শ্রীকৃষ্ণকীর্তনে আচারিজ (আচার্য, দৈবজ্ঞ?), সগুনী (ব্যাধ বা শাকুন শাস্ত্রবিৎ), ঝালিয়া (ঐন্দ্রজালিক?), ও বাদিয়া (সাপুড়ে) প্রভৃতির উল্লেখ আছে। এগুলি কেবলমাত্র ব্যক্তিগত বৃত্তি অথবা বৃত্তিগত জাতি নির্দেশ করিতেছে কি না তাহা বুঝা যায় না।
মধ্যযুগে প্রাচীনযুগের ন্যায় ক্রীতদাস ও ক্রীতদাসী সমাজের একটি বিশিষ্ট অঙ্গ ছিল। ইসলামের বিধি অনুসারে হিন্দু কোন মুসলমান দাস রাখিতে পারিত না, কিন্তু মুসলমান হিন্দু দাস রাখিতে পারিত। মুসলমানেরা হিন্দু রাজ্য জয় করিয়া বহু হিন্দু বন্দীকে ইসলাম ধর্ম্মে দীক্ষিত করিয়া ক্রীতদাসরূপে ব্যবহার করিত। ইহারা গৃহে ভৃত্যের কার্যে নিযুক্ত হইত কিন্তু যুবতী স্ত্রীলোক অনেক সময়ই উপপত্নী বা গণিকাতে পরিণত হইত। মুসলমান সুলতানেরা ভারতের বাহির হইতে বহু ক্রীতদাস ও ক্রীতদাসী আনয়ন করিতেন। আফ্রিকার অন্তর্গত আবিসিনিয়া হইতে আনীত বহু দাস বাংলায় ছিল। ইহাদিগকে খোঁজা করিয়া রাজপ্রাসাদে দায়িত্বপূর্ণ কার্যে নিযুক্ত করা হইত। এই হাবসী খোঁজারা যে এককালে খুব শক্তিশালী ছিল এবং এমন কি বাংলার সুলতান পদে যে আসীন ছিল তাহা পূর্বেই বলা হইয়াছে। অন্যান্য অনেক মুসলমান ক্রীতদাসও মধ্যযুগে খুব উচ্চপদ অধিকার করিয়াছিল। কেহ কেহ রাজসিংহাসনেও প্রতিষ্ঠিত হইয়াছে। ইন্বতার ভ্রমণবিবরণী (চতুর্দ্দশ শতকের মধ্যভাগ হইতে জানা যায় যে, সে সময় বাংলা দেশে খুব সুবিধাতে দাসদাসী কিনিতে পাওয়া যাইত। ইবক্তৃতা একটি যুবতী ক্রীতদাসী ও তাঁহার এক বন্ধু একটি বালক ক্রীতদাস ক্রয় করিয়াছিলেন।
হিন্দুদের মধ্যেও দাসত্ব প্রথা প্রচলিত ছিল। দাসদাসীরা গৃহকার্যে নিযুক্ত থাকিত। অনেক সময় কোন কোন যুবতী স্ত্রীলোককে উপপত্নীরূপেও জীবন-যাপন করিতে হইত। দাস ব্যবসা খুব প্রচলিত ছিল। বহু বালক-বালিকা এবং বয়স্ক পুরুষ ও স্ত্রীলোক অপহৃত হইয়া দাসরূপে বিক্রীত হইত। এইরূপ ক্রয়-বিক্রয় প্রকাশ্যভাবে হইত। অনেক সময় লোকে নিজেকেই বিক্রয় করিত। এইরূপ বিক্রয়ের দলিলও পাওয়া গিয়াছে। মগ ও পর্তুগীজেরা যে দলে দলে স্ত্রী-পুরুষকে ধরিয়া নিয়া দাসরূপে বিক্রয় করিত তাহা পূর্বেই বলা হইয়াছে।
আমেরিকার দাসদের তুলনায় ভারতীয় দাস-দাসী অনেক সদয় ব্যবহার পাইত। তবে কোন কোন স্থলে দাসগণকে অত্যন্ত নির্যাতন আর লাঞ্ছনাও সহ্য করিতে হইত।
তঅষ্টাদশ শতাব্দীতে দাসত্ব প্রথা খুব ব্যাপকভাবে প্রচলিত হইয়াছিল। দুর্ভিক্ষের সময় অথবা দারিদ্র্যবশতঃ লোকে নিজেকে অথবা পুত্রকন্যাকে দাসখত লিখিয়া বিক্রয় করিত। তখনকার দিনে কলিকাতায় ইউরোপীয় ও ইউরেশিয়ান সমাজে দাস রাখা একটি ফ্যাশান হইয়া দাঁড়াইয়াছিল। ১৭৮৫ খ্রষ্টিাব্দে সার উইলিয়ম জোনস্ জুরীদিগকে উদ্দেশ্য করিয়া বলিয়াছিলেন “এই জনবহুল শহরে এমন কোন পুরুষ বা স্ত্রীলোক নাই বলিলেই চলে যাহার অন্তত একটিও অল্পবয়স্ক দাস নাই। সম্ভবত আপনারা সকলেই দেখিয়াছেন কিরূপে দাস-শিশুর দল বোঝাই করিয়া বড় বড় নৌকা গঙ্গা নদী দিয়া কলিকাতায় ইহাদের বিক্রয় করিবার জন্য লইয়া আসে। আর ইহাও আপনারা জানেন যে এই সব শিশু হয় অপহৃত না হয় ত দুর্ভিক্ষের সময় সামান্য কিছু চাউলের বিনিময়ে ক্রীত।” আফ্রিকা, পারস্য উপসাগরের উপকূল, আর্মেনিয়া, মরিশাস্ প্রভৃতি স্থান হইতে কলিকাতার দাস চালান হইত। বাংলা দেশ হইতেও বহু দাস-দাসী ইউরোপীয়ান বণিকেরা ভারতের বাহিরে চালান দিত। কলিকাতায় কয়েকটি ইংরেজ রীতিমত ক্রীতদাসের ব্যবসা করিত এবং এই উদ্দেশ্যে কেবল বাহির হইতে দাস-দাসীই আনিত না তাহাদের সন্তান-সন্ততিও বিক্রয় করিত। কলিকাতায় ইউরোপীয় ও ইউরেশিয়ান পরিবার দাস-দাসীদের উপর নিষ্ঠুর অত্যাচার করিত। ১৭৮৯ খ্রীষ্টাব্দে ইংরেজ গভর্নমেন্ট ভারত হইতে ক্রীতদাস বাহিরে পাঠানো বে-আইনী বলিয়া ঘোষণা করেন। ঊনবিংশ শতাব্দীতে দাসত্ব-প্রথা ও দাস-ব্যবসা রহিত হয়।
সমসাময়িক সাহিত্য হইতে প্রমাণিত হয় যে মধ্যযুগে বাংলা দেশে তথাকথিত অনেক নিম্নশ্রেণী নানা কারণে সমাজে মর্যাদা লাভ করিয়াছিল।
হাড়ী, ডোম প্রভৃতি যুদ্ধবিদ্যায় পারদর্শিতার জন্য সম্মান পাইত। মাণিকচন্দ্র রাজার গানে আছে যে রাজা গোবিন্দচন্দ্রের মাতা তাঁহাকে এক হাড়ী জাতীয় গুরুর কাছে দীক্ষা নিতে বলিয়াছিলেন। শূন্যপুরাণ-রচয়িতা ডোম জাতীয় রামাই পণ্ডিত ধর্ম্মের পূজার পুরোহিত ছিলেন এবং ব্রাহ্মণণাচিত মর্যাদা পাইতেন। সহজিয়া ধর্ম্মে চণ্ডালীমার্গ এবং ডোম্বীমার্গ মুক্তির সাধনস্বরূপ বর্ণিত হইয়াছে। চণ্ডীদাসের সহিত রজকিনীর নাম পদাবলীতে যুক্ত আছে। স্মৃতি ও পুরাণের গণ্ডীর বাহিরে সহজিয়া, তান্ত্রিক, নাথ প্রভৃতি যে সকল নব্যপন্থী ধর্মসম্প্রদায়ের উদ্ভব হইয়াছিল তাহারাই বর্ণাশ্রম ধর্ম্মের গণ্ডীর বাহিরে এই সকল নিম্ন জাতিকে উচ্চ মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করিয়াছিল। নাথ সম্প্রদায়ভুক্ত যোগীরাও সে যুগে বর্তমান কালের তুলনায় অনেক উচ্চ স্থান অধিকার করিত।
সুবৰ্ণবণিক, গন্ধবণিক প্রভৃতি জাতির লোক বাণিজ্য করিয়া লক্ষপতি হইত এবং সমাজে খুব উচ্চ স্থান অধিকার করিত। মঙ্গলকাব্যগুলিতে এই শ্রেণীর প্রাধান্য বর্ণিত হইয়াছে। স্মার্ত রঘুনন্দন সমুদ্রযাত্রা নিষেধ করিয়াছিলেন। কিন্তু বণিকেরা যে এই নিষেধ না মানিয়া সমুদ্রপথে বাণিজ্য করিত, মঙ্গলকাব্যে তাঁহার ভূরি ভূরি প্রমাণ আছে। এই ব্যাপারে বাস্তবের সহিত আদর্শের প্রভেদ অত্যন্ত বিস্ময়কর মনে হয়। অসম্ভব নহে যে ব্রাহ্মণ, কায়স্থ, বৈদ্য প্রভৃতি উচ্চবর্ণেরা যাহাতে অর্থলালসায় কুলোচিত ধর্ম বিসর্জন দিয়া বণিকবৃত্তি অবলম্বন না করে সেইজন্যই রঘুনন্দন সমুদ্রযাত্রা নিষিদ্ধ করিয়াছিলেন।
