পূর্ব্বোক্ত কুলশাস্ত্রগুলিতে প্রধানত ব্রাহ্মণদের কথাই আছে। বহু বৈদ্য কুল পঞ্জিকার মধ্যে দুইখানি প্রামাণিক গ্রন্থ রামকান্ত দাম প্রণীত কবিকণ্ঠহার ১৬৫৩ খ্রীষ্টাব্দে এবং ভরত মল্লিক কৃত চন্দ্রপ্রভা ১৬৭৫ খ্রীষ্টাব্দে রচিত। কায়স্থদের বহু কুল-পঞ্জিকা আছে; কিন্তু, কোন গ্রন্থই প্রাচীন ও প্রামাণিক বলিয়া গ্রহণ করা যায় না।
কুলশাস্ত্র মতে হিন্দুযুগেই ব্রাহ্মণ, বৈদ্য ও কায়স্থ জাতির মধ্যে গুণানুসারে কৌলীন্য প্রথার প্রবর্তন হয়। কুলীন ব্রাহ্মণগণের মধ্যে আবার ‘মুখ্য’ ও ‘গৌণ’ এই দুই শ্রেণীভেদ হইল। অন্যান্য ব্রাহ্মণেরা শ্ৰোত্রিয়, কাপ (বংশজ), সপ্তশতী প্রভৃতি নামে আখ্যাত হইলেন। কৌলীন্য প্রথা প্রথমে ব্যক্তিগত গুণের উৎকর্ষের উপর প্রতিষ্ঠিত ছিল–কিন্তু ক্রমে ইহা বংশানুক্রমিক হয়। পরে নিয়ম হইল কুলীনকন্যা যে ঘরে প্রদত্ত হইবে আবার সেই ঘর হইতে কন্যা গ্রহণ করিতে হইবে এবং এইরূপ আদানপ্রদানের বিচার করিয়া মাঝে মাঝে কুলীনগণের পদমর্যাদা স্থির করা হইবে। এইরূপ ‘সমীকরণ’ অনেকবার হইয়াছে। সর্বশেষে সম্ভবত পঞ্চদশ খ্রষ্টাব্দে দেবীবর ঘটক কুলীনদের দোষ বিচার করিয়া কতককে কৌলীন্যচ্যুত করিলেন এবং অল্পদোষাশ্রিত অন্য কুলীনগণকে ছত্রিশ ভাগ অথবা মেল-এ বিভক্ত করিলেন। প্রতি মেলের মধ্যেও বিবাহাদি ক্রিয়া সম্বন্ধে এরূপ কঠোর নিয়ম করা হইল যে কালক্রমে কয়েকটি নির্দিষ্ট পরিবার ছাড়া অন্য কুলীন পরিবারের সহিতও কুলীনদের বিবাহ হইতে পারিত না। ইহারই ফলে কুলীন সমাজের পুরুষের বহু বিবাহ, কন্যার বেশি বয়স পর্যন্ত বা চিরকালের জন্য অনূঢ়তা ও অবশ্যম্ভাবী ব্যভিচারের উদ্ভব হইল। কোন কুলীন ৫০, ৬০ বা ততোধিক বিবাহ করিয়াছে, বা অশীতিপর বৃদ্ধের সহিত পিসী, ভাইঝি সম্পান্বিতা ১০ হইতে ৬০ বৎসর বয়স্কা ২০/২৫টি অনূঢ়ার একসঙ্গে বিবাহ হইয়াছে এরূপ দৃষ্টান্ত বিংশ শতাব্দীতেও দেখা গিয়াছে। বলা বাহুল্য অনেক বিবাহিতা কুলীন কন্যা বিবাহ রাত্রির পরে আর স্বামীর মুখ দর্শন করিবার সুযোগ পাইত না।
ব্রাহ্মণ, বৈদ্য কায়স্থ ব্যতীত অন্যান্য জাতি সম্বন্ধে বৃহদ্ধর্ম্ম ও ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণ অবলম্বনে প্রথম ভাগে যাহা বলা হইয়াছে তাহা মধ্যযুগ সম্বন্ধেও প্রযোজ্য। সমসাময়িক বাংলা সাহিত্যে এরূপ অনেক জাতি ও তাহাদের বৃত্তির উল্লেখ আছে।
১। বণিক গোপ-ইহাদের ক্ষেতের ফসলে বাড়ি ভরা থাকিত।
“মুগ, তিল গুড় মাসে গম সরিয়া কাপাসে
সভার পূর্ণিত নিকেতন।”
২। তেলি–ইহারা কেহ চাষ করিত, কেহ ঘানি হইতে তৈল করিত, কেহ কেহ তৈল কিনিয়া আনিয়া বিক্রয় করিত।
৩। কামার–কুড়ালি, কোদালি, ফাল, টাঙ্গী প্রভৃতি গড়িত।
৪। তাম্বুলী–পান, সুপারি এবং কর্পূর দিয়া বীড়া বান্ধিয়া বিক্রয় করিত।
৫। নাপিত–কুলকর্ম ছাড়াও ইহারা মাসোহারা পাইয়া পালোয়ানদের ডলাই মলাই করিত।
৬। মোদক–ইহারা চিনির কারখানা করিত এবং খণ্ড (পাটালি গুড়), লাড়, প্রভৃতি
“পসরা করিয়া শিরে নগরে নগরে ফিরে
শিশুগণে করয়ে যোগান।”
৭। দুই শ্রেণীর দাস–“মৎস্য বেচে করে চাষ।
দুই জাতি বৈসে দাস ॥”
৮। কিরাত ও কোল–হাটে ঢোল বাজাইত।
৯। সিউলীরা–খেজুরের রস কাটিয়া নানাবিধ গুড় প্রস্তুত করিত।
১০। ছুতার–চিড়া কুটিত, মুড়ি ভাজিত, ছবি আঁকিত।
১১। পাটনী–নৌকায় পারাপার করিত, ইহার জন্য রাজকর আদায় করিত।
১২। মারহাটারা–“শোলঙ্গে পিলুই কাটে,
ঘানি ফাঁড়ে চক্ষে দিয়া কাটা।”
প্রথম পংক্তির অর্থ দুর্বোধ্য–সম্ভবত প্লীহা কাটার কথা আছে।
জীবিকার্জনের এই সমুদয় বৃত্তির সহিত বেশ্যাবৃত্তিরও উল্লেখ আছে। কামিলা বা কেয়ালা জাতিকে ‘জায়াজীব’ বলা হইয়াছে। সম্ভবত ইহারা স্ত্রীকে ভাড়া দিয়া জীবিকা অর্জন করিত।
ইহা ছাড়া ক্ষত্রি, রাজপুত প্রভৃতির উল্লেখ আছে। ইহারা মল্ল-বিদ্যা শিক্ষা করিত। বাগদিদের সম্বন্ধে বলা হইয়াছে–”নানাবিধ অস্ত্র ধরে দশ বিশ পাইক করি সঙ্গে।”
দ্বিজ হরিরামের চণ্ডীকাব্যে (১৬শ শতাব্দী) [বঙ্গ সাহিত্য পরিচয়, পৃ. ৩১৫] এইরূপ তালিকা আছে। ইহার মধ্যে শূদ্রযাজী ব্রাহ্মণ, অনুষ্ঠু, সদৃগোপ উল্লেখযোগ্য। অষ্টাদশ শতাব্দীর মধ্যভাগে (১৭৫২ খ্রীষ্টাব্দ) ভারতচন্দ্র ‘অন্নদামঙ্গলে বর্ধমান নগরীতে বিভিন্ন জাতির যে বর্ণনা দিয়াছেন তাঁহার সহিত দুই শত বৎসর পূর্বেকার উল্লিখিত কবিকঙ্কণ চণ্ডীর বর্ণনার যথেষ্ট সাদৃশ্য আছে। সুতরাং এই দুইটি মিলাইয়া বাংলায় মধ্যযুগের বিভিন্ন জাতির বাস্তব চিত্র অঙ্কিত করা যায়। এখানেও প্রথমে ব্রাহ্মণ ও বৈদ্য এই দুই জাতির উল্লেখ। তাঁহার পরেই আছে: [বন্ধনীর মধ্যে পাঠভেদ দেওয়া হইল। ২য় ভাগ-১৩ পৃ.]
কায়স্থ বিবিধ জাতি দেখে রোজগারি।
বেণে মণি গন্ধ সোনা কাঁসারি শাঁখারি।।
গোয়ালা তামুলী তিলী তাঁতী মালাকার।
নাপিত বারুই কুরী (চাষা) কামার কুমার ॥
আগরি প্রভৃতি (ময়রা) আর নাগরী যতেক।
যুগি চাসাধোবা চাসাকৈবর্ত অনেক ॥
সেকরা ছুতার নুড়ী ধোবা জেলে গুঁড়ী।
চাঁড়াল বাগদী হাড়ী ডোম মুচী শুঁড়ী ॥
কুরমী কোরঙ্গা পোদ কপালি তিয়র।
কোল কলু ব্যাধ বেদে মাল বাজীকর ॥
বাইতি পটুয়া কান কসবি যতেক।
ভাবক ভক্তিয়া ভাঁড় নর্তক অনেক ॥” [বঙ্গীয়-সাহিত্য পরিচয়-পৃ. ৩১৫]
