মনসাও তখন তাঁহার স্বরূপ প্রকট করিলেন :
আকাশ পাতাল ভূমি স্বজন সফল আমি
শক্তিরূপা সবাকার মাতা।
মহেশের মহেশ্বরী মনোরূপা সুকুমারী
লক্ষ্মীরূপা নারায়ণ যথা ॥
মঙ্গলচণ্ডী কাব্যের আরাধ্যা দেবী অস্পৃশ্য ব্যাধ সমাজের দেবী। তিনি বনে গোধিকারূপে ব্যাধ কালকেতুকে দেখা দেন এবং শূকর মাংস তাঁহার পূজায় ব্যবহৃত হয়। খুল্লনার আরাধ্যা দেবী এই দেবী হইতে ভিন্ন এবং সভ্য ভব্য সমাজে মেয়েদের ব্রতের দেবী। কিন্তু মঙ্গলচণ্ডী কাব্যের প্রসাদে এই দুই দেবী মিলিয়া গিয়াছেন এবং পুরাণোক্তা মহাদেবী দুর্গা ও চণ্ডীদেবীর সহিত অভিন্ন বলিয়া পরিগণিত হইয়াছেন।
এইরূপে ষষ্ঠী, শীতলা প্রভৃতি মঙ্গলকাব্যে শঙ্করগৃহিণী শৈলসুতা রূপে বর্ণিত হইয়াছেন। ব্যাঘভয় নিবারণী কমলা দেবীও ‘সকলের শক্তি’ ও ‘জগতের মাতা, ‘পরম ঈশ্বরী জগতের মা’ এবং ‘ব্রহ্মা বিষ্ণু হর’ তাঁহাকে নিত্য পূজা করেন।
আজ পর্যন্ত এই সকল দেবদেবী প্রায় সর্বশ্রেণীরই পূজা পাইয়া আসিতেছেন। বাংলা সাহিত্যের মাধ্যমে ও পাঁচালীর গানে এই সকল দেবীর মাহাত্ম প্রচারই ইহার পথ প্রশস্ত করিয়াছে। সম্ভবত আর একটি কারণও ছিল। যখন দলে দলে নিম্নশ্রেণীর হিন্দুরা ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করিতেছিল তখন এই বিপর্যয়ের প্রতিকার স্বরূপ উচ্চশ্রেণীর হিন্দুরা এই সকল দেবীকে সম্মান ও স্বীকৃতি দিয়া নিম্নশ্রেণীদিগকে হিন্দুত্বের গণ্ডীর মধ্যে রাখিবার প্রয়াস পাইয়াছিলেন। মনে হয় এই কারণেই স্মার্ত রঘুনন্দন কৃত্য-তত্ত্ব অধ্যায়ে এই সকল লৌকিক দেবীদের পূজার বিধি দিয়াছেন। চণ্ডীমঙ্গলের কালকেতু আখ্যানেও নিম্নশ্রেণীর আর্থিক, সামাজিক ও আধ্যাত্মিক উন্নতির কথাই ঘোষিত হইয়াছে। সংস্কৃত সাহিত্যে যে শ্রেণীর অধিকার ছিল না, বাংলা সাহিত্যের উদ্ভবে সেই শ্রেণীর দাবি ও সংস্কৃতি সমাজের সকল স্তরের কর্ণগোচরে আনার সুযোগ মিলিয়াছিল।
এই বাংলা সাহিত্যের কল্যাণেই আমরা স্মৃতি-বহির্ভূত ধর্ম্মের আরও কিছু বিবরণ পাই। ব্যাঘ্ৰ কুম্ভীরাদিকে দেবতা শ্রেণীর পর্যায়ভুক্ত করা ও তৎসংশ্লিষ্ট বহু কুসংস্কারপূর্ণ অনুষ্ঠানের কথা পূর্বেই বলা হইয়াছে। হিন্দু ও মুসলমান উভয় সমাজেই ইহা প্রচলিত ছিল।
জলদেবতা কুম্ভীরবাহনকালুরায় ও অরণ্যদেবতা শার্দুলবাহন দক্ষিণরায়-এই দুই দেবতার পূজা এখনও প্রচলিত আছে।
মধ্যযুগের শেষে যে হিন্দুদের মধ্যে সতীদাহ, গঙ্গায় সন্তানবিসর্জন, চড়কের আত্মঘাতী বীভৎস যন্ত্রণা প্রভৃতি নিষ্ঠুর প্রথা প্রচলিত ছিল তাহাও এই সংস্কারেরই পরিণতি মাত্র।
মধ্যযুগে প্রবর্তিত যে কয়েকটি নূতন ধর্ম্মানুষ্ঠান এখনও বাংলা দেশে বিশেষ প্রভাবশালী, তাহাদের মধ্যে দুর্গাপূজা ও কালীপূজা এই দুইটিই প্রধান। ইহার মুখ্য কারণ তান্ত্রিক সাধনার সহিত এই দুই অনুষ্ঠানের নিগূঢ় সংযোগ।
বর্তমানকালে যে পদ্ধতিতে দুর্গাপূজা হয় চতুর্দ্দশ শতাব্দী বা তাঁহার কিছু পূর্বেই তাঁহার সূত্রপাত হইয়াছিল; কিন্তু সম্ভবত ষোড়শ শতকের পূর্বে তাহা ঠিক বর্তমান আকার ধারণ করে নাই।
চৈতন্যভাগবতে [মধ্য-২৩ অধ্যায়] আছে :
মৃদঙ্গ মন্দিরা শঙ্খ আছে সর্ব ঘরে।
দুর্গোৎসব কালে বাদ্য বাজাবার তরে ॥
ইহা হইতে বুঝা যায় যে ষোড়শ শতাব্দীর পূর্বেই দুর্গাপূজা খুব জনপ্রিয় হইয়া উঠিয়াছিল। প্রচলিত প্রবাদ এই যে মনুসংহিতার বিখ্যাত টীকাকার কুল্লুক ভট্টের পুত্র রাজা কংস নারায়ণ নয় লক্ষ টাকা ব্যয় করিয়া দুর্গাপূজা করেন এবং রাজসাহী জেলার অন্তর্গত তাহিরপুরের রাজপুরোহিত পণ্ডিত রমেশ শাস্ত্রী যে দুর্গাপূজাপদ্ধতি রচনা করেন তাহাই এখন পর্যন্ত প্রচলিত। অবশ্য ইহার সপক্ষে কোনও প্রমাণ নাই এবং অন্যমতও আছে। তবে দুর্গাপূজা প্রথম হইতেই সাত্ত্বিক ভাবে সাধনার অপেক্ষা রাজসিক সমারোহ ও জাঁকজমকপূর্ণ উৎসব বলিয়াই পরিগণিত হইত।
মিথিলার কবি বিদ্যাপতি দুর্গাভক্ততরঙ্গিনীতে কার্তিক, গণেশ, জয়া-বিজয়া (লক্ষ্মী-সরস্বতী) এবং দেবীর বাহন সিংহ সমেত প্রতিমায় শারদীয়া দুর্গাপূজার উল্লেখ করিয়াছেন। সুতরাং মিথিলায়ও চতুর্দ্দশ শতকে অনুরূপ দুর্গাপূজার প্রচলন ছিল। ভারতের আর কোনও অঞ্চলে এই প্রকার দুর্গাপূজা প্রচলিত ছিল, এরূপ কোন প্রমাণ নাই।
মধ্যযুগের প্রথম ভাগে দুর্গাপূজার সহিত সংশ্লিষ্ট অশ্লীল বাক্য উচ্চারণ ও ক্রিয়াদির সম্বন্ধে কালবিবেক ও বৃহদ্ধর্মের উক্তি পূর্বে উল্লেখ করিয়াছি। মধ্যযুগের শেষ পর্যন্ত যে এই সমুদয় অশ্লীলতা দুর্গাপূজার অঙ্গীভূত ছিল, বিদেশীয় একজন প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণ হইতে তাহা জানা যায়। ঊনবিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে লিখিত এই বিবরণের সার মর্ম দিতেছি।
“দিনের পূজা শেষ হইলে ধনী লোকের বাড়ীতে দেবীর মূর্ত্তির সম্মুখে একদল বেশ্যার নৃত্যগীত আরম্ভ হয়। তাহাদের পরিধেয় বস্ত্র এত সূক্ষ্ম যে তাহাকে দেহের আবরণ বলা যায় না। গানগুলি অতিশয় অশ্লীল এবং নৃত্যভঙ্গী অতিশয় কুৎসিত। ইহা কোন ভদ্র সমাজে উচ্চারণ বা বর্ণনার যোগ্য নহে। অথচ দর্শকেরা সকলেই ইহা উপভোগ করেন–কোন রকম লজ্জা বোধ করেন না।” লেখক ১৮০৬ খ্রীষ্টাব্দে কলিকাতায় রাজা রাজকৃষ্ণের বাড়ীতে এই দৃশ্য প্রত্যক্ষ করিয়াছিলেন।
