কিন্তু এই সমুদয়ের মধ্য দিয়া যে ধর্ম ও সমাজ সংস্কারের একটি মহৎ সম্ভাবনা দেখা দিয়াছিল এক শতাব্দীর বেশি তাহা স্থায়ী হয় নাই। বরং নূতন ভাবে নানাবিধ কলুষতার আবির্ভাব হইল।
বৌদ্ধ সহজিয়া ও তান্ত্রিকদল পূর্বেই এদেশে ছিল। বৈষ্ণব ধর্ম্মের প্রচারে এগুলির প্রভাব অনেকটা কমিয়াছিল কিন্তু শীঘ্রই বৈষ্ণব সহজিয়ারা তাহাদের সহিত যোগ দিয়া দল বৃদ্ধি করিল। ইহারা প্রচলিত ধর্মমত এবং সামাজিক রীতিনীতি ও অনুষ্ঠানের ধার ধারিত না। বিভিন্ন পথে মুক্তিলাভের সন্ধান করিত। ইহাদের ধর্ম্মাচরণের একটি বিশিষ্ট অঙ্গ ছিল পরকীয়া প্রেম অর্থাৎ বর্তমান যুগের ভাষায় পরস্ত্রীর সহিত অবৈধ প্রণয় ও ব্যভিচার। বর্তমান কালের রুচির অমর্যাদা
করিয়া ইহার বিস্তৃত বর্ণনা করা অসম্ভব। আশ্চর্যের বিষয় এই যে এই পরকীয়া প্রেম যে স্বকীয়া প্রেম অর্থাৎ পরিণীতা স্ত্রীর সহিত বৈধ প্রেম অপেক্ষা আধ্যাত্মিক হিসাবে অনেক শ্রেষ্ঠ–ইহা বাংলায় বৈষ্ণব সমাজেও গৃহীত হইয়াছিল। ১৭৩১ খ্রীষ্টাব্দে জয়পুরের মহারাজা এই মত খণ্ডন করিবার জন্য কয়েকজন বৈষ্ণব পণ্ডিত পাঠাইয়াছিলেন। তাঁহারা নানা দেশে স্বকীয়া প্রেমের শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিপন্ন করিয়া অবশেষে বাংলা দেশে আসিলেন। ছয়মাস বিতর্কের পরে গৌড়ীয় বৈষ্ণবগণ তাঁহাদিগকে পরাজিত করিয়া পরকীয়া প্রেমের শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠিত করিলেন। ইহার ফলে উনবিংশ শতাব্দী পর্যন্ত কর্ত্তাভজা প্রভৃতি বহু সহজিয়া সম্প্রদায় এবং কিশোরী ভজন প্রভৃতি এমন নানাপ্রকার অনুষ্ঠান বাংলায় প্রচলিত ছিল, সুরুচি লঙ্ঘন না করিয়া তাঁহার বর্ণনা করা অসম্ভব।
শ্রীচৈতন্যদেব যে বিশুদ্ধ সাত্ত্বিক প্রেম ও ভক্তিবাদের উপর বৈষ্ণবধর্ম প্রতিষ্ঠিত করিয়াছিলেন কালক্রমে তাঁহার এই পরিণতি হইয়াছিল। তবে ইহা কেবল সহজিয়া ও বৈষ্ণব ধর্ম্মে সীমাবদ্ধ ছিল না। তান্ত্রিক ধর্ম্মেও বীভৎসতা চরমে উঠিয়াছিল। আনুষ্ঠানিক ব্রাহ্মণ্য ধর্ম্মেও ইহার প্রভাব দেখা যায়। বৃহদ্ধর্ম্মপুরাণে উক্ত হইয়াছে যে মানবদেহের অঙ্গসূচক অশ্লীল কথা দুর্গা পূজায় উচ্চারণ করিবে, কারণ দুর্গা ইহা উপভোগ করেন। কালবিবেকে নির্দেশ আছে যে কাম-মহোৎসবে অশ্লীল বাক্য উচ্চারণ করিবে। দুর্গাপূজার বর্ণনা প্রসঙ্গে নরনারীর যে সব ক্রীড়া ও বাক্য কালবিবেকে লিখিত আছে তাহা বর্তমান যুগে ভদ্র সমাজে উচ্চারণ করা যায় না, কিন্তু ইহা না করিলে বা না বলিলে নাকি ভগবতী ক্রুদ্ধা হইবেন। রাধাকৃষ্ণের লীলা বর্ণনায় গীতগোবিন্দ, কৃষ্ণকীর্তন প্রভৃতি গ্রন্থে যে নরনারীর দেহ সম্ভোগের নগ্নচিত্র প্রকটিত হইয়াছে তাহা পূর্বেই বলা হইয়াছে। পরবর্তী অনেক পদাবলীতেও ইহার অনুকরণ দেখিতে পাওয়া যায়। মোটের উপর একথা নিঃসন্দেহে বলা যাইতে পারে যে সাহিত্যে ও সমাজে যে শ্রেণীর অশ্লীলতা আজকাল ভব্য সমাজে নিন্দনীয় এবং আইনে দণ্ডনীয়–মধ্যযুগে ধর্ম্মের সূক্ষ্ম আবরণে তাহা ভদ্র ও শিক্ষিত সমাজে দোষাবহ বলিয়া মনে হইত না।
কিন্তু কেবল এই এক বিষয়েই চৈতন্যদেবের চেষ্টা ব্যর্থ হয় নাই। জাতিভেদের কঠোরতা দূর করিয়া নিম্নশ্রেণীর উন্নয়নের যে চেষ্টা তিনি করিয়াছিলেন এক শতাব্দীর বেশি তাহা স্থায়ী হয় নাই। ছয় গোস্বামীর অন্যতম গোপাল ভট্টের মতে কেবল ব্রাহ্মণেরাই ব্রাহ্মণ জাতিকে দীক্ষা দিতে পারেন। নীচ জাতীয় লোক উচ্চ জাতিকে দীক্ষা দিতে পারেন না। মধ্যযুগে বাংলার বাহিরে রামানন্দ, কবীর, নানক প্রভৃতি যে প্রচলিত ধর্মবিশ্বাস ও সংস্কারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করিয়া হিন্দু মুসলমান নির্বিশেষে অসাম্প্রদায়িকভারে কেবলমাত্র এক ভগবানে বিশ্বাস ও ভক্তির উপর প্রতিষ্ঠিত সার্বজনীন ধর্ম্মের প্রচার করিতেছিলেন বাংলা দেশে ইঁহাদের পূর্বেই চর্যাপদে তাঁহার সুষ্ঠু ইঙ্গিত দেখিতে পাওয়া যায়। চৈতন্যদেবও এই প্রকার সার্বজনীন ধর্মই প্রচার করিয়াছিলেন-তবে তিনি কবীর ও নানকের মত প্রাচীন ধর্ম ও আচারের সহিত যোগসূত্র একেবারে ছিন্ন করেন নাই। কিন্তু চৈতন্যের পরবর্তীকালে এবং কতকটা পূর্বেও বৌদ্ধ ও বৈষ্ণব সহজিয়া এবং তান্ত্রিক মতের প্রভাবে এমন কতকগুলি সম্প্রদায় গড়িয়া উঠিল বা প্রভাবশালী হইল যাহার উপাসকেরা শাস্ত্রোক্ত ধর্মমত ওআচার-অনুষ্ঠান বর্জনপূর্বক কেবলমাত্র গুরুর নির্দেশে অথবা স্বীয় অন্তরের অনুভূতিজাত প্রেম, বৈরাগ্য, ভক্তি প্রভৃতি দ্বারা আধ্যাত্মিক প্রগতির পথ নির্ণয় করিত। শুরুর প্রতি অবিচলিত নিষ্ঠা ও ভক্তি এবং নির্বিচারে তাঁহার আদেশ পালন এই সকল সম্প্রদায়ের অনেকেরই বিশিষ্ট লক্ষণ ছিল।
বর্তমান যুগের আদর্শ ও সংজ্ঞা অনুসারে এই সকল সম্প্রদায়ের মধ্যে যে অশ্লীলতা, দুর্নীতি ও ব্যভিচার ছিল এবং স্ত্রী-পুরুষের অবাধ মিলনে তাহা অনেক সময় উৎকটরূপে দেখা দিত সে সম্বন্ধে কোন সন্দেহ নাই। ইহাদের মতামত ও সাধন প্রণালী অনেকটা গুহ্য রহস্যে আবৃত থাকিলেও ইহাদের বাহ্যিক ও আচার ব্যবহার সম্বন্ধে যেটুকু বিবরণ পাওয়া যায় তাহা হইতেই ইহা প্রতীয়মান হইবে। কিন্তু তথাপি মধ্যযুগের বাংলার সংস্কৃতিতে ইহাদের যে একটা বিশিষ্ট স্থান আছে এবং অনেকগুলির একটা ভাল দিকও আছে তাহা অস্বীকার করিবার উপায় নাই। এজন্য ইহাদের কয়েকটি সংক্ষিপ্ত বিবরণ দিতেছি।
