বেদ সম্বন্ধে উক্তি :
“বেদ ত আর পরমার্থ নয়, বেদ কেবল বাজে কথা বলে।”
বিভিন্ন ধর্ম্মের সাধু সন্ন্যাসীর সম্বন্ধে উক্তি :
‘ঈশ্বরপরায়ণেরা গায়ে ছাই মাখে; মাথায় জটা ধরে, প্রদীপ জ্বালিয়ে ঘরে বসিয়া থাকে, ঘরে ঈশান কোণে বসিয়া ঘণ্টা চালে, আসন করিয়া বসে, চক্ষু মিটমিট করে, কানে খু খুস্ করে ও লোককে ধাঁধা দেয়।’
‘ক্ষপণকেরা জৈন সাধু) আপনার শরীরকে কষ্ট দেয়, নগ্ন হইয়া থাকে এবং আপনার কেশোৎপাটন করে। যদি নগ্ন হইলে মুক্তি হয় তাহা হইলে শৃগাল কুকুরের মুক্তি আগে হইবে, যদি লোমোৎপাটনে মুক্তি হয় তবে…(তা জুবই নিত্যম্বহ’ ইতি), ময়ূরপুচ্ছ গ্রহণ করিলে যদি মুক্তি হয় তবে ময়ূর ও মৃগের মুক্তি হওয়া উচিত, তৃণ আহার করিলে যদি মুক্তি হয় তাহা হইলে হাতি-ঘোড়ার আগে মুক্তি হওয়া উচিত।’
‘যে বড় বড় শ্রমণ (বৌদ্ধ) স্থবির আছেন, কাহারও দশ শিষ্য, কাহারও কোটি শিষ্য সকলেই গেরুয়া কাপড় পরে, সন্ন্যাসী হয় ও লোক ঠকাইয়া খায়।’
‘সহজ পন্থা ভিন্ন পন্থাই নাই। সহজ পন্থা গুরুর মুখে শুনিতে হয়। যে যে উপায়েই মুক্তির চেষ্টা করুক না কেন, শেষে সকলকে সহজ পথেই আসিতে হইবে।’
এই সমুদয় উক্তির ঐতিহাসিক মূল্য খুবই গুরুতর। প্রচলিত সংস্কার আচার ও ধর্ম্মানুষ্ঠানের বিরুদ্ধে যুক্তিমূলক বিদ্রোহ আমাদিগকে বাংলার উনবিংশ শতাব্দীর নব জাগরণ বা রেনেসাঁসের (Renaissance) কথা স্মরণ করাইয়া দেয়। আর এই সাধনের ধারা যে মধ্যযুগে অব্যাহত গতিতে প্রবাহিত হইয়াছিল, বৈষ্ণব সহজিয়াদের অনুরূপ ধর্মমত তাহা প্রতিপন্ন করে। এই সহজিয়াদের একটি প্রকৃষ্ট নিদর্শন–বাউল সম্প্রদায়। ইহা এখনও একেবারে বিলুপ্ত হয় নাই এবং ইহাদের অনেক গানের মধ্য দিয়া আমরা সহজিয়া মতের প্রতিধ্বনি শুনিতে পাই। ধর্ম সম্প্রদায়ে সাধারণত যেরূপ প্রথাবদ্ধতা, গতানুগতিকতা, এবং রীতিপ্রবণতা দেখা যায়, বাউলেরা তাহা হইতে অনেকটা মুক্ত।
ভক্ত ও ভগবানের সম্বন্ধ ব্যক্তিগত অনুভূতির উপর প্রতিষ্ঠিত; দলবদ্ধ আচার অনুষ্ঠান পূজাপদ্ধতির সহিত তাঁহার কোন সম্বন্ধ নাই–বরং এগুলি তাহাদের মধ্যে ব্যবধানের সৃষ্টি করে মাত্র এবং মানুষ যে অনুষ্ঠানের ও ধর্মমতের অপেক্ষা অনেক বড় এই গানগুলির মধ্য দিয়া তাহা অতি সুন্দর ও সহজভাবে ফুটিয়া উঠিয়াছে। এ বিষয়ে একজন বিশেষজ্ঞের মত সংক্ষেপে উদ্ধৃত করিতেছি : [ক্ষিতিমোহন সেন, বাংলার সাধনা, ৭৬-৮৪ পৃ.]
“বাউলেরা জাতি, পঙতি, তীর্থপ্রতিমা, শাস্ত্রবিধি, ভেখ-আচরণ মানেন না। মানবতত্ত্বই তাদের সার। মানবের মধ্যে সর্ববিশ্বচরাচর, সেখানেই সাধনা। তাঁদের সাধনার মূল তত্ত্ব হল প্রেম। কাজেই ভগবানের সঙ্গে সমান হতে হবে। ভগবানও ঐশ্বর্যময়, বিশ্বপতি হলে হবে কি, প্রেমে তিনি ধরা দিতেই ব্যাকুল। তাই বাউল বলেন–
জ্ঞানের অগম্য তুমি প্রেমেতে ভিখারী।
এই বাউলেরা শাস্ত্রবিধি মানেন না। … আর পাগল তো কোন নিয়মের ধার ধারে না। তাই তাঁরা দেওয়ানা বা পাগল। বাউল বা বাতুল কথার অর্থও পাগল। বাউলেরা তাই গান করেন
তাই তো বাউল হৈনু ভাই।
এখন বেদের ভেদ বিভেদের
আর তো দাবি দাওয়া নাই।
লোক চলাচলের পথ বন্ধ্যা। তাতে ঘাসটুকুও জন্মাতে পারে না।–
গতাগতের বাংঝা পথে
আজায় না ঘাস কোনমতে।
এই লোকাঁচারের বন্ধ্যা পথে বাউলেরা অগ্রসর হতে নারাজ। তাই তাঁরা লোক প্রচলিত বিধিও মানেন না, আবার প্রাণহীন অবাস্তব তত্ত্বও বোঝেন না। তাঁরা চান মানুষ, কিন্তু সে মানুষ আস্ত মানুষ, যে সমাজের ভগ্নাংশ নয়। সেই পরিপূর্ণ মানুষই ব্যক্তি, ইংরেজীতে যাকে বলে পার্সনালিটি। তার মধ্যেই যে সব–
আদ্য অন্ত এই মানুষের, বাইরে কোথাও নাই। [চণ্ডীদাসের উক্তি স্মরণীয়—”সবার উপরে মানুষ সত্য তাঁহার উপরে নাই।”]
লোকমত এবং সম্প্রদায়গুলিই তো ভগবানের দিকে যাবার প্রেমপথের সব বাধা–
তোমার পথ ঢাইক্যাছে মন্দিরে মসজেদে।
তোমার ডাক গুনি সাঁই, চলতে না পাই
রুখে দাঁড়ায় শুরুতে মরশেদে ॥
এই জীবন্ত প্রেম কি মৃত শাস্ত্রের কাছে মেলে? তার খবর মেলে জীবন্ত মানুষের কাছে। তাঁরাই গুরু। শাস্ত্ৰষ্কারগ্রস্ত শুরু হলে চলবে না, চাই প্রেমে-প্রাণে-রসে ভরপুর গুরু। তিনি যে বিশেষ একটি মানুষ তা নয়। নিখিল চরাচরের সবকিছুই শুরু হয়ে আমার অন্তরে দিনের পর দিন অনন্তকাল ধরে সেই দীক্ষা দিচ্ছেন। তাই বাউলদের–
অধিক গুরু, পথিক গুরু, গুরু অগণন।
গুরু বলে কার্কে প্রণাম করবি মন?
আমাদের জীবন থেকে ভগবানকে নির্বাসিত করে রেখেছি। সেই জেলখানার নামই ঠাকুর ঘর। সেখানে দিনের মধ্যে এক আধটুকু সময় গিয়ে ঠাকুরের সঙ্গে দেখা বা মোলাকাত করে আসি। এইটুকু মোলাকাতেই মন তৃপ্ত হবে! যদি তিনি প্রেমময় প্রাণেশ্বর, তবে তাঁকে সর্বকাল ও জীবনের সর্বস্থান ছেড়ে দিতে হবে না?–
ও তোর কিসের ঠাকুর ঘর?
(যারে) ফাটকে তুই রাখলি আটক
তারে আগে খালাস কর।
সহজিয়া বৈষ্ণবদের সহিত বাউলদের কিছু প্রভেদ আছে। সহজিয়া বৈষ্ণবগণ রাধা ও কৃষ্ণের প্রেমের মধ্য দিয়া পরমাত্মার উপলব্ধি করেন। বাউলদের মতে প্রত্যেক ব্যক্তির অন্তরেই পরমাত্মা আছেন, তাঁহার সহিত যোগাযোগ স্থাপন করিতে পারিলেই পরমাত্মা বা ভগবানের উপলব্ধি হয়। এই মনের মানুষই বাউলের ভগবান এবং তাঁহার সহিত প্রত্যক্ষ সম্বন্ধ স্থাপনই বাউলের চরম ও পরম লক্ষ্য। এবং এই সম্বন্ধ প্রেমের মধ্য দিয়াই স্থাপিত হয়। অনেকে মনে করেন যে বাউলদের উপর সুফী সম্প্রদায়ের প্রভাব আছে। কিন্তু সুফীমতের উপর যে উপনিষদ ও সহজিয়ার যথেষ্ট প্রভাব আছে এবং সুফীদের চিন্তা ও সাধনার ধারা যে ভারতবাসীদের নিকট কোন নূতন তথ্য উপস্থিত করে নাই, ইহাও অনেকেই স্বীকার করিয়াছেন।
