বিবাহাদি অনুষ্ঠান শেষ হওয়ামাত্র ব্রাহ্মণ এক কাহন দক্ষিণা আদায় করিত। ঘটক ব্রাহ্মণেরা উপযুক্ত পুরস্কার না পাইলে বিবাহ-সভা মধ্যে কুলের অখ্যাতি করিত।
গ্রহ-বিপ্র অর্থাৎ দৈবজ্ঞ ব্রাহ্মণেরা শিশুর কোষ্ঠি তৈরি করিত এবং গ্রহদোষ কাটাইবার জন্য শান্তি স্বস্ত্যয়ন করিত। মুকুন্দরাম মঠপতি বর্ণবিপ্রগণের উল্লেখ করিয়াছেন। সম্ভবত যে সব বৌদ্ধ ব্রাহ্মণ্য ধর্ম গ্রহণ করিয়াছিল তাহারা হিন্দুসমাজে পুরাপুরি গৃহীত হইত না এবং সাধারণ ব্রাহ্মণেরা তাহাদের পৌরোহিত্য করিত না। এইজন্য বৌদ্ধমঠের শ্রমণেরাই তাহাদের পৌরোহিত্য করিত এবং বর্ণ-বিপ্র নামে পরিচিত হইত।
অগ্রদানী ব্রাহ্মণেরও উল্লেখ আছে। ইহারা শ্রাদ্ধ ও মৃত্যুকালীন দান গ্রহণ করিত, এই কারণে ‘পতিত’ বলিয়া গণ্য হইত।
বৈদ্য জাতির মধ্যে বর্তমান কালের ন্যায় সেন, গুপ্ত, দাস, দত্ত, কর, প্রভৃতি উপাধি ছিল।
উঠিয়া প্রভাত কালে উদ্ধা ফোঁটা করি ভালে
বসন-মণ্ডিত করি শিরে।
পরিয়া লোহিত ধুতি কাঁধে করি খুঙ্গি পুঁথি
গুজরাটে বৈদ্যজনে ফিরে ॥
বৈদ্যগণ সম্বন্ধে বলা হইয়াছে :
বটিকায় কার যশ কেহ প্রয়োগের বশ
নানা তন্ত্র করয়ে বাখান।
ইহার অর্থ সম্ভবত এই যে কোন কোন বৈদ্য ঔষধের অর্থাৎ বটিকা সেবনের ব্যবস্থা করিতেন, আবার কেহ কেহ ঝাড়ফুঁক তন্ত্রমন্ত্রের সাহায্যে ব্যাধির উপশম করিতেন। রোগ কঠিন দেখিলে বৈদ্যেরা রোগীর বাড়ি হইতে নানা ছলে পলাইতেন। চিকিৎসা বৈদ্যদের প্রধান বৃত্তি হইলেও অন্যান্য শাস্ত্রেও তাঁহাদের পারদর্শিতা ছিল। বৈষ্ণবগ্রন্থে চৈতন্যের ভক্ত বৈদ্য চন্দ্রশেখরকে ব্রাহ্মণ বলা হইয়াছে এবং বৈদ্যজাতীয় পুরুষোত্তম ‘হরিভক্তি তত্ত্বসার সংগ্রহ’ গ্রন্থের উপসংহারে নিজে শর্মা উপাধি ব্যবহার করিয়াছেন।
কায়স্থগণের মধ্যে ঘোৰ, বসু, মিত্র উপাধিধারীরা ছিল কুলের প্রধান। ইহা ছাড়া পাল, পালিত, নন্দী, সিংহ, সেন, দেব, দত্ত, দাস, কর, নাগ, সোম, চন্দ, ভঞ্জ, বিষ্ণু, রাহা, বিন্দ প্রভৃতি উপাধিধারীরাও ছিল। বর্তমান কালে রথযাত্রার জন্য প্রসিদ্ধ মাহেশ গ্রামের ঘোষেদের বিশেষ উল্লেখ দেখিয়া মনে হয় ইহা কায়স্থদের একটি প্রধান সমাজ স্থান ছিল। ইহারা লেখাপড়া জানিত এবং কৃষিকার্য করিত।
বৈষ্ণব পদকর্ত্তাদের মধ্যে ব্রাহ্মণ, বৈদ্য, কায়স্থ এই তিন জাতির লোকই দেখিতে পাওয়া যায়।
মধ্যযুগের ব্রাহ্মণ, বৈদ্য, কায়স্থ প্রভৃতি জাতির উৎপত্তি, ইতিহাস ও শ্রেণীভেদ এবং বিভিন্ন শ্রেণীর শাখা ও তদন্তৰ্গত পরিবারের কুলের উৎকর্ষ ও অপকর্ষ বিচার তদনুসারে তাহাদের মধ্যে বৈবাহিক সম্বন্ধ, ভোজ্যান্নতা প্রভৃতির বিস্তারিত আলোচনা এবং সামাজিক বহু খুঁটিনাটি বিবরণ লইয়া অনেক গ্রন্থ রচিত হইয়াছিল। ইহাদের নাম কুলজী অথবা কুল-শাস্ত্র এবং গ্রন্থকর্ত্তারা ঘটক নামে পরিচিত ছিলেন। এই ইতিহাসের প্রথম ভাগে এই গ্রন্থগুলির সংক্ষিপ্ত আলোচনা আছে। বঙ্গে বিভিন্ন শ্রেণীর ব্রাহ্মণাদি জাতির উৎপত্তি সম্বন্ধে ইহাদের বিবরণের যে কোন ঐতিহাসিক ভিত্তি নাই তাহা স্পষ্ট বলা হইয়াছে। কিন্তু যে শ্রেণীভেদের বর্ণনা আছে এবং বিভিন্ন শ্রেণীর মধ্যে পরস্পর আহার ও বৈবাহিক সম্বন্ধ প্রভৃতি পরিচালনা করার জন্য যে সমুদয় রীতিনীতির উল্লেখ আছে তাহা মধ্যযুগের বাংলার সম্বন্ধে মোটামুটি সত্য বলিয়া গ্রহণ করা যাইতে পারে। বহু সংখ্যক কুলজী গ্রন্থের মধ্যে নিম্নলিখিত কয়েকখানি সবিশেষ প্রসিদ্ধ : [বিস্তৃত বিবরণ ‘ভারতবর্ষ’, ১৩৪৬ কার্তিক সংখ্যা, ৬৫৭ পৃষ্ঠা]
১। হরিমিশ্রের কারিকা
২। এডুমিশ্রের কারিকা
৩। ধ্রুবানন্দের মহাবংশাবলী
৪। নুলো পঞ্চাননের গোষ্ঠীকথা
৫। বাচস্পতি মিশ্রের কুলরাম
৬। বরেন্দ্র কুলপঞ্জিকা (এই নামে অভিহিত বহু ভিন্ন ভিন্ন পুঁথি পাওয়া গিয়াছে)
৭। ধনঞ্জয়ের কুলপ্রদীপ
৮। রামানন্দ শর্মার কুলদীপিকা
৯। মহেশের নির্দোশ কুলপঞ্জিকা
১০। সর্বানন্দ মিশ্রের কুলতত্ত্বার্ণব
৩ নং পুঁথি ছাপা হইয়াছে এবং ইহা সম্ভবত পঞ্চদশ শতাব্দীর শেষে রচিত। ৬, ৭ ও ৮ নং গ্রন্থের নির্ভরযোগ্য কোন পুঁথি পাওয়া যায় নাই। অন্যগুলি ষোড়শ ও সপ্তদশ শতাব্দীর পূর্বে রচিত এরূপ মনে করিবার কারণ নাই। ১০ নং গ্রন্থ ছাপা হইয়াছে কিন্তু ইহা যে পুঁথি অবলম্বন করিয়া রচিত তাঁহার কোন উল্লেখ নাই। নগেন্দ্র নাথ বসুর মতে ১ ও ২ নং গ্রন্থ ত্রয়োদশ ও দ্বাদশ শতাব্দীতে রচিত এবং ১ নং গ্রন্থ হরিমিশ্রের কারিকা সর্বাপেক্ষা প্রামাণিক গ্রন্থ। তিনি এই দুই গ্রন্থ হইতে অনেক উক্তি উদ্ধৃত করিয়া বাংলার জাতি সম্বন্ধে একটি মতবাদ প্রচার করিয়াছিলেন; কিন্তু বহু অনুরোধ-উপরোধ সত্ত্বেও ঐ দুইখানির পুথি কাহাকেও দেখান নাই। তাঁহার মৃত্যুর পরে অন্যান্য কুলজীর সহিত এই পুঁথিও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্রয় করে। তখন দেখা গেল যে এই গ্রন্থও প্রাচীন নহে এবং বসু মহাশয়ের উদ্ধৃত অনেক উক্তিও এই পুঁথিতে নাই। সুতরাং এই দুই পুঁথির মূল্য খুব বেশি নহে।
কুলশাস্ত্রের সংখ্যা অনন্ত বলিলে অত্যুক্তি হয় না; কারণ, ঘটকগণের বংশধরগণ এইগুলি রক্ষা করিয়াছেন ও প্রয়োজনমত পরিবর্তন ও পরিবর্ধন করিয়াছেন। মধ্যযুগে বাংলায় সামাজিক মর্যাদাভ যেরূপ আকাক্ষণীয় ছিল, সামাজিক গ্লানি এবং অপবাদও সেইরূপ মর্মপীড়াদায়ক ছিল। বস্তুত মধ্যযুগে বাঙালী হিন্দুর সম্মুখে উচ্চতর কোন জাতীয় ভাব বা ধর্ম্মের আদর্শ না থাকায় সামাজিক শ্রেণীবিভাগ ও তৎসম্পর্কিত বিচার বিতর্কদ্বারা সামাজিক মর্যাদালাভ জীবনের চরম ও পরম লক্ষ্য এবং জাতীয় ধীশক্তির প্রধান প্রয়োগক্ষেত্রে পরিণত হইয়াছিল। সুতরাং ইহা খুবই সম্ভব এবং স্বাভাবিক যে ঘটকগণকে অর্থদ্বারা বা অন্য কোন প্রকারে বশীভূত করিয়া ব্যক্তি বা সম্প্রদায়বিশেষ নিজেদের আভিজাত্য গৌরব বৃদ্ধি অথবা বিরুদ্ধ পক্ষের সামাজিক গ্লানি ঘটাইবার জন্য প্রাচীন কুলশাস্ত্রের মধ্যে অনেক পরিবর্তন করাইয়াছেন কিংবা নূতন কুলশাস্ত্র লিখাইয়া পুরাতন কোন ঘটকের নামে চালাইয়াছেন। বর্তমান যুগেও এইরূপ বহু কৃত্রিম কুলজী-পুঁথি রচিত হইয়াছে। ইহাতে আশ্চর্য বোধ করিবার কিছু নাই। কারণ, জাতির সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধির জন্য ইহার উৎপত্তিসূচক প্রাচীন গ্রন্থ হইতে উদ্ধৃত অনেক বচন এবং অনেক তথাকথিত প্রাচীন সংহিতা ও তন্ত্রগ্রন্থ যে প্রকৃতপক্ষে আধুনিক কালে রচিত হইয়াছে ইহাতে কোন সন্দেহ নাই।
