পূজায় পাঁঠা ও মহিষ বলি সম্বন্ধে তিনি লিখিয়াছেন, “নদীয়ার বর্তমান মহারাজার পিতা পূজার প্রথম দিন একটি পাঁঠা বলি দেন। তারপর প্রতিদিন পূর্বদিনের দ্বিগুণ সংখ্যা এবং এইরূপে ১৬ দিনে ৩২,৭৬৮ পাঁঠা বলি দেন। একজন সম্ভ্রান্ত হিন্দু আমাকে বলিয়াছেন যে তিনি এক বাড়ীর পূজায় ১০৮টি মহিষ বলি দেখিয়াছেন।
“বলি শেষ হইলে ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে উপস্থিত দর্শকবৃন্দ নিহত পশুর রক্তলিপ্ত কর্দম গায়ে মাখিয়া উন্মত্তের মত নাচিতে আরম্ভ করে এবং তারপর রাস্তায় বাহির হইয়া অশ্লীল গীত ও নৃত্য করিতে করিতে অন্যান্য পূজা-বাড়ীতে গমন করে।”
মোটের উপর একথা বলিলে অত্যুক্তি হইবে না যে দুর্গাপূজায় রাজসিক ও তামসিক ভাবের যেরূপ প্রাধান্য ছিল তদনুপাতে সাত্ত্বিক ভাবের পরিচয় বিশেষ কিছু পাওয়া যায় না।
বাংলা দেশে প্রচলিত কালীপূজার প্রবর্তক ছিলেন সম্ভবত কৃষ্ণানন্দ আগম বাগীশ। তাঁহার তন্ত্রসার গ্রন্থে কালীপূজার বিধান সংগৃহীত হইয়াছে। অনেকে মনে করেন কৃষ্ণানন্দ চৈতন্যদেবের সমসাময়িক। কিন্তু অনেকের মতে ‘তন্ত্রসার’ নামক তন্ত্রশাস্ত্রের সার-সঙ্কলন-গ্রন্থ পরবর্তী কালে রচিত।
দীপালি উৎসবের দিনে কালীপূজার বিধান ১৭৬৮ খ্রীষ্টাব্দে রচিত কাশীনাথের ‘কালীসপর্যাবিধি’ গ্রন্থে পাওয়া যায়। ইহার খুব বেশী পূর্বে কালীপূজা সম্ভবত বাংলাদেশে সুপরিচিত ছিল না। প্রচলিত প্রবাদ অনুসারে নবদ্বীপের মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্রই কালীপূজার প্রবর্তন করেন এবং কঠোর দণ্ডের ভয় দেখাইয়া তাঁহার প্রজাদিগকে এই পূজা করিতে বাধ্য করেন।
তন্ত্রসারে কালী ব্যতীত তারা, ষোড়শী, ভুবনেশ্বরী, ভৈরবী, ছিন্নমস্তা, বগলা প্রভৃতি মহাবিদ্যাগণের সাধনবিধিও সংকলিত হইয়াছে। এই সমুদয় দেবীকে অবলম্বন করিয়া বাংলায় তন্ত্রসাধন বিশেষ প্রভাব বিস্তার করিয়াছিল। কৃষ্ণানন্দ, ব্রহ্মানন্দ, পূৰ্ণানন্দ ও সর্বনান্দ ঠাকুর প্রভৃতি বিখ্যাত শাক্ত সাধকগণ ষোড়শ সপ্তদশ শতাব্দীতে বর্তমান ছিলেন। অষ্টাদশ শতকের মধ্যভাগে আর একজন বিখ্যাত কালীসাধক রামপ্রসাদ সেন তাঁহার গানের মাধ্যমে প্রসিদ্ধি লাভ করিয়াছেন।
দুর্গাপূজা কালীপূজা অপেক্ষা প্রাচীনতর। কিন্তু দুর্গাপূজা সাত্ত্বিক সাধনার বিকাশ হিসাবে কালীপূজা অপেক্ষা অনেক নিম্নস্তরের। এইজন্য দুর্গাপূজার প্রচলন ও জাঁকজমক বেশি হইলেও বাংলা দেশে শক্তিসাধকের নিকট কালীপূজাই অধিকতর উচ্চস্তরের বলিয়া গণ্য হয়।
৫
বাস্তব সমাজের চিত্র
১। নানা জাতি : স্মৃতিশাস্ত্রে হিন্দুর সামাজিক ও গার্হস্থ্য জীবন এবং লৌকিক ধর্মসংস্কার ও ধর্ম্মানুষ্ঠানের বিধান আছে। এই সমুদয় ও অন্যান্য সংস্কৃত গ্রন্থে যে আদর্শ হিন্দু সমাজের চিত্র পাওয়া যায়-বাস্তব জীবনে তাহা কতদূর অনুসৃত হইত তাহা বলা শক্ত। সমাজের বাস্তব চিত্র পাওয়া যায় সমসাময়িক বাংলা সাহিত্যে। ষোড়শ শতাব্দীতে (আ. ১৫৭৯ খ্রীষ্টাব্দ) রচিত মুকুন্দরামের কবিকঙ্কণ চণ্ডীতে কালকেতুর নূতন রাজধানী বর্ণনা উপলক্ষে এবং অন্যান্য প্রসঙ্গে যে সামাজিক চিত্র অঙ্কিত হইয়াছে তাহা বাংলা দেশের মধ্যযুগের বাস্তব চিত্র বলিয়া গ্রহণ করা যাইতে পারে। ষোড়শ ও সপ্তদশ শতাব্দীর অন্যান্য কয়েকখানি গ্রন্থে, বিশেষত বৈষ্ণব সাহিত্যে ইতস্তত বিক্ষিপ্ত সমাজচিত্রও এ বিষয়ের মূল্যবান উপকরণ। এই সমুদয়ের সাহায্যে বাঙালী সমাজের যে চিত্র আমাদের মানসচক্ষুতে ফুটিয়া ওঠে তাঁহার কয়েকটি প্রধান বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করিতেছি।
বাংলার হিন্দু সমাজে ব্রাহ্মণ কায়স্থ বৈদ্য সাধারণত এই তিন জাতিরই প্রাধান্য ছিল। মুকুন্দরাম তাঁহার নিজের জন্মস্থান দামুন্যা গ্রামের বর্ণনা আরম্ভে লিখিয়াছেন :
কুলে শীলে নিরবদ্য ব্রাহ্মণ কায়স্থ বৈদ্য
দামুন্যায় সজ্জন-প্রধান।
প্রায় একশত বৎসর পূর্বেও যে হিন্দুসমাজে এই তিন জাতিরই প্রাধান্য ছিল বিজয়গুপ্তের মনসামঙ্গল হইতেও আমরা তাহা জানিতে পারি। ব্রাহ্মণেরা নানা শ্রেণীতে বিভক্ত ছিলেন। বাংলা দেশের ইতিহাসের প্রথম ভাগে ব্রাহ্মণদের মধ্যে শ্রেণীবিভাগ, কৌলীন্যপ্রথা ও কুলীনদের বাসস্থানের নাম অনুসারে গাঞীর সৃষ্টি, এবং এ বিষয়ে কুলজীর উক্তি সবিস্তারে আলোচিত হইয়াছে। মুকুন্দরাম প্রায় চল্লিশটি গাঁঞীর উল্লেখ করিয়াছেন–চাটুতি, মুখটী, বন্দ্য, কাঞ্জিলাল, গাঙ্গুলি, ঘোষাল, পুতিতুণ্ড, মতিলাল, বড়াল, পিপলাই, পালধি, মাসচটক প্রভৃতি। ইহার অনেকগুলি এখনও বাঙালী ব্রাহ্মণের উপাধিস্বরূপ ব্যবহৃত হয়। এই ইতিহাসের প্রথম ভাগে মধ্যযুগের কুলজী বর্ণিত ব্রাহ্মণের শ্রেণীবিভাগ সম্বন্ধে যাহা বলা হইয়াছে কবিকঙ্কণ চণ্ডীতে তাঁহার সমর্থন পাওয়া যায়।
ব্রাহ্মণদের মধ্যে একদল ছিলেন খুব সাত্ত্বিক প্রকৃতির ও বিদ্বান। বেদ, আগম, পুরাণ, স্মৃতি, দর্শন, ব্যাকরণ, অলঙ্কার প্রভৃতি শাস্ত্রে তাঁহাদের পারদর্শিতা ছিল ও নানা স্থান হইতে বিদ্যার্থীগণ তাহাদের নিকট পড়িতে আসিত। কিন্তু মূর্খ বিপ্রেরও অভাব ছিল না, সম্ভবত ইহাদের সংখ্যাই বেশি ছিল; তাই মুকুন্দরাম ইহার সবিস্ত রি বর্ণনা করিয়াছেন :
মুখ বিপ্র বৈসে পুরে নগরে যাজন করে।
শিখিয়া পূজার অনুষ্ঠান।
চন্দন তিলক পরে দেব পূজে ঘরে ঘরে
চাউলের কোচড়া বান্ধে টান্ ॥
ময়রাঘরে পায় খণ্ড গোপঘরে দধিভাণ্ড
তেলি ঘরে তৈল কুপী ভরি।
কেহ দেয় চাল কড়ি কেহ দেয় ডাল বড়ি
গ্রাম যাজী আনন্দে সাঁতরি ॥
