ভারতবর্ষের মধ্যযুগে যে বিশিষ্ট ধর্ম সম্প্রদায় নিরপেক্ষ, যুক্তিমূলক, আচার অনুষ্ঠানবর্জিত, জাতিভেদ ও সর্বপ্রকার শ্রেণীভেদরহিত, কেবলমাত্র ব্যক্তিগত ও বিশুদ্ধ অন্তর্নিহিত প্রেম ও ভক্তির উপর প্রতিষ্ঠিত এই উদার সার্বজনীন ধর্মমত ভগবানকে লাভ করিবার প্রকৃষ্ট পথ বলিয়া কবীর, নানক, চৈতন্য প্রভৃতি বহু সাধুসন্ত প্রচার করিয়াছিলেন তাহা এই যুগের ধর্ম্মের ইতিহাসে একটি বিশিষ্ট মর্যাদা লাভ করিয়াছে। অনেকেই মনে করেন যে ইসলামের সহিত ঘনিষ্ঠ সম্বন্ধ ইহার উৎপত্তির অন্যতম কারণ। কিন্তু বাংলা দেশের বৌদ্ধ ও বৈষ্ণব সহজিয়ারা যে মুসলমান সংস্পর্শে আসিবার বহু পূর্ব হইতেই এই সাধনার ধারার সহিত পরিচিত ছিল তাহা অস্বীকার করিবার উপায় নাই। সুতরাং ইহা বাংলার সংস্কৃতির নিজস্ব বৈশিষ্ট্য বলিয়া গ্রহণ করাই যুক্তিসঙ্গত। কবীর বা নানকের উপর ইসলাম কতটা প্রভাব বিস্তার করিয়াছিল, এই গ্রন্থে তাঁহার আলোচনা অপ্রাসঙ্গিক। কিন্তু চৈতন্যের জীবনী ও ধর্মমত সম্বন্ধে যতটুকু জানিতে পারা যায় তাহাতে ইসলামের কোন প্রভাব কল্পনা করার কোন যুক্তিসঙ্গত কারণ নাই। চৈতন্যের সহিত কবীর, নানক প্রভৃতির প্রভেদও বিশেষ লক্ষণীয়। চৈতন্য কৃষ্ণকে ঈশ্বর বলিয়া স্বীকার করিতেন। পুরীতে জগন্নাথ মূর্ত্তি দেখিয়া তাঁহার ভাবাবেশ হইয়াছিল। তিনি বৃন্দাবন প্রভৃতি তীর্থের মাহাত্ম স্বীকার করিতেন। জাতিভেদ না মানিলেও তিনি ইহা কিংবা প্রাচীন হিন্দুপ্রথা ও অনুষ্ঠান একেবারে বর্জন করেন নাই। কিছুকাল পরেই তাঁহার সম্প্রদায় জাতিভেদ ও ব্রাহ্মণদের শ্রেষ্ঠত্ব স্বীকার করিয়া লইয়াছিলেন। এই সমুদয়ই কবীর, নানক ও ইসলামীয় ধর্মমতের সম্পূর্ণ বিরোধী। চৈতন্যের ধর্মমতের সহিত ইহাদের যে সাদৃশ্য পরিলক্ষিত হয়, তাহা প্রাচীন বৌদ্ধ সহজিয়ার প্রভাবেরই ফল, এই মত গ্রহণ করাই অধিকতর যুক্তিসঙ্গত। অর্থাৎ চৈতন্য ও বৈষ্ণব সহজিয়াগণ সকলেই প্রাচীন বৌদ্ধ সহজিয়ার সাধনা দ্বারাই অল্প বা বেশি পরিমাণে প্রভাবান্বিত হইয়াছিলেন। অন্য কোন বিদেশী প্রভাব স্বীকার করিবার প্রয়োজন নাই এবং ইহার সপক্ষে কোন যুক্তি বা প্রমাণও নাই। নাথ সম্প্রদায়ও অনেকটা সহজিয়াদের মতন–কেহ বৌদ্ধ ধর্ম হইতে কেহ বা হিন্দুধর্ম হইতে নাথ পন্থা গ্রহণ করেন।
এই নাথ বা যুগী সম্প্রদায়ও বাংলা দেশে খুব প্রভাবশালী হইয়াছিল এবং ক্রমে ভারতবর্ষের নানাস্থানে ছড়াইয়া পড়িয়াছিল। কায়-সাধন, হঠযোগ প্রভৃতি প্রক্রিয়ার সাহায্যে নানারূপ অলৌকিক শক্তি অর্জন এবং মৃত্যুর হাত হইতে পরিত্রাণ লাভ করাই ছিল ইহাদের লক্ষ্য। এই সম্প্রদায়ের গুরু গোরক্ষনাথ এবং শিষ্যা রাণী ময়নামতী ও তাঁহার পুত্র গোপীচান্দের কাহিনী বাংলা সাহিত্যের মাধ্যমে বিশেষ প্রসিদ্ধি লাভ করিয়াছে। এই সম্প্রদায় এখন কানফাটা যোগী নামে পরিচিত এবং বাংলার বাহিরে বিহার, নেপাল, উত্তর প্রদেশ, পঞ্জাব, গুজরাট ও মহারাষ্ট্রে এখনও ইহারা বহুসংখ্যায় বিদ্যমান। সংস্কৃত, হিন্দী, পঞ্জাবী, মারাঠি ও ওড়িয়া ভাষায় রচিত ধর্মশাস্ত্র এককালে এই সম্প্রদায়ের বিস্তৃতি ও প্রাধান্যের সাক্ষ্য দিতেছে।
ধর্মঠাকুরের পূজা এখনও পশ্চিমবঙ্গে কোন কোন স্থানে প্রচলিত আছে। শূন্যপুরাণ ও ধর্মপূজা বিধান নামে এই সম্প্রদায়ের দুইখানি বাংলা ভাষায় রচিত ধর্মশাস্ত্রে এই লুপ্তপ্রায় সম্প্রদায়ের পরিচয় ও পূজার অনুষ্ঠান বিবৃত হইয়াছে। বর্তমানে হাড়ী, ডোম, বাগদী প্রভৃতি নিম্নশ্রেণীর মধ্যেই ইহা প্রচলিত। কিন্তু ধর্মমঙ্গল নামক এক শ্রেণীর গ্রন্থ হইতে ইহার পূর্বপ্রভাব ও অনেক কাহিনী জানা যায়। এক অমিতবলশালী যোদ্ধা লাউসেনের যুদ্ধবিজয়কে কেন্দ্র করিয়াই এই সমুদয় কাহিনী রচিত হইয়াছে। ইহাদের মতে লাউসেন পালরাজগণের সমসাময়িক ছিলেন; কিন্তু ইহার কোন প্রমাণ নাই। সুতরাং লাউসেন কাল্পনিক ব্যক্তি বলিয়াই মনে হয়। কেহ কেহ ধর্মঠাকুরের পূজাকে বাংলায় বৌদ্ধধর্ম্মের শেষ নিদর্শন বলিয়া মনে করেন; কিন্তু বৌদ্ধধর্ম্মের স্পষ্ট উল্লেখ থাকিলেও ধর্মঠাকুরের পূজায় হিন্দুদের দেবী, তান্ত্রিক ধর্মমত এবং অনার্য আদিম জাতির ধর্মবিশ্বাসেরও যথেষ্ট নিদর্শন পাওয়া যায়। উচ্চশ্রেণীর হিন্দুদের বিরুদ্ধে এই সম্প্রদায়ের আক্রোশ এবং বিজেতা মুসলমানদের প্রতি সহানুভূতির কথা পূর্বেই উল্লেখ করা হইয়াছে। [এই অধ্যায়ের প্রারম্ভেই বর্ণিত]
এইরূপ আরও অনেক ধর্মমত প্রচলিত ছিল যাহা ব্রাহ্মণ্য ধর্ম্মের অন্তবর্তী নহে এবং স্মৃতিশাস্ত্র অনুমোদিত আচার ব্যবহারেরও বিরোধী। দ্বাদশ শতাব্দী হইতেই বাংলায় বেদের পঠন-পাঠন এবং বৈদিক ক্রিয়াকর্মের প্রচলন অনেক কমিয়া গিয়াছিল এবং তান্ত্রিক মতের প্রভাব বাড়িয়াছিল। এমন কি, এই সকল মতের সমর্থনে পুরাণের অনুকরণে তাক্ষ্য, ব্রাহ্মণ, আগ্নেয়, বৈষ্ণব প্রভৃতি নামে কৃত্রিম পুরাণগ্রন্থ রচিত হইয়াছিল। তারপর মুসলমান আক্রমণের ফলে এয়োদশ শতাব্দীতে হিন্দুসমাজে অনেক বিপর্যয় ঘটে। বিশেষত অনেক লৌকিক ধর্ম প্রভাবশালী হইয়া উঠে এবং অনেক অনাচার সমাজে প্রবেশ করে। সমাজের নায়ক স্মার্ত পণ্ডিতগণের উপর ইহার প্রতিক্রিয়া দুই বিপরীত রকমের হয়। এক দল এই নূতন ভাবধারা ও আচার ব্যবহার কতক পরিমাণে স্বীকার করিয়া প্রাচীনের সহিত নূতনের সামঞ্জস্য সাধন করিতে চাহেন। অপর দল ইহাদিগকে আধুনিক এই আখ্যা দিয়া ব্যঙ্গ বিদ্রূপ করেন। প্রথম শ্রেণীভুক্ত দুইজন প্রধান স্মার্ত ছিলেন শূলপাণি ও শ্রীনাথ আচার্য চূড়ামণি। শূলপাণি তান্ত্রিক ধর্ম এবং ইহার শাস্ত্র অপ্রামাণিক বলিয়া একেবারে ত্যাগ করেন নাই বরং পুরাণ ও প্রাচীন স্মৃতির অনুমোদন না থাকিলেও দোল, রাসলীলা প্রভৃতি বিধিসঙ্গত হিন্দু আচরণ বলিয়া গ্রহণ করেন। শ্রীনাথ আচার্য আরও অনেক দূর অগ্রসর হইলেন। তিনি বলিলেন যে শাস্ত্র বহির্ভূত হইলেও দেশপ্রসিদ্ধ আচার ব্যবহারও প্রামাণিক বলিয়া স্বীকার করিতে হইবে। তিনি এই সূত্র অনুযায়ী মৎস্যভক্ষণ প্রভৃতি অনুমোদন করিলেন।
