এই কলুষতার মূর্ত প্রতিবাদ ছিলেন শ্রীচৈতন্য। চৈতন্যের বলিষ্ঠ পৌরুষ বিশুদ্ধ সাত্ত্বিক ভাব ও অনন্যসাধারণ ব্যক্তিত্ব, রাধাকৃষ্ণের প্রেমমূলক বৈষ্ণবধর্মকে এক অতি উচ্চ স্তরে তুলিল। পবিত্র ভক্তির প্রকাশ্য অনুভূতি, প্রাণোন্মাদকারী কীর্তন এবং রাধাকৃষ্ণের প্রেমের যে দিব্য আদর্শ তিনি নিজের জীবনে রূপায়িত করিয়াছিলেন, তাঁহার প্রবাহ সমস্ত কলুষতা ধুইয়া ফেলিল। বৈষ্ণবধর্ম্মে তখন নূতন প্রাণপ্রতিষ্ঠা হইল। এই প্রসঙ্গে চৈতন্যদেবের প্রবর্তিত একটি নিযম বিশেষভাবে স্মরণীয়। তাঁহার আজ্ঞায় বৈষ্ণব ভক্তগণের নারীর সহিত কথাবার্তা নিষিদ্ধ হইল। তাঁহার প্রিয় শিষ্য হরিদাস তাঁহারই ভোজনের জন্য একজন বর্ষীয়সী ভক্তিমতী মহিলার নিকট হইতে উৎকৃষ্ণ চাউল চাহিয়া আনিয়াছিলেন। এই নিয়মভঙ্গের অপরাধে তিনি হরিদাসকে ত্যাগ করিলেন।
হরিদাস কৈল প্রকৃতি সম্ভাষণ।
* * *
হেরিতে না পারি মুই তাঁহার বদন ॥
অন্যান্য ভক্তগণের অনুরোধ উপরোধেও তিনি বিন্দুমাত্র টলিলেন না। বলিলেন, “মানুষের ইন্দ্রিয় দুর্বার, কাষ্ঠের নারীমূর্ত্তি দেখিলেও মুনির মন চঞ্চল হয়। অসংযত চিত্ত জীব মর্কট-বৈরাগ্য করিয়া স্ত্রী-সম্ভাষণের ফলে ইন্দ্রিয় চরিতার্থ করিয়া বেড়াইতেছে।” মনের দুঃখে হরিদাস প্রয়াগে ত্রিবেণীতে ডুবিয়া আত্মহত্যা করিল।
এই নৈতিক উন্নতির ফলে এবং চৈতন্যের আদর্শ ও দৃষ্টান্ত বাঙালী হিন্দু যেন এক নবীন জীবন লাভ করিল। পবিত্র প্রেমের সাধক যে চৈতন্য কৃষ্ণ নাম করিয়া ধুলায় গড়াগড়ি দিতেন তিনি বাঙালীর সম্মুখে যে পৌরুষের আদর্শ তুলিয়া ধরিলেন মধ্যযুগে তাঁহার তুলনা মিলে না। নবদ্বীপের মুসলমান কাজীর হুকুমে যখন চৈতন্যের প্রবর্তিত কীর্তন গান নিষিদ্ধ হইল এবং কীর্তনীয়াদের উপর বিষম অত্যাচার আরম্ভ হইল, তখন অনেক বৈষ্ণব ভয় পাইয়া নবদ্বীপ ছাড়িয়া অন্যত্র যাইবার প্রস্তাব করিলেন। অবৈষ্ণব নবদ্বীপবাসী কেহ কেহ খুসি হইয়া বলিলেন “এইবার নিমাই পণ্ডিতের দর্প চূর্ণ হইবে–বেদের আজ্ঞা লঙ্ঘন করিলে এইরূপই শাস্তি হয়।” কিন্তু চৈতন্য দৃঢ়স্বরে ঘোষণা করিলেন, কাজীর আদেশ অমান্য করিয়া এই নবদ্বীপে থাকিয়াই কীর্তন করিব।
ভাঙ্গিব কাজীর ঘর কাজীর দুয়ারে।
কীর্তন করিব দেখি কোন্ কর্ম করে ॥
তিলার্ধেকো ভয় কেহ না করিও মনে।
তিন শত বৎসরের মধ্যে বাঙালী ধর্মরক্ষার্থে মুসলমানের অত্যাচারের বিরুদ্ধে মাথা তুলিয়া দাঁড়ায় নাই–মন্দির ও দেবমূর্ত্তি ধ্বংসের অসংখ্য লাঞ্ছনা ও অকথ্য অপমান নীরবে সহ্য করিয়াছে। চৈতন্যের নেতৃত্বে অসম্ভব সম্ভব হইল। চৈতন্য কীর্তনীয়ার দল লইয়া কাজীর বাড়ির দিকে অগ্রসর হইলেন। কাজী ক্রুদ্ধ হইয়া বাধা দিতে অগ্রসর হইল। কিন্তু বিশাল জনসমুদ্র মার মার কাট কাট শব্দে তাঁহার বাড়ীর দিকে অগ্রসর হইতেছে দেখিয়া কাজী পলাইল এবং সংকীর্তন নিষেধের আজ্ঞা প্রতাহৃত হইল।
চৈতন্যের আদর্শে ভক্তগণ ব্যক্তিগতভাবেও অনুপ্রাণিত হইয়াছিলেন। তাঁহার ভক্ত বৈদ্য চন্দ্রশেখরের বাড়ীতে যে দেবমূর্ত্তি ছিল তাহা স্বর্ণ নির্মিত মনে করিয়া যবন সৈন্য তাহা কাড়িয়া নিতে আসিল।
বক্ষে রাখিল ঠাকুর তবু না ছাড়িল।
চন্দ্রশেখরের মুণ্ড মোগলে কাটিল ॥
কিন্তু চৈতন্যের এই পৌরুষের আদর্শ বাঙালীর চিত্তে স্থায়িভাবে প্রতিষ্ঠিত হয় নাই। কারণ বৈষ্ণব সম্প্রদায় দাস্য ও মাধুর্য ভাবেই বিভোর ছিলেন–পৌরুষকে মর্যাদা দেন নাই। এই বৈষ্ণবদের হাতে চৈতন্যের আদর্শের কিরূপ বিকৃতি ঘটিয়াছিল কাজীর সহিত বিরোধের বিবরণ হইতেই তাহা প্রমাণিত হয়। উপরে যে বিবরণ দেওয়া হইয়াছে তাহা সমসাময়িক চৈতন্য-চরিতকার বৃন্দাবনদাসের চৈতন্যভাগবত গ্রন্থে বিস্তৃতভাবে উল্লিখিত আছে। [চৈতন্য ভাগবত (মধ্য খণ্ড) ২৩ অধ্যায়] চৈতন্যের আদেশে তাঁহার অনুচরেরা যে কাজীর ঘর ও ফুলের বাগান ধ্বংস করিয়াছিল তাঁহার স্পষ্ট উল্লেখ আছে। কিন্তু বৈষ্ণবদের দাসবৃত্তিসুলভ মনোভাবের সহিত চৈতন্যের এই উদ্ধত’ ও হিংসাত্মক আচরণ সুসঙ্গত হয় না–সম্ভবত কতকটা এই কারণে এবং কতকটা মুসলমান রাজা ও রাজকর্মচারীর ভয়ে তাহারা চৈতন্যের জীবনের এই ইতিহাসপ্রসিদ্ধ ঘটনাটিকে প্রাধান্য দেন নাই এবং বিকৃত করিয়াছেন। সমসাময়িক বৃন্দাবনদাস ছিলেন গৃহত্যাগী সন্ন্যাসী-কাহাকেও ভয় করিতেন না। সবিস্তারে তিনি সব লিখিয়াছেন। কিন্তু মুরারি গুপ্ত ছিলেন গৃহী। তিনি সুলতান হোসেন শাহের পুত্র নসরৎ শাহের রাজত্বকালে চৈতন্যের জীবনী লেখেন। কাজীর ব্যাপারটা ঘটিয়াছিল হোসেন শাহের রাজত্বকালে। সুতরাং যদিও বৃন্দাবনদাস লিখিয়াছেন যে কাজীর ঘর ভাঙ্গার ব্যাপারে মুরারি গুপ্ত একটি সক্রিয় অংশ গ্রহণ করিয়াছিলেন তথাপি মুরারি গুপ্ত এই ঘটনার বিন্দুমাত্র উল্লেখ করেন নাই। পরবর্তী চৈতন্য-চরিতকার কবিকর্ণপুর পরমানন্দ সেনও তাঁহার পদাঙ্ক অনুসরণ করিয়াছেন। চৈতন্যের সমসাময়িক জয়ানন্দ মাত্র দুই ছত্রে কাজীর ঘর ভাঙ্গা ও পলায়নের উল্লেখ করিয়াছেন। ঘটনাটির প্রায় একশত বৎসর পরে বৃদ্ধ কৃষ্ণদাস কবিরাজ বৃন্দাবনে বসিয়া তাঁহার প্রসিদ্ধ বিরাট গ্রন্থ ‘‘চৈতন্যচরিতামৃত’ রচনা করেন। তখন আকবরের রাজ্য কেবল শেষ হইয়াছে। সুতরাং স্থান ও কালের দিক দিয়া মুসলমান সরকারের ভীতি অনেকটা কম থাকিবার কথা। এই কারণে তিনি কাজীর ঘটনা, তাঁহার ঘর, বাগান ধ্বংসের কথা সবিস্তারে বর্ণনা করিয়াছেন। কিন্তু তখন বৈষ্ণবদের মধ্যে দীন দাস্য ভাবের মহিমা পৌরুষের স্থান অধিকার করিয়াছেন। অতএব তিনি লিখিয়াছেন যে, এই হিংসাত্মক ব্যাপারে চৈতন্যের কোন হাত ছিল না, ইহা কয়েকটি উদ্ধতপ্রকৃতি লোকের কাজ। চৈতন্য কাজীকে ডাকাইয়া আনিলেন। বিনম্র বচনে
