এই প্রসঙ্গে উল্লেখযোগ্য যে গন্ধবণিক, সুবর্ণবণিক প্রভৃতি জাতির মধ্যে উচ্চ শিক্ষার প্রচলন ছিল এবং ষষ্ঠীবর সেন, গঙ্গাদাস সেন প্রভৃতি গ্রন্থ রচনা করিয়াছেন। মধুসূদন নাপিত নলদময়ন্তী কাহিনী বাংলা কবিতায় বর্ণনা করিয়াছেন (১৮০৯ খ্রী)। তিনি লিখিয়াছেন যে তাঁহার পিতা এবং পিতামহও সাহিত্যক্ষেত্রে প্রসিদ্ধি লাভ করিয়াছিলেন। অষ্টাদশ শতাব্দীতে মাঝি কায়েৎ, রামনারায়ণ গোপ, ভাগ্যমন্ত ধুপী প্রভৃতি পুঁথি লেখকরূপে উল্লিখিত হইয়াছেন। [K.K. Datta. History of Bengal Subah, p.8] ইহা হইতে বুঝা যায় যে শিক্ষা ও জ্ঞান কেবল উচ্চশ্রেণীর মধ্যেই আবদ্ধ ছিল না।
ব্রাহ্মণ, বৈদ্য, কায়স্থ ব্যতীত অন্যান্য জাতির লোকও ধর্ম সম্প্রদায়ের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন। সদ্গোপ জাতীয় রামশরণ পাল কর্ত্তাভজা সম্প্রদায়ের প্রধান অধ্যক্ষ ছিলেন।
পূর্বেই বলা হইয়াছে যে যবনের সৃষ্ট ভোজ্য বা পানীয় গ্রহণ করিলে হিন্দুর জাতিপাত হইত। ‘চৈতন্যচরিতামৃতে সুবুদ্ধি রায়ের কাহিনী ইহার একটি জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত। সুলতান হোসেন শাহ বাল্যকালে সুবুদ্ধি রায়ের অধীনে চাকরি করিতেন। এবং কর্তব্য কাজে অবহেলার জন্য সুবুদ্ধি তাঁহাকে চাবুক মারিয়াছিলেন। সুলতান হইবার পর হোসেন শাহের পত্নী এই কথা শুনিয়া সুবুদ্ধির প্রাণ বধ করার প্রস্তাব করেন। সুলতান ইহাতে অসম্মত হইলে তাঁহার স্ত্রী কহিলেন, তবে তাঁহার জাতি নষ্ট কর। অতএব “কয়োয়ার পাণি তার মুখে দেয়াইলা” অর্থাৎ মুসলমানের পাত্র হইতে জল খাওয়াইয়া সুবুদ্ধি রায়ের জাতিধর্ম নষ্ট করা হইল। সুবুদ্ধি কাশীতে গিয়া পণ্ডিতদের কাছে প্রায়শ্চিত্তের বিধান চাহিলেন। একদল বলিলেন “তপ্ত ধৃত খাইয়া প্রাণ ত্যাগ কর।” আর একদল বলিলেন, “অল্পদোষে এরূপ কঠোর প্রায়শ্চিত্ত বিধেয় নহে” তখন চৈতন্যদেব কাশীতে আসেন এবং সুবুদ্ধি তাঁহার কাছে নিজের কাহিনী ব্যক্ত করেন। চৈতন্যদেব বলিলেন, তুমি বৃন্দাবনে গিয়া “নিরন্তর কর কৃষ্ণনাম সংকীর্তন”। ইহাতে তোমার পাপ খণ্ডন হইবে এবং তুমি কৃষ্ণচরণ পাইবে।
অদ্ভুতাচার্যের রামায়ণের নিম্নলিখিত উক্তি হইতে মনে হয় যে যবনস্পর্শে জাতি নষ্ট হওয়ায় হিন্দুসমাজে যে ভাঙ্গন ধরিয়াছিল তাহা রোধ করার জন্য একদল উদারপন্থী ইহার প্রতিবাদ করিতেন।
বল করি জাতি যদি এত যবনে।
ছয় গ্রাস অন্ন যদি করায় ভক্ষণে ॥
প্রায়শ্চিত্ত করিলে জাতি পায় সেই জনে।
এইরূপে মুসলমান কর্ত্তৃক কোন কুলস্ত্রী ধর্ষিত হইলেও সমাজে যাহাতে সেই পরিবার জাতিচ্যুত না হয় দেবীবরের মেলবন্ধনে সেজন্য কতকগুলি মেল যবন দোষে দুষ্ট বলিয়া উল্লিখিত হইয়াছে। অর্থাৎ দূষিত হইলেও তাহারা ব্রাহ্মণসমাজে স্থান পাইয়াছে। সম্ভবত একই রকমের দোষে এক বা একাধিক মেলের সৃষ্টি হইত তাহাদের পরস্পরের মধ্যে বিবাহাদি ভোজ্যান্নতা বজায় থাকিত। তবে এই সমুদয় চেষ্টায় খুব বেশি কাজ হয় নাই। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই যবন-স্পর্শে হিন্দু জাতিচ্যুত হইত এবং ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করিত। আবার পিরালী, শেরখানী প্রভৃতি ব্রাহ্মণের মত কোন কোন পরিবার জাতিভ্রষ্ট হইয়াও হিন্দুধর্ম ত্যাগ করে নাই। দেবীবর ঘটকও যবন-দোষে দুষ্ট ভৈরব ঘটকী, দেহটা, হরি মজুমদারী প্রভৃতি ব্রাহ্মণ সমাজের মেল উল্লেখ করিয়াছেন। তখন দক্ষিণ বাংলায় মগদের অত্যাচার ছিল–সেই জন্যই ‘মঘ দোষে দুষ্ট বাঙ্গাল মেলের উৎপত্তি হইয়াছিল। দেবীবর ঘটকের মেল বর্ণনা পড়িলে মনে হয় বাংলার ব্রাহ্মণেরা অধিকাংশই কোন না কোন দোষে দূষিত ছিলেন এবং এইজন্যই অসংখ্য মেলের বন্ধন সৃষ্টি করিয়া সমাজে ভিন্ন ভিন্ন গণ্ডীতে তাঁহাদের স্থান দেওয়া হইয়াছিল।
মুসলমান ও মগ ব্যতীত আর এক অস্পৃশ্য বিদেশী জাতি-পর্তুগীজ–এদেশে প্রাধান্য লাভ করিয়াছিল। পর্তুগীজ ও মগ জলদস্যুদের অত্যাচারের কথা অন্যত্র বলা হইয়াছে। পর্তুগীজেরা অনেকে বাংলায় স্থায়িভাবে বাস করিত। বরিশালের পূর্বে, নোয়াখালির দক্ষিণে ও চট্টগ্রামের পশ্চিমে বঙ্গোপসাগরের উত্তর প্রান্তে যে সমুদয় দ্বীপ ছিল সেখানেই তাহারা বেশির ভাগ বাস করিত এবং জলপথে দস্যুবৃত্তি করিত। সন্দ্বীপ দ্বীপটি কয়েক বৎসর যাবৎ পর্তুগীজ কার্বালোর অধীনে ছিল। তারপর সিবাস্তিও গন্স্যালভেস্ তিরৌ নামক একজন দুর্ধর্ষ জলদস্যু তিন বৎসর (১৬০৭ ১৬১০ খ্রী) সন্দ্বীপে স্বাধীন নরপতির ন্যায় রাজত্ব করিয়াছিল। তাঁহার অধীনে এক হাজার পর্তুগীজ ও দুই হাজার অন্যান্য সৈন্য, দুইশত ঘোড়সওয়ার এবং ৮০ খানি কামান দ্বারা রক্ষিত রণতরী ছিল। বাংলা দেশের কোন কোন জমিদার তাঁহার মিত্র ছিল। সৈনিক ও সেনানায়ক হিসাবে পর্তুগীজদের খুব খ্যাতি ছিল।
হুগলি হইতে সপ্তগ্রাম পর্যন্ত ভূভাগ তাহাদের অধিকারে ছিল। অন্যান্য বহ স্থানে তাহাদের বসতি ছিল। বাংলার বহু জমিদার এবং সময় সময় সুলতানেরাও পর্তুগীজ সেনা ও সেনানায়কদিগকে আত্মরক্ষার্থে নিযুক্ত করিতেন। মুঘল যুগেও বাংলার নবাবেরা পর্তুগীজ সৈন্য পোষণ করিতেন।
পর্তুগীজেরা সভ্যতা ও সংস্কৃতির দিক দিয়াও বাংলা দেশের কিছু উন্নতি করিয়াছিল। তাহারা একটি অনাথ আশ্রম এবং কয়েকটি হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করিয়া এই শ্রেণীর লোকহিতকর কার্যের পথ প্রদর্শন করিয়াছিল। তাহারা মিশনারী বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা এবং কখনও কখনও এ-দেশীয় ছাত্রদিগের গোয়াতে কলেজে পড়ার বন্দোবস্ত করিত। বাংলা গদ্য-সাহিত্য তাহাদের কাছে যে বিশেষরূপে ঋণী তাহা সাহিত্য-প্রসঙ্গে উল্লিখিত হইয়াছে। এককালে বাংলা দেশের উপকূলভাগে পর্তুগীজ ভাষা বিভিন্ন দেশীয় লোকের মধ্যে কথ্য ভাষ্যরূপে ব্যবহৃত হইত।
