত্ন-সিংহাসনে সার্বভৌমে কৈল পূজা ॥
সার্বভৌম বহুদিন পুরীধামে অবস্থান এবং মহাবৈদান্তিক পণ্ডিত বলিয়া খ্যাতি ও বিপুল রাজসম্মান লাভ করেন। চৈতন্যদেব বহু তর্ক-বিতর্কের পর তাঁহাকে বৈদান্তি কের মায়াবাদ হইতে ভক্তিবাদে বিশ্বাস করান। প্রৌঢ় বাসুদেব তরুণ যুবক সন্ন্যাসীর ভক্তিবাদে দীক্ষিত হন। বাংলার এই দুই সুসন্তান সুদীর্ঘকাল উড়িষ্যায় বসবাস করিয়া যে রাজসম্মান ও লোকপ্রিয়তা অর্জন করেন তাহা একাধারে বাংলার পাণ্ডিত্য ও গৌরব সূচিত করে।
মধ্যযুগে বাংলায় সাত্ত্বিক প্রকৃতি ও পণ্ডিতাগ্রগণ্য অনেক ব্রাহ্মণের নাম পাওয়া যায়। আবার ঐশ্বর্যশালী ভোগবিলাসী ব্রাহ্মণেরও উল্লেখ আছে। চৈতন্যভাগবতে পুণ্ডরীক বিদ্যানিধির সভার যে বর্ণনা আছে তাহা প্রায় রাজসভার সদৃশ :
দিব্য খট্টা হিঙ্গুল-পিত্তলে শোভা করে।
দিব্য চন্দ্রাতপ তিন তাঁহার উপরে ॥
তঁহি দিব্য শয্যা শশাভে অতি সূক্ষ্মবাসে।
পট্ট-নেত বালিস শোভয়ে চারিপাশে ॥
… … …
দিব্য ময়ূরের শাখা লই দুই জনে।
বাতাস করিতে আছে দেহে সর্বক্ষণে। [চৈতন্য ভাগবত, মধ্য-৭ম অধ্যায়]
… … …
পরম ভক্ত পুণ্ডরীক চৈতন্যের অতিশয় প্রিয়পাত্র ছিলেন; কিন্তু তিনি বিষয়ীর মত থাকিতেন। সুতরাং এই চিত্র যে অন্তত বিষয়ী বিত্তশালী ব্রাহ্মণের পক্ষে প্রযোজ্য সে বিষয়ে সন্দেহ নাই।
পণ্ডিতদের রাজসম্মানও অনেকটা রাজসিক ভাবেরই ছিল। রায়মুকুট বৃহস্পতি মিশ্র কেবল স্মার্ত পণ্ডিত ছিলেন না, তিনি রঘুবংশ, মেঘদূত, কুমারসম্ভব, শিশুপালবধ, গীতগোবিন্দ প্রভৃতি কাব্যের এবং অমরকোষের টীকাও লিখিয়াছিলেন। [Indian Historical Quarterly. XVII, 458 ff. XXIX, 183] গৌড়েশ্বর জলালুদ্দীন এবং বারবক শাহ তাঁহাকে বহু সম্মান প্রদর্শন করিয়াছিলেন এবং তিনি উজ্জ্বল মণিময় হার, দ্যুতিমান কুণ্ডলদ্বয়, দশ অঙ্গুলির জন্য রত্নখচিত ভাস্বর ঊর্মিক (রতনচূড়) প্রভৃতি পুরস্কার পাইয়াছিলেন। তারপর নৃপতি তাঁহাকে হস্তিপৃষ্ঠে বসাইয়া স্বর্ণ-কলসের জলে অভিষেকান্তে ছত্র, হস্তী ও অশ্ব এবং রায়মুকুট উপাধি দান করেন। [রায়মুকুট সম্ভবত উচ্চ রাজপদে অধিষ্ঠিত ছিলেন; সুতরাং এই সমুদয় সম্মান কেবল পাণ্ডিত্যের জন্য না হইতেও পারে। রায়মুকুট সম্বন্ধে অনেক তর্কবিতর্ক হইয়াছে (Ind. Hist. Quarterly (XVII, 442; XVIII, 75; XXVIII, 215; XXIX, 183; XXX, 264 দ্রষ্টব্য)। রায়মুকুট ১৪৭৪ খ্রীষ্টাব্দে জীবিত ছিলেন, সুতরাং তাঁহার পুত্রেরা এবং সম্ভবত তিনিও সুলতান বারবক শাহের অনুগ্রহভাজন ছিলেন।] বৃহস্পতির পুত্রেরা রাজমন্ত্রী পদ লাভ করেন; কিন্তু তাহা সত্ত্বেও তাঁহারা দিবিজয়ী পণ্ডিতরূপে খ্যাতিলাভ করিয়াছিলেন।
জমিদার ও ধনী লোকেরা বার্ষিক বৃত্তি অথবা ভূসম্পত্তি দান করিয়া ব্রাহ্মণ পণ্ডিতদের ভরণপোষণ করিতেন। অষ্টাদশ শতাব্দীতে নাটোরের রাণী ভবানী ও নদীয়ার মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্র বহু সংখ্যক পণ্ডিত ও টোলের ছাত্রদিগকে বৃত্তি দিয়া সংস্কৃত শিক্ষায় সাহায্য করিয়াছেন।
সে যুগে প্রাচীন কালের রাজাদের ন্যায় ব্রাহ্মণ পণ্ডিতেরা দিগ্বিজয়ে বাহির হইতেন। বিদ্যাবত্তার জন্য প্রসিদ্ধ বহু স্থানে বিতর্ক সভায় অপর সকল পণ্ডিতকে পরাজয় করিতে পারিলে তাঁহার দিগ্বিজয়ী উপাধি হইত। চৈতন্যের সময়ে নবদ্বীপে এইরূপ এক দিগ্বজয়ী পণ্ডিত আসিয়াছিলেন। চৈতন্য-ভাগবতে ইহার যে বর্ণনা আছে তাহাতে বিশেষ লক্ষ করিবার বিষয় যে এই দিগ্বিজয়ী পণ্ডিত “পরম-সমৃদ্ধ অশ্বগজযুক্ত” হইয়া আসিয়াছিলেন। আরও অনেক আখ্যান হইতে জানা যায় যে বড় বড় পণ্ডিতগণ তখন হাতি বা ঘোড়ায় চড়িয়া বহু লোকলস্কর সঙ্গে লইয়া চলিতেন।
বাংলা দেশের পণ্ডিতগণের মধ্যে প্রবাদ আছে যে মিথিলার নৈয়ায়িক পণ্ডিত পক্ষধর মিশ্র এইরূপ দিগ্বিজয়ে বহির্গত হন এবং হিন্দুস্থানের বহু পণ্ডিতকে তর্কে পরাস্ত করিয়া হাতি, উট ও বহু লোকলস্কর সহ নবদ্বীপে আসেন। তিনি জিজ্ঞাসা করিলেন, এখানকার বড় পণ্ডিত কে? সকলেই গঙ্গার ঘাটে স্থানরত রঘুনাথ। শিরোমণিকে দেখাইয়া দিল। রঘুনাথ ছিলেন কানা–তাই তাহাকে দেখিয়া পক্ষধর মিশ্র ব্যঙ্গমিশ্রিত স্বরে বলিলেন : “অভাগ্যং গৌড় দেশস্য যত্র কাণঃ শিরোমণিঃ।” (গৌড়দেশের দুর্ভাগ্য যে এক কানা পণ্ডিতের শিরোমণি)। কিন্তু প্রবাদ অনুসারে এই কানা পণ্ডিতের নিকটই তিনি তর্কে পরাস্ত হইয়াছিলেন।
অষ্টাদশ শতাব্দীতে নদীয়া বা নবদ্বীপ সংস্কৃত শিক্ষার প্রধান কেন্দ্রে পরিণত হইয়াছিল। মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্র সংস্কৃত পণ্ডিতদের পৃষ্ঠপোষক ছিলেন এবং বহু পণ্ডিত তাঁহার রাজসভা অলঙ্কৃত করিয়াছিলেন। তিনি নিজেও সুপণ্ডিত ছিলেন এবং সভাস্থ পণ্ডিতগণের সহিত ন্যায়, ধর্মশাস্ত্র ও দর্শনের আলোচনা করিতেন। তাঁহার সভাকবি রায়গুণাকর ভারতচন্দ্র কবি হিসাবে বিশেষ প্রসিদ্ধি লাভ করিয়াছেন।
