বৌদ্ধগ্রন্থ কথাব্যুতে ‘একাধিপ্লয়ো’ নামক একটি প্রথার উল্লেখ আছে। যে কোন স্ত্রী-পুরুষ পরস্পরের প্রতি আকৃষ্ট হইলে তাহাদের দৈহিক মিলন হইতে পারে।
এই সকল দৃষ্টান্তের উল্লেখ দেখিয়া মনে হয় যে পরকীয়া-প্রেমের ভিত্তিতে ভগবপ্রাপ্তির সাধনা হয়ত একটি প্রাচীন সাধনার ধারার অনুকরণ ঊধ্বতন মাত্র। অন্ততঃ বর্তমান যুগে আমরা ইহাকে যে চক্ষে দেখি মধ্য ও প্রাচীন যুগের দৃষ্টিভঙ্গি তাহা হইতে অন্যরূপ ছিল। এই প্রসঙ্গে স্মরণ রাখা কর্তব্য যে মধ্যযুগের কয়েকজন প্রধান স্মার্ত পণ্ডিতও তন্ত্রোক্ত সাধনার ধারাকে স্বীকার করিয়া লইয়াছেন। প্রাচীন যুগের শেষ পর্যন্ত শাস্ত্রকারেরা ইহাকে ধর্ম্মানুষ্ঠান বলিয়া স্বীকার করেন নাই।
এই সহজিয়া সম্প্রদায়ের মধ্যে অনেকগুলি মধ্যযুগের শেষ পর্যন্ত সুপরিচিত ছিল। কয়েকটি এখনও আছে। দু একটির বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করিতেছি। কর্ত্তাভজা সম্প্রদায় আউলাদ নামক এক সাধু অষ্টাদশ খ্রীষ্টাব্দে প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি নদীয়া জিলার নানা স্থানে ইহা প্রচার করেন। ১৭৬৯ খ্রীষ্টাব্দে তাঁহার মৃত্যু হইলে নৈহাটির নিকট ঘোষপাড়া নিবাসী সদ্গোপ জাতীয় রামশরণ পাল ইহার কর্ত্তা হন। তিনি জাতিভেদ মানিতেন না এবং হিন্দু মুসলমান উভয়ই তাঁহার শিষ্য ছিল। এই সম্প্রদায়ের লোক কর্ত্তা বা গুরুকে সাক্ষাৎ ভগবান বা কৃষ্ণ বলিয়া মনে করিত এবং তাহাকেই ইষ্টদেবতা জ্ঞানে পূজা করিত। ক্রমে এই সম্প্রদায়ের খুব সমৃদ্ধি হয় ও ভক্তের সংখ্যা অসম্ভব বৃদ্ধি হয়। এই দলের মধ্যে নিম্নজাতীয় স্ত্রীলোকের সংখ্যাই ছিল খুব বেশি এবং গোপীরা কৃষ্ণকে যেমনভাবে কায়মনপ্রাণে ভজন, করিত ইহারাও সেইরূপ করিত। ঘোষপাড়ার মেলায় লক্ষাধিক লোকের সমাগম হইত, ইহার মধ্যে স্ত্রীলোকের সংখ্যাই ছিল অত্যন্ত অধিক। উনবিংশ শতাব্দীতেও রামশরণ পালের পুত্র রামদুলাল পালের অধ্যক্ষতায় এই সম্প্রদায় খুব প্রভাবশালী ছিল কিন্তু ঐ যুগের নীতির আদর্শ অনুসারে ইহাদের নীতি ও আচরণ খুব নিন্দনীয় বলিয়া পরিগণিত হইল। ইহার ফলে এই সম্প্রদায়ের প্রতিপত্তি নষ্ট হয়।
‘স্পষ্টদায়ক’ সম্প্রদায় ছিল কর্ত্তাভজার ঠিক বিপরীত। এই সম্প্রদায়ের লোকেরা গুরুকে ভগবানের অবতার মনে করিত না এবং তাঁহার কর্তৃত্বও খুব সীমাবদ্ধ ছিল। মুর্শিদাবাদ জিলার অন্তর্গত সৈদাবাদনিবাসী কৃষ্ণচন্দ্র চক্রবর্তীর শিষ্য রূপরাম কবিরাজ ইহার প্রতিষ্ঠা করেন। কর্ত্তাভজা দলের ন্যায় ইহারও বহু সংখ্যক গৃহস্থ শিষ্য ছিল। কিন্তু কর্তৃত্ব ছিল একদল সন্ন্যাসী ও সন্ন্যাসিনীর হাতে। ইহারা একসঙ্গে এক মঠে ভ্রাতা ভগিনীর ন্যায় বাস করিত। ইহারা কৃষ্ণ ও চৈতন্যের স্তুতিমূলক গান গাহিয়া নৃত্য করিত। সন্ন্যাসীরা ভদ্রঘরের মেয়েদের আধ্যাত্মিক উপদেশ দিত। এই সকল মেয়েরাও মঠে আসিত। কলিকাতাই ইহাদের প্রধান কেন্দ্র ছিল।
সখীভাবক সম্প্রদায়ের পুরুষ ভক্তেরা স্ত্রীলোকের পোষাক পরিত, স্ত্রীলোকের নাম ধারণ করিত, এবং স্ত্রীলোকের ন্যায় কৃষ্ণ ও চৈতন্যের নামে নৃত্য গীত করিত। নিম্নশ্রেণীর লোকেরা ইহাদের শিষ্যত্ব গ্রহণ করিত। মালদহ জিলার জঙ্গলিটোলা ইহাদের প্রধান কেন্দ্র ছিল। জয়পুর ও কাশীতেও এই সম্প্রদায়ের কিছু প্রতিপত্তি ছিল।
বর্তমান যুগের দৃষ্টিতে এই সকল সম্প্রদায়ের অনেক প্রথা ও ব্যবস্থা আপত্তিজনক ও অশ্লীল বলিয়া মনে হইলেও ইহাদের কয়েকটি বৈশিষ্ট্য বিশেষ লক্ষণীয়। মধ্যযুগে বীর, নানক প্রভৃতি সাধুসন্তেরা যেমন প্রাচীন হিন্দু শাস্ত্রের বিধি ও হিন্দুর প্রচলিত ধর্ম্মানুষ্ঠান ও সামাজিক বিধান সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করিয়া এক উদার বিশ্বজনীন ধর্ম্মের প্রতিষ্ঠা করিয়াছিলেন এবং ইহার মূল ভিত্তি ছিল কেবলমাত্র ভগবান ও ভক্তের মধ্যে ঐকান্তিক প্রেম ও ভক্তি, বাংলার সহজিয়াদের মধ্যেও সেই ভাবের বিকাশ দেখিতে পাওয়া যায়। কিন্তু ইহার উৎস ছিল বাংলার বৌদ্ধ সহজিয়া মতের গ্রন্থ। এই সমুদয় গ্রন্থ মধ্যযুগে বা ইহার অনতিপূর্বে রচিত হইয়াছিল এবং এই প্রাচীন সহজিয়া সাধনার ধারাই যে বৈষ্ণব সহজিয়াদের মধ্যে প্রবাহিত হইয়াছিল তাহাতে সন্দেহ করিবার কোন কারণ নাই। সুতরাং বাংলার এই সাধনা যে মধ্যযুগে ভারতের অন্যান্য স্থানের অনুরূপ সাধনার পূর্ববর্তী এবং কবীর, নানক প্রভৃতির দৃষ্টান্ত বা ইসলামীয় সুফী প্রভাবের ফল নহে তাহা সহজেই অনুমান করা যায়। ইহার প্রমাণস্বরূপ সরোরুহপাদের (অর্থাৎ সরহপাদের ‘দোহাকোষ’ নামক গ্রন্থের সারমর্ম বর্ণনা করিতেছি।
“ধর্ম্মের সূক্ষ্ম উপদেশ গুরুর মুখ হইতে শুনিতে হইবে, শাস্ত্র পড়িয়া কিছু জ্ঞান লাভ হইবে না। গুরু যাহা বলিবেন, নির্বিচারে তাহা পালন করিবে।”
ষড়দর্শন খণ্ডন করিয়া সরোরুহ জাতিভেদের তীব্র ও বিস্তৃত প্রতিবাদ করিয়াছেন। তিনি বলেন, “ব্রাহ্মণ ব্রহ্মার মুখ হইতে হইয়াছিল; যখন হইয়াছিল, তখন হইয়াছিল, এখন ত অনন্যও যেরূপে হয়, ব্রাহ্মণও সেরূপে হয়, তবে আর ব্রাহ্মণত্ব রহিল কি করিয়া? যদি বল, সংস্কারে ব্রাহ্মণ হয়, চণ্ডালকে সংস্কার দেও, সে ব্রাহ্মণ হোক; যদি বল বেদ পড়িলে ব্রাহ্মণ হয়, তারাও পড়ক”। “হোম করিলে মুক্তি যত হোক না থোক, ধোঁয়ায় চক্ষের পীড়া হয় এই মাত্র।”
