প্রভু কহে–এক দান মাগি হে তোমায়।
সংকীর্তন বাদ যৈছে না হয় নদীয়ায় ॥
কৃষ্ণদাস কবিরাজ কাজীর ঘটনা সংক্ষেপে বলিয়া তারপর লিখিয়াছেন :
বৃন্দাবন দাস ইহা চৈতন্য মঙ্গলে।
বিস্তারি বলিয়াছেন প্রভু কৃপাবলে ॥ [চৈতন্য চরিতামৃত, আদি, ১৭ অধ্যায়]
অথচ তাঁহার মতে চৈতন্য কাজীর ঘর ও বাগান ধ্বংস করার আদেশ দেন নাই। কিন্তু চৈতন্য ভাগবতে স্পষ্ট আছে :–
ক্রোধে বলে প্রভু ‘আরে কাজী বেটা কোথা।
ঝাট আন ধরিয়া কাটিয়া ফেলোঁ মাথা ॥
প্রাণ লা কোথা কাজী গেল দিয়া দ্বার।
ঘর ভাঙ্গ ভাঙ্গ’ প্রভু বলে বার বার ॥
এই কথা শুনিয়া
ভাঙ্গিলেক যত সব বাহিরের ঘর।
প্রভু বলে অগ্নি দেহ বাড়ির ভিতর ॥
পুড়িয়া মরুক সব গণের সহিতে।
সর্ব বাড়ী বেঢ়ি অগ্নি দেহ চারি ভিতে ॥
চৈতন্যের সহিত কাজীর সাক্ষাৎ বা তাঁহার কাছে কীর্তনের অনুমতি ভিক্ষা, স্বপ্ন দর্শনে কাজীর ভয় ও তজ্জন্য কীর্তনের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, কাজীর বৈষ্ণবধর্ম্মে ভক্তি প্রভৃতি কৃষ্ণদাসের অস্বাভাবিক ও অসঙ্গতিপূর্ণ কাহিনীর কিছুই চৈতন্যভাগবতে নাই। সমসাময়িক বৃন্দাবনদাস ও প্রায় শতবর্ষ পরে বৃন্দাবনের গোঁসাই শ্রীকৃষ্ণদাস কবিরাজ রচিত চৈতন্যের জীবনীতে যে সম্পূর্ণ পরস্পর বিরুদ্ধ দুইটি চিত্র অঙ্কিত হইয়াছে তাহা হইতে বোঝা যায় শ্রীচৈতন্য সম্বন্ধে বাঙালীর ধারণা কিরূপ পরিবর্তিত হইয়াছিল। প্রথমটিতে পাই চৈতন্য যাহা ছিলেন, দ্বিতীয়টিতে পাই চৈতন্য যাহা হইয়াছেন। গত তিন শতাধিক বৎসর বাংলার বৈষ্ণবগণ চৈতন্যের কেবল একটি মূর্ত্তিই ধ্যান ও ধারণা করিয়াছেন–কৃষ্ণ নাম জপিতে জপিতে ভাবাবেশে সংজ্ঞাহীন ভূলুণ্ঠিত ধূলিধূসরিত দেহ। কিন্তু তাঁহার যে দৃঢ় বলিষ্ঠ পূত চরিত্র ভক্তের সামান্য নীতিভ্রষ্টতাও ক্ষমা করে নাই এবং যিনি দুরাচারী যবনকে শাস্তি দিবার জন্য সদলবলে অগ্রসর হইয়া বলিয়াছিলেন “নির্যবন করো আজি সকল ভুবন”–বাঙালী তাহা মনে রাখে নাই। বাংলার পরাক্রান্ত সুলতান হোসেন শাহের রাজ্যে মুসলমান অত্যাচারের বিরুদ্ধে মাথা তুলিয়া দাঁড়াইয়া তিনি যে সাহস ও ধর্মনিষ্ঠার পরিচয় দিয়াছিলেন বাঙালী তাহা অচিরেই ভুলিয়া গিয়াছিল।
বস্তুত চৈতন্যের আদর্শ ও প্রভাব কোন দিক দিয়াই বেশি দিন স্থায়ী হয় নাই। তিনি সংকল্প করিয়াছিলেন যে, স্ত্রী, শূদ্র, মূর্খ আদি আচণ্ডালে প্রেম ভক্তি দান করিয়া তাহাদের জীবন উন্নত করিবেন। এই উদ্দেশ্যে তিনি অবধূত নিত্যানন্দকে পুরী হইতে বঙ্গদেশে পাঠাইলেন। বলিলেন “তুমি যদি সন্ন্যাসীর জীবন যাপন কর, তবে মূর্খ, নীচ, দরিদ্র, পতিতকে আর কে উদ্ধার করিবে।” ইহার ফলে জাতিভেদের কঠোর নিগড় ভাঙ্গিয়া গেল এবং হিন্দু সমাজের নিম্নস্তরের যে সমুদয় শ্ৰেণী এতদিন উপেক্ষিত ও লাঞ্ছিত জীবনযাপন করিতেছিল তাহাদের এক বড় অংশ বৈষ্ণবধর্ম্মে দীক্ষিত হইল। পূর্বে বলা হইয়াছে যে নিম্নশ্রেণীর হিন্দুরা দলে দলে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করিতেছিল। নিত্যানন্দ এবং তাঁহার সহচর ও অনুবর্তীদের প্রচারের ফলে তাহা সম্ভবত অন্তত আংশিক পরিমাণে রহিত হইয়াছিল।
চৈতন্য যে আনুষ্ঠানিক বিধি বিধান বাদ দিয়া স্ত্রী পুরুষ ও উচ্চ নীচ জাতি নির্বিশেষে সকলকে কেবল প্রেমভক্তিমূলক ধর্ম্মে দীক্ষা দিবার প্রথা প্রচলিত করিয়াছিলেন তাহাতে তৎকালীন হিন্দু সমাজে এক বিপ্লবের সূচনা দেখা দিল। বহু শূদ্র এবং খুব অল্প সংখ্যক হইলেও মুসলমানরাও বৈষ্ণব ধর্ম গ্রহণ করিল। জাতিভেদের ব্যবধান শিথিল হইল। হরিদাস ঠাকুরের যবন সংসর্গ থাকা সত্ত্বেও অদ্বৈত আচার্য তাহাকে শ্রাদ্ধের অগ্রভাগ প্রদান করিয়াছিলেন। ব্রাহ্মণ, বৈদ্য, কায়স্থ ও অন্যান্য জাতির সঙ্গেও কীর্তনে যবনেহ নাচে গায় লয় হরিনাম’। ব্রাহ্মণের জাতির সাধকেরা নিঃসঙ্কোচে ব্রাহ্মণকে মন্ত্র দিতে আরম্ভ করিল। রঘুনাথ দাস কায়স্থ হইয়া গৌড়ীয় বৈষ্ণব ধর্ম্মের নিয়ামক ছয় গোস্বামীর মধ্যে স্থান পাইলেন। কালিদাস নামে রঘুনাথ দাসের জ্ঞাতি খুড়া শূদ্র ও অন্যান্য নীচ জাতীয় বৈষ্ণবের উচ্ছিষ্ট ভক্ষণ করিলেন। অসংখ্য ব্রাহ্মণ কায়স্থ নরোত্তম ঠাকুরের শিষ্য হইলেন। শ্রীখণ্ডের নরহরি সরকারের বংশে এই প্রথা এখনও প্রচলিত অর্থাৎ ব্রাহ্মণেরা তাঁহার বংশধরদের নিকট দীক্ষা লইয়া থাকে।
স্ত্রীলোকের অবস্থারও উন্নতি দেখা দিল। বলরাম দাসের পদে আছে, “সংকীর্তন মাঝে নাচে কুলের বৌহারি” অর্থাৎ কুলবধূরাও প্রকাশ্যে সংকীর্তনে যোগ দিতেন। শিবানন্দ সেনের স্ত্রী ও পরমেশ্বর মোদকের মাতার দৃষ্টান্ত হইতে মনে হয় বহু নারী প্রতি বৎসর রথযাত্রার সময় শ্রীচৈতন্যকে দর্শন করিতে পুরী যাইতেন। নিত্যানন্দের পত্নী জাহ্নবী দেবী খেতুড়ি মহোৎসবের সময় গৌড়ীয় বৈষ্ণব সম্প্রদায়ের নেতৃত্ব গ্রহণ করিয়াছিলেন। তিনি বহু শিষ্যকে মন্ত্রদানও করিয়াছিলেন। অদ্বৈত-পত্নী সীতা দেবী পুরুষের প্রকৃতি ও বেশ ধারণ করিয়া যে সাধনার রীতি প্রবর্তিত করেন তাহা তাঁহার শিষ্যা নন্দিনী ও জঙ্গলীর বিবরণ হইতে জানা যায়। শ্রীনিবাস আচার্যের কন্যা হেমলতা ঠাকুরাণীও বহু শিষ্যকে মন্ত্র দিয়াছিলেন। [ড. বিমানবিহারী মজুমদার-পদাবলী সাহিত্য পৃ. ৩১৫-১৬]
