মধ্যযুগে পর্তুগীজদের নিকট হইতে কয়েকটি নূতন জিনিস বাংলায় আমদানী হয়। ইহাদের মধ্যে প্রথমেই উল্লেখযোগ্য তামাক। বর্তমান কালে ইহার ব্যবহারে আমরা এত অভ্যস্ত যে, ইহা যে মাত্র তিন চারিশত বৎসর আগে আমেরিকা হইতে পর্তুগীজেরা আমাদের দেশে আমদানি করিয়াছিল তাহা আমরা ভুলিয়া যাই। এইরূপে জামরুল, সফেদা, চীনাবাদাম, কমলালেবু, ম্যাঙ্গোষ্টীন, কেশুবাদাম, পেঁপে, আনারস, কামরাঙ্গা, পেয়ারা, আতা, নোনা প্রভৃতি ফল, লঙ্কা, মরিচ, নীল, রাঙ্গা আলু এবং কৃষ্ণকলি ফুলও পর্তুগীজদের আমদানি।* ‘কেদারা’ ও ‘মেজ’ এই দুইটি প্রাচীন শব্দ আমাদিগকে স্মরণ করাইয়া দেয় যে সম্ভবত চেয়ার ও টেবল প্রভৃতির ব্যবহার আমরা পর্তুগীজদের নিকট হইতেই শিখিয়াছি। এইরূপ আরও কয়েকটি শব্দ পঞ্চদশ পরিচ্ছেদের পরিশিষ্টে উল্লিখিত হইয়াছে। মধ্যযুগের শেষে তামাক খাওয়ার অভ্যাস যে কিরূপ সংক্রামক হইয়া উঠিয়াছিল, তাহা ১২০৮ বাংলা সনে লিখিত “তামাকু মাহাত্ম” নামক পুঁথি হইতে বোঝা যায়। ইহাতে আছে “দিবানিশি যেবা নরে, তামাকু ভক্ষণ করে, অন্তকালে চলে যায় কাশী”; আর “অপমৃত্যু নাহিক তাঁহার; এবং ইহাতে বহু রোগ সারে।
———-
* J.J.A. Campos, History of the Portuguese in Bengal. P. 253.
সম্রাট আকবরের সভাসদ আসাদ বেগ বিজাপুর হইতে তামাক আনিয়া ম্রাটকে উপহার দেন। আসাদ বেগ লিখিয়াছেন যে ইহার পূর্বে তিনি কখনও তামাক দেখেন নাই এবং মোগল দরবারেও ইহা সম্পূর্ণ অপরিচিত ছিল। সুতরাং অনেকে অনুমান করেন যে ষোড়শ শতকের শেষে অথবা সপ্তদশ শতকের প্রথমে ইহা ভারতে আমদানি হয়। কিন্তু বিপ্রদাস পিপিলাই তাঁহার ‘মনসা-বিজয়’ কাব্যে লিখিয়াছেন যে মুসলমানরা তামাক খাইতে খুব অভ্যস্ত। তিনি এই কাব্যের একটি শ্লোকে ইহার রচনাকাল ১৪১৭ শতাব্দ অর্থাৎ ১৪৯৫-৯৬ খ্রীষ্টাব্দ বলিয়া নির্দেশ করিয়াছেন। সুতরাং আকবরের, এমন কি পর্তুগীজদের ভারতে আগমনের পূর্বেই বাংলা দেশে তামাক প্রচলিত ছিল এরূপ সিদ্ধান্ত অসঙ্গত নহে। আসাদ বেগ আকবরকে তামাক উপহার দিলে আকবর জিজ্ঞাসা করিলেন, ইহা কি? তখন নবাব খান-ই-আজম বলিলেন যে ইহা তামাক এবং মক্কা ও মদিনায় ইহা সুপরিচিত। সুতরাং বাংলা দেশেও বিপ্রদাসের সময়ে মুসলমানদের তামাক খাওয়া অভ্যাস ছিল, ইহা একেবারে অসম্ভব নহে। অপর পক্ষে বিপ্রদাসের কাব্যে “খড়দহ শ্রীপাট” ও কলিকাতার উল্লেখ থাকায় অনেক মনে করেন যে হয় তাঁহার কাব্য রচনায় তারিখযুক্ত শ্লোকটি না হয় শ্রীপাট ও কলিকাতার উল্লেখযুক্ত পংক্তিগুলি প্রক্ষিপ্ত। তামাকের উল্লেখও কাব্য রচনায় তারিখ সম্বন্ধে সংশয়ের পোষকতা করে ও উল্লিখিতরূপে সংশয় অপনোদনের সমর্থন করে। (আসাদ বেগের বর্ণনা–J.N. Dasgupta, Bengal in the Sixteenth Century, pp.105, 1212 দ্রষ্টব্য। বিপ্রদাসের কাল নির্ণয়–শ্রীসুখময় মুখোপাধ্যায় প্রণীত প্রাচীন বাংলা সাহিত্যের কালক্রম’ পৃ. ১১৯-২৪। ২৮৬-৮৭ দ্রষ্টব্য)।
———–
২। জ্ঞান ও বিদ্যা : লেখাপড়া শেখায় বাঙালীর চিরদিনই আগ্রহ ছিল। সাহিত্য প্রসঙ্গে ব্রাহ্মণদের নানাবিধ শাস্ত্রচর্চ্চার উল্লেখ করা হইয়াছে। গঙ্গাতীরে নবদ্বীপ বিদ্যাচর্চ্চার জন্য বিখ্যাত ছিল। চৈতন্যের সমসাময়িক নবদ্বীপের বর্ণনা কিঞ্চিৎ উদ্ধৃত করিতেছি :
নবদ্বীপ-সম্পত্তি কে বর্ণিবারে পারে।
এক গঙ্গাঘাটে লক্ষ লোক স্নান করে ॥
ত্রিবিধ বয়সে এক জাতি লক্ষ লক্ষ।
সরস্বতী দৃষ্টিপাতে সবে মহাদক্ষ ॥
সবে মহা-অধ্যাপক করি গর্ব ধরে।
বালকেও ভট্টাচাৰ্য্য সনে কক্ষা করে ॥
নানা দেশ হৈতে লোকে নবদ্বীপ যায়।
নবদ্বীপে পড়িলে সে বিদ্যারস পায় ॥
অতএব পড়য়ার নাহি সমুচ্চয়।
লক্ষ কোটি অধ্যাপক নাহিক নির্ণয় ॥” [চৈতন্য ভাগবত-আদি, ২য় অধ্যায়]
নব্যন্যায় ও স্মৃতি চর্চ্চার জন্য নবদ্বীপ বিখ্যাত ছিল। অদ্বিতীয় নৈয়ায়িক পণ্ডিত রঘুনাথ শিরোমণির সম্বন্ধে পূর্বেই উল্লেখ করা হইয়াছে। তাঁহার সম্বন্ধে অনেক গল্প বাংলার পণ্ডিত-সমাজে প্রচলিত আছে। একটি এই যে, মিথিলার পক্ষধর মিশ্রের চতুষ্পঠীতে অধ্যয়নকালে রঘুনাথ বিচারে পক্ষধরকে পরাস্ত করিয়াছিলেন। কিন্তু বর্তমানে অনেকে বিশ্বাস করেন না যে রঘুনাথ শিরোমণি পক্ষধর মিশ্রের ছাত্র ছিলেন। তাঁহারা বলেন, রঘুনাথের গুরু ছিলেন বাসুদেব সার্বভৌম। বাসুদেব সম্বন্ধেও একটি কিংবদন্তী প্রচলিত আছে। তৎকালে মিথিলাই নব্যন্যায়-চর্চ্চার প্রধান কেন্দ্র ছিল এবং যাহাতে এই প্রতিপত্তি অক্ষুণ্ণ থাকে এই জন্য উক্ত শাস্ত্রের প্রধান প্রধান গ্রন্থগুলি বা তাঁহার প্রতিলিপি মিথিলার বাহিরে কেহ লইয়া যাইতে পারিত না। প্রবাদ এই যে পক্ষধর মিশ্রের ছাত্র বাসুদেব সার্বভৌম চারি খণ্ড ‘চিন্তামণি’ ও ‘কুসুমাঞ্জলি’র কারিকাংশ কণ্ঠস্থ করিয়া আনিয়া নবদ্বীপে ‘সর্বপ্রথম’ ন্যায়শাস্ত্রের চতুষ্পঠী স্থাপন করিয়াছিলেন। বহুলপ্রচলিত হইলেও এই কাহিনীর মূলে কোন সত্য আছে কিনা তাহা নিশ্চিতরূপে বলা যায় না। নূতন যে সমুদয় প্রমাণ পাওয়া গিয়াছে তাহাতে কেহ কেহ সিদ্ধান্ত করিয়াছেন যে বাসুদেব পক্ষধরের ছাত্র ছিলেন না, এবং তাঁহার পূর্বেই বাংলায় নব্যন্যায়ের অধ্যয়ন ও অধ্যাপনা প্রচলিত ছিল; কারণ, মিথিলার নব্যন্যায়ের গ্রন্থে ‘গৌড়মতের’ উল্লেখ আছে।
