তান্ত্রিক সাধন প্রণালী বহু প্রাচীন এবং একটি স্বতন্ত্র ধর্মসাধনার ধারা। পরবর্তীকালে বৌদ্ধ, শৈব, বৈষ্ণব প্রভৃতি সকল ধর্মসম্প্রদায়ের মধ্যেই ইহার প্রভাবযুক্ত এক বা একাধিক ছোটখাট দল গড়িয়া উঠিয়াছে। সুতরাং সাধারণত তান্ত্রিক সম্প্রদায় শাক্ত বলিয়া গণ্য হইলেও তান্ত্রিক, শৈব, বৈষ্ণব, বৌদ্ধ সম্প্রদায়ও আছে। তন্ত্রশাস্ত্রের কথা পূর্বে উল্লিখিত হইয়াছে। এই শাস্ত্রে তান্ত্রিকদিগকে বেদাচারী, বৈষ্ণবাচারী, শৈবাচারী, দক্ষিণাচারী, বামাচারী, সিদ্ধান্ত চারী এবং কৌলাচারী প্রভৃতি ক্রমোচ্চ নানা পর্যায়ে বিভক্ত করা হইয়াছে। সুতরাং ইহাদের মধ্যে কৌলাচারীই সর্বশ্রেষ্ঠ। কেহ এই সম্প্রদায়ে প্রবেশ করিতে ইচ্ছুক হইলে তাহাকে ঐ সম্প্রদায়ভুক্ত একজনের নিকট দীক্ষা নিতে হয় এবং দিবাভাগে নানাবিধ অনুষ্ঠানের পর ঘোষণা করিতে হয় যে সে পূর্বেকার ধর্মসংস্কার সমস্ত পরিত্যাগ করিল এবং ইহার প্রমাণস্বরূপ তাঁহার বৃদ্ধিশ্রাদ্ধ ক্রিয়া সম্পন্ন হয়। রাত্রিকালে গুরু ও শিষ্য আটজন বামাচারী তান্ত্রিক পুরুষ এবং আটটি স্ত্রীলোক (নর্তকী ও তাঁতির কন্যা, গণিকা, ধোপানী, নাপিতের স্ত্রী বা কন্যা, ব্রাহ্মণী, একজন ভূস্বামীর কন্যা ও গোয়ালিনী)সহ একটি অন্ধকার কক্ষে প্রবেশ করে এবং প্রতি পুরুষের পাশে একটি স্ত্রীলোক বসে। গুরু তখন শিষ্যকে নিম্নলিখিতরূপ উপদেশ দেন। আজি হইতে লজ্জা-ঘৃণা, শুচি-অশুচি জ্ঞান জাতিভেদ প্রভৃতি সমস্ত ত্যাগ করিবে। মদ্য, মাংস, স্ত্রীসম্ভোগ প্রভৃতি দ্বারা ইন্দ্রিয়বৃত্তি চরিতার্থ করিবে কিন্তু সর্বদা ইষ্টদেবতা শিবকে স্মরণ করিবে এবং মদ্য মাংস প্রভৃতি ব্রহ্মপদে লীন হইবার উপাদান স্বরূপ মনে করিবে। ইহার পর নানা প্রক্রিয়া ও মন্ত্র সহকারে সকলেই মদ্য পান ও মাংস ভক্ষণ করে–গোমাংসও বাদ যায় না। মদ্য পান। করিতে করিতে চেলা সম্পূর্ণ বেহুঁস হইয়া পড়ে তখন সে অবধূত সংজ্ঞা পায় এবং তাঁহার নূতন নামকরণ হয়। তারপর গুরু ও অন্যান্য সকলে চলিয়া যায় কেবলমাত্র চেলা ও একটি স্ত্রীলোক থাকে। তান্ত্রিকরা অনেক বীভৎস আচরণ করে, যেমন মানুষের মৃতদেহের উপর বসিয়া মড়ার মাথার খুলিতে উলঙ্গ স্ত্রী-পুরুষের একত্র সুরাপান ইত্যাদি।
তান্ত্রিকেরা তাহাদের এই সমুদয় আচারের সমর্থনকল্পে যে দার্শনিক তথ্যের অবতারণা করে তাঁহার মর্ম এই : কাম, ক্রোধ ইত্যাদি ব্যসন মানুষকে পাপের পথে চালিত করে। এই সমুদয় দূর না করিতে পারিলে মোক্ষ লাভ হয় না। শাস্ত্রকারেরা এই জন্য কঠোর তপস্যা ও ইন্দ্রিয় সংযমের বিধান দিয়াছেন। কিন্তু ইহা খুবই কষ্টকর–প্রায় অসাধ্য বলিলেই হয়। তান্ত্রিক বামাচারীরা এইজন্য প্রলোভন পরিহার ও ইন্দ্রিয় নিরোধের পরিবর্তে অপরিমিত ও যথেচ্ছ ইন্দ্রিয় বৃত্তির চরিতার্থ দ্বারা মানুষের মনকে ইহা হইতে বিমুখ করেন। অর্থাৎ পুনঃ পুনঃ অভ্যাসের ফলে এই সমুদয়ের প্রতি আর কোন আকর্ষণ থাকে না এবং এইভাবে ইন্দ্রিয় বৃত্তির নিরোধ হয়। বামাচারীরা বলে যে সাধারণ সন্ন্যাসীরা কঠোরতা অবলম্বন করিয়া অর্থাৎ সংসার হইতে দূরে থাকিলেই নিরাপদ থাকেন। কিন্তু বামাচারীরা প্রলোভন সম্মুখে থাকিলেও ইন্দ্রিয় বৃত্তি নিরোধ করিতে সমর্থন হন।
বৈষ্ণব সহজিয়ারা এই তান্ত্রিক দর্শনের ভিত্তিতেই পরকীয়া প্রেমের প্রতিষ্ঠা করে। প্রেমের দ্বারা ভগবানকে লাভ করাই তাহাদের চরম লক্ষ্য। সুতরাং প্রথমে নর-নারীর প্রেমের মধ্য দিয়াই এই প্রেমের স্বরূপ উপলব্ধি করিতে হইবে। নিজের স্ত্রী অপেক্ষা অন্য নারীর প্রতি আসক্তিই বেশি প্রবল হয় সুতরাং ইহাই এই প্রেমের প্রথম সোপান এবং প্রথমে স্থূল দেহজাত ও নিকৃষ্ট প্রবৃত্তি হইলেও ক্রমে ইহা ভগবানের প্রতি প্রেমে পরিণত হয়। কেহ কেহ আবার ইহার সঙ্গে আর একটু যোগ করে। মানুষের মন কাম প্রবৃত্তিতে চঞ্চল হয়। তাহা চরিতার্থ হইলেই মন শান্তভাব অবলম্বন করে এবং তাহাকে ভগবানের ধ্যানে সমাহিত করা যায়। কেহ কেহ মানবদেহের শিরা উপশিরার উপর ইহার প্রভাব অর্থাৎ কুণ্ডলিনী শক্তির জাগরণ প্রভৃতি নানা ব্যাখ্যা করেন।
সহজিয়ারা অনেক শাখায় বিভক্ত–যেমন আউল, বাউল, শাই, দরবেশ, নেড়া, সহজিয়া প্রভৃতি। ইহা ছাড়া কর্ত্তাভজা, স্পষ্টদায়ক, সখীভাবক, কিশোরী ভজনী, রামবল্লভি, জগনন্মাহিনী, গৌড়বাদী, সাহেবধানী, পাগলনাথি, গোবরাই প্রভৃতি সম্প্রদায়ও অনেক সহজিয়া শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত করেন। এই সমুদয় বিভিন্ন শাখায় সহজিয়াদের ধর্মমত সামাজিক প্রথা ও সাধন প্রণালীর মধ্যে যথেষ্ট প্রভেদ থাকিলেও গুরুবাদ, স্ত্রী পুরুষের অবাধ মিলন ও পরকীয়া প্রেমের মাহাত্ম সকলেই স্বীকার করে। ইহাদের উৎসবে স্ত্রীলোকের সম্পূর্ণ স্বাধীনতা থাকায় বহু স্ত্রীলোক ইহাতে যোগ দেয়। ঘোষপাড়া, রামকেলি, নদীয়া, শান্তিপুর, খড়দহ, কেন্দুলি, এবং বীরভূম, বাঁকুড়া ও মেদিনীপুর জিলায় সহজিয়াদের বহু কেন্দ্র আছে। সহজিয়াদের শাস্ত্র সবই প্রায় হাতে লেখা পুঁথিতে পাওয়া যায়–কিন্তু ইহার ভাষা সান্ধ্যভাষা-সাংকেতিক ও দুর্বোধ্য। অষ্টাদশ শতাব্দীর প্রথমভাগে সহজ বাংলা ভাষায় লিখিত কয়েকখানি পুঁথি আছে। এই সকল শাস্ত্রে পরকীয়া প্রেমের সমর্থনে কেবল তন্ত্রশাস্ত্র নহে, অথর্ব-সংহিতা, ছান্দোগ্যোপনিষৎ ও বৌদ্ধ কথাবতুর উল্লেখ করা হইয়াছে। অথর্বের উক্তি এস্থলে প্রযোজ্য নহে–কারণ ইহাতে স্ত্রীলোকের সহিত একাধিক ভূতপূর্ব স্বামীর মিলনের কথা আছে। ইহাতে স্ত্রীলোকের বহু বিবাহ প্রমাণিত হয় কিন্তু পরকীয়া প্রেম সমর্থিত হয় না। ছান্দোগ্যোপনিষদে দ্বিতীয় প্রপাঠকে ত্রয়োদশ খণ্ডের ‘ন কাঞ্চন পরিহরেৎ’ এই বচনে পরস্ত্রী সংগমের অনুমোদন আছে। শঙ্করাচার্যের ভাষ্যে ইহা বিশদরূপে ব্যাখ্যাত হইয়াছে। তবে তিনি লিখিয়াছেন “পরস্ত্রীগমনের নিষেধ বিধায়িকা স্মৃতি এই বামদেব্য সামোপনসা ভিন্ন অন্য স্থানেই বুঝিতে হইবে।” কিন্তু ইহা খুব প্রবল যুক্তি নহে–কারণ একখানি শ্রেষ্ঠ প্রামাণিক উপনিষদ যদি কোন উপাসনায় পরস্ত্রীগমন অনুমোদন করে তবে তান্ত্রিক ও সহজিয়ারা সেই দৃষ্টান্ত দ্বারা নিজেদের সমর্থন করিতে পারে।
