তান্ত্রিক ধর্ম ও আচার পুরাপুরি সমর্থন না করিলেও তিনি তান্ত্রিকগ্রন্থগারুড় তন্ত্র, রুদ্র-যামল, শৈবাগম প্রভৃতি হইতে অনেক শ্লোক উদ্ধৃত করিয়াছেন। বল্লালসেন তাঁহার দানসাগরে তান্ত্রিক ও এই শ্রেণীর অর্ব্বাচীন গ্রন্থগুলিকে ভণ্ড প্রতারকের লেখা বলিয়া একেবারে বর্জন করিয়াছিলেন। সুতরাং দেখা যায় যে মধ্যযুগের প্রথম ভাগেই গোঁড়া হিন্দুদের ভিতরেও পরিবর্তনের সূত্রপাত হইয়াছিল। কিন্তু ইহা বেশীদূর অগ্রসর হয় নাই, কারণ প্রাচীনপন্থী স্মার্ত গোবিন্দানন্দ, অচ্যুত চক্রবর্তী, প্রভৃতি এই নূতন পন্থার তীব্র প্রতিবাদ করেন। এমন কি শ্রীনিবাস আচার্যের শিষ্য রঘুনন্দন ভট্টাচার্যও গুরুর অনেক মত খণ্ডন করিয়া প্রাচীন পদ্ধতি সমর্থন করিয়াছেন। রঘুনন্দন অগাধ পণ্ডিত ও সুনিপুণ নৈয়ায়িকের কৌশলসহকারে যে সমুদয় মত প্রতিষ্ঠা করিলেন বাংলার রক্ষণশীল হিন্দুসমাজ তাহাই গ্রহণ করিল। পরে আধুনিক স্মার্তদের প্রতিপত্তি ধীরে ধীরে কমিয়া গেল। কিন্তু রঘুনন্দনও তন্ত্রশাস্ত্র সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করেন নাই এবং কোন কোন বিষয়ে তন্ত্রের সাহায্যে স্মৃতির ব্যাখ্যা করিয়াছেন।
কিন্তু সমাজে ব্রাহ্মণ্য ধর্ম্মের প্রাচীন আদর্শও অনেক পরিমাণে খর্ব হইল। বৃহদ্ধর্ম্মপুরাণ সম্ভবত এয়োদশ-চতুর্দ্দশ শতকের বাংলা দেশের ধর্ম ও সামাজিক পরিবর্তনের নিদর্শন বলিয়া গ্রহণ করা যাইতে পারে। ইহাতে বলা হইয়াছে যে ব্রাহ্মণেরা মদ্য, মাংস, মৎস্য সহকারে দেবপূজা করিতে পারে, শাস্ত্রানুসারে নরবলি দিতে পারে, আপকালে শূদ্রদিগকে ধর্মোপদেশ ও মন্ত্র দান করিতে পারে এবং পুরাণ পাঠ করিয়া শুনাইতে পারে।
যবন অর্থাৎ মুসলমানদের প্রতি তীব্র বিদ্বেষ এবং ঘৃণাও এই গ্রন্থে পরিস্ফুট হইয়াছে। উক্ত হইয়াছে যে যবনের সংস্পর্শ ও তাহাদের ভাষা ব্যবহার সুরাপানের তুল্য দূষণীয়। তাহাদের অনুগ্রহণ আরও দূষণীয় এবং ম্লেচ্ছ যবনী সংসর্গ সর্বদা পরিত্যজ্য।
মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যে যে ধর্মজীবনের চিত্র দেখিতে পাই তাহাও স্মৃতিশাস্ত্রের আদর্শ হইতে সম্পূর্ণ বিভিন্ন। চৈতন্য ভাগবতকার দুঃখের সহিত বলিয়াছেন যে ভক্তিমূলক বৈষ্ণব ধর্ম লোপ পাইয়াছে। ধর্ম্মের নামে যাহা প্রচলিত তাহা হয় তান্ত্রিক সাধনা অথবা লৌকিক দেবদেবীর পূজা। এক তান্ত্রিক সাধনার কথা তিনি লিখিয়াছেন :
রাত্রি করি মন্ত্র পড়ি পঞ্চ কন্যা আনে।
নানাবিধ দ্রব্য আইসে তা সবার সনে ॥
ভক্ষ্য ভোজ্য গন্ধমাল্য বিবিধ বসন।
খাইয়া তা সবা সঙ্গে বিবিধ রমন ॥
‘মদ্য, মাংস দিয়া যক্ষ পূজার ‘কথাও লিখিয়াছেন। ‘শ্রীকৃষ্ণকীর্তনে নর-কপাল হস্তে যোগিনীর ভিক্ষা করার কথা আছে। পূর্বে সহজিয়া প্রসঙ্গে তান্ত্রিক অনুষ্ঠানের ইঙ্গিত দেওয়া হইয়াছে। শক্তিতত্ত্বমূলক তান্ত্রিক সাধনা যে প্রাচীন কাল হইতেই প্রচলিত এবং মধ্যযুগেই ইহা বঙ্গদেশীয় স্মার্তগণের স্বীকৃতি লাভ করে তাহা পূর্বেই বলা হইয়াছে। তান্ত্রিক শাক্ত সাধনার প্রভাব বৌদ্ধ, শৈব, বৈষ্ণব সকল ধর্ম্মেই দেখা যায়। মূলতঃ বেদান্তের ব্রহ্ম ও মায়া, সাংখ্যের পুরুষ ও প্রকৃতি এবং তন্ত্রের শিব ও শক্তি একই তত্ত্বের বিভিন্ন দিক বলিয়া গ্রহণ করা যাইতে পারে। ক্রমে ক্রমে বিষ্ণু ও লক্ষ্মী, কৃষ্ণ ও রাধা এবং রাম ও সীতা–এই সকল যুগলও এই তত্ত্বের অন্তর্ভুক্ত হইয়াছেন। মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যে ইঁহারা সকলেই অভিন্ন এবং আজ পর্যন্তও রাধা-শ্যাম, ভবানী শঙ্কর, সীতা-রাম প্রভৃতি একই ভগবানের বিভিন্ন মূর্ত্তিরূপে পূজা পাইয়া আসিতেছেন। নানারূপে বিভিন্ন ধর্মমতের এই অপূর্ব সমন্বয় বা সামঞ্জস্য বাংলায় মধ্যযুগের হিন্দুধর্ম্মের একটি বৈশিষ্ট্য।
চৈতন্যভাগবতকার বর্ণিত মঙ্গলচণ্ডী, মনসা বা বাশুলী প্রভৃতি লৌকিক দেবীগণের পূজা এই যুগের আর একটি বৈশিষ্ট্য। এই সকল দেবীর মাহাত্ম-বর্ণন ও পূজা প্রচলনের জন্য এক শ্রেণীর কাব্যের উদ্ভব হয়। এইগুলি মঙ্গলকাব্য নামে পরিচিত। সেকালে পাঁচালী গায়করা ইহা অবলম্বন করিয়া গান গাহিত।
মঙ্গলকাব্য বাংলার নিজস্ব সম্পদ, ভারতবর্ষের অন্য কোন প্রদেশে নাই। বাংলা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে যে সমুদয় অখ্যাত বা অল্পখ্যাত দেবদেবীর পূজা প্রচলিত ছিল, অথবা যে সব দেবদেবী প্রসিদ্ধ হইলেও সমাজের উচ্চকোটিতে স্বীকৃতি বা সম্মানের আসন পান নাই, প্রধানত তাঁহারাই মঙ্গলকাব্যের উপজীব্য। ইহাদের মধ্যে মনসা, মঙ্গলচণ্ডী, শীতলা, কালিকা, ষষ্ঠী, কমলা, বাশুলী, গঙ্গা, বরদা, গোসানী, ঘণ্টাকর্ণ প্রভৃতির নাম করা যাইতে পারে। এই সকল মঙ্গলকাব্য ও তাহাদের কাহিনী পঞ্চদশ পরিচ্ছেদে আলোচিত হইয়াছে। ইহাদের মধ্যে মনসা ও মঙ্গলচণ্ডীকাঁদেবীর মাহাত্ম কীর্তন করিয়া কয়েকজন প্রসিদ্ধ কবি কাব্য রচনা করিয়াছেন। এগুলি পাঁচালীগানের বিষয়বস্তু হওয়ায় এই দুই দেবী সমাজের সর্বশ্রেণীর জনপ্রিয়তা লাভ করিয়াছেন। কাজেই তাঁহাদের মর্যাদা ও ভক্তের সংখ্যাও বাড়িয়াছে।
শুধু দেবীমাহাত্ম্য বর্ণনা করাই প্রসিদ্ধ মঙ্গলকাব্যগুলির উদ্দেশ্য নহে। যে আদ্যাশক্তি সৃষ্টির মূল কারণ, যিনি চণ্ডীরূপে মার্কণ্ডেয় পুরাণে পূজিতা এবং সাংখ্যে প্রকৃতি বলিয়া অভিহিতা, সেই মহাদেবী আর উল্লিখিত লৌকিক দেবীগণ যে অভিন্ন ইহা প্রতিপাদন করা তাহাদের অন্যতম উদ্দেশ্য। মনসা ও মঙ্গলচণ্ডী সম্পর্কীয় কাব্যে ইহা পরিস্ফুট হইয়াছে। মনসা প্রাচীন পৌরাণিক যুগের দেবী নহেন। সর্প-দেবী নামে তিনি নানা স্থলে পূজিতা হইতেন এবং ক্রমে শিবের কন্যা বলিয়া খ্যাতি লাভ করেন। শিবভক্ত চাঁদ সদাগর যখন অবজ্ঞাভরে মনসাকে পূজা করিতে কিছুতেই রাজী হইলেন না তখন দৈববাণী হইল যে মনসা ও ভগবতী একই দেবী। চাঁদ সদাগর ইহা মানিয়া লইয়া মনসাকে পূজা করিয়া স্তব করিলেন : ‘আদ্যাশক্তি সনাতনী, মুক্তিপদ-প্রদায়িনী, জগতে পূজিতা তুমি জয়া।
