এই ছয় গোস্বামী ও অন্যান্য বৈষ্ণবগণের রচিত অসংখ্য সংস্কৃত গ্রন্থে গৌড়ীয় বৈষ্ণব মতবাদ লিপিবদ্ধ আছে। এই সম্প্রদায়ের মূলকথা ‘গৌরপারম্যবাদ’ অর্থাৎ চৈতন্যই চরম সত্তা ও পরম উপেয়; চৈতন্য একাধারে কৃষ্ণ ও রাধা। এই দেশে ‘গৌরনাগরভাব’ও প্রচলিত ছিল; ইহাতে রাগানুগা ভক্তির সাহায্যে ভক্তগণ চৈতন্যকে নাগর এবং নিজেকে নাগরীরূপে কল্পনা করিয়া উপাসনায় প্রবৃত্ত হন। বাঙালী বৈষ্ণবগণের মতে, গোপীগণ কৃষ্ণবধূ কৃষ্ণের স্বকীয়া নারী; সুতরাং গোপীগণের সহিত পরকীয়াবাদ বিলাস নহে। গোপগণের সহিত গোপীগণের বিবাহ ও যৌনসম্বন্ধকালে গোপীগণ কৃষ্ণের মায়াশক্তিবলে প্রচ্ছন্ন ছিলেন এবং তাহাদের পরিবর্তে তদনুকারী কায়িকরূপ গোপগণের সংস্পর্শে আসিয়াছিলেন।
গৌড়ী বৈষ্ণবগণ ভক্তিকে অতি উচ্চ স্থান দিয়াছেন। ভক্তি হইতে পারে শুদ্ধা, জ্ঞানমিস্রা, যোগমিশ্রা ও কর্মমিশ্রা শুদ্ধা ভক্তি সর্বশ্রেষ্ঠ। অকৈতবা ভক্তির দুইটি অবস্থা–বৈধী ও রাগানুগা। শাস্ত্রোক্ত বিধিদ্বারা প্রবর্তিত হয় বলিয়া বৈধী ভক্তির ঈদৃশ নামকরণ হইয়াছে। রাগ বা সহজ চিত্তবৃত্তির অনুগমন করে বলিয়া দ্বিতীয় অবস্থার নাম রাগানুগা; ইহাতে শাস্ত্রীয় বিধির কোন প্রয়োজন নাই।
জীবকর্ত্তৃক ভগবানের সাক্ষাৎকার বা ভগবৎ প্রাপ্তিই মুক্তি। একমাত্র প্রীতির দ্বারাই এই সাক্ষাঙ্কার সম্ভব; সুতরাং, ভগবপ্রীতিই চরম কাম্য। শান্ত, দাস্য, মৈত্র, বাৎসল্য ও মাধুর্য–এই পাঁচটি ভগবপ্রীতির মূলীভূত ভাব; ইহারা উত্তরোত্তর শ্রেয়।
উল্লিখিত সংক্ষিপ্ত বিবরণ হইতে বাংলা দেশের বৈষ্ণবগণের ধর্মমত সম্বন্ধে মোটামুটি ধারণা করা যায়। তাঁহাদের আচার, আচারণ ও ধর্ম্মানুষ্ঠান সম্বন্ধে বহু তথ্য লিপিবদ্ধ আছে ‘হরিভক্তিবিলাস’ ও ‘সৎক্রিয়ারদীপিকা’ নামক দুইখানি গ্রন্থে। এই দুই গ্রন্থে পুরাণ ও তন্ত্রের গভীর প্রভাব বিদ্যমান; কিন্তু প্রচলিত স্মৃতিশাস্ত্রের অনুসরণ ইহাদের মধ্যে নাই। ‘হরিভক্তিবিলাসে’ গুরু, শিষ্য, দীক্ষা, দৈনন্দিন ধর্ম্মানুষ্ঠান, বিষ্ণুভক্তির স্বরূপ, ভক্তিতত্ত্ব, পুরশ্চরণ, মূর্ত্তিনির্মাণ, মন্দির নির্মাণ প্রভৃতি বিষয় আলোচিত হইয়াছে; ইহাতে স্মৃতিশাস্ত্রের সংস্কারগুলির কোন উল্লেখ নাই। ‘সৎক্রিয়াসারদীপিকা’য় গ্রন্থকার বলিয়াছেন যে, স্মৃতিশাস্ত্রোক্ত বিধান বৈষ্ণবগণের পক্ষে প্রযোজ্য নহে। কিন্তু, এই গ্রন্থে প্রাচীনতর কতক স্মৃতিগ্রন্থের, বিশেষতঃ বাঙালী স্মৃতিকার ভবদেব ভট্ট ও অনিরুদ্ধ ভট্টের স্মৃতিনিবন্ধের অনুসরণ লক্ষণীয়। ইহা হইতে মনে হয় যে সামাজিক ব্যাপারে গৌড়ীয় বৈষ্ণবগণ সনাতন স্মৃতিশাস্ত্রকে সম্পূর্ণরূপে বর্জন করেন নাই। উক্ত উভয় গ্রন্থে পূর্বপুরুষের আত্মার উদ্দেশ্যে শাস্ত্রপ্রসঙ্গ বর্জিত হইয়াছে। ‘হরিভক্তিবিলাসে’ সংস্কারের উল্লেখ না থাকিলেও অপর গ্রন্থে সংস্কারসমূহের ব্যবস্থা আছে; তবে সংস্কারগুলির অনুষ্ঠানপদ্ধতি চিরাচরিত স্মার্ত মত অনুযায়ী নহে। সক্ৰিয়াসারদীপিকার ভগবদ্ধর্মের আচরণ অন্যান্য দেবদেবীর উপাসনা, পূর্বপুরুষের পূজা, এবং নিত্য, নৈমিত্তিক ও কাম্য অনুষ্ঠানাদি অপেক্ষা শ্রেয়। কৃষ্ণপূজা সকল পূজা অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ। বিবাহপ্রসঙ্গে গ্রন্থকার বলিয়াছেন যে, বর স্মৃতিশাস্ত্রোক্ত পঞ্চোপাসনা অর্থাৎ গণেশ, শিব, দুর্গা, সূর্য ও বিষ্ণুর পূজা সযত্নে পরিহার করিবেন। নবগ্রহ, লোকপাল এবং ষোড়শমাতৃকার পূজাও তাঁহার পক্ষে বর্জনীয়। ইহাদের পরিবর্তে বিম্বসেন, সনক প্রভৃতি পঞ্চ মহাভাগবত তাঁহার পূজ্য। এতদ্ব্যতীত কবি, হবি, অন্তরীক্ষ প্রভৃতি যোগীন্দ্র, ব্রহ্মা, শুকদেব প্রভৃতি ভাগবত, পৌর্ণমাসী, লক্ষ্মী প্রভৃতি বৈষ্ণবীও তকর্ত্তৃক পূজনীয়। তিনি যদি রাধা, কৃষ্ণ বা বিষ্ণুর কোন অবতারের উপাসক হন তাহা হইলে আনুষঙ্গিক দেবতাগণের পূজাও তাঁহার পক্ষে বিধেয়।
কিন্তু এই সমুদয় শাস্ত্র রচনার পূর্বেই চৈতন্যের সাত্ত্বিক ভাবযুক্ত দিব্য প্রেমোন্মাদনাপূর্ণ রাধাকৃষ্ণের আদর্শানুযায়ী ভগবদ্ভক্তির ও প্রেমের তরঙ্গ সারা দেশে এক অপূর্ব উন্মাদনার সৃষ্টি করিল-রাধাকৃষ্ণের লীলা ও হরিনাম কীর্তনে বাংলা দেশ প্রেমের ও ভক্তির বন্যায় যেন ডুবিয়া গেল। ইহাতে আনুষ্ঠানিক হিন্দুধর্ম্মের আচার বিচারের এবং জাতিভেদের বিশেষ কোন চিহ্ন ছিল না। স্ত্রীলোক, শূদ্র এবং আচণ্ডাল সকলকেই প্রেমের ধর্ম্মে দীক্ষিত করিয়া তাহাদের মনে ভগবৎপ্রেমের ও সাত্ত্বিকভাব জাগাইয়া ভোলাই ছিল চৈতন্যের আদর্শ ও লক্ষ্য।
রাধাকৃষ্ণের প্রেমের মহান আদর্শ চৈতন্যের পূর্বেও এ দেশে প্রচলিত ছিল। কিন্তু তাহা বহুল পরিমাণে সাত্ত্বিক ভাবশূন্য হইয়া নরনারীর দৈহিক সম্ভোগের প্রতীক হইয়া উঠিয়াছিল। জয়দেবের গীতগোবিন্দ কাব্য সমগ্র ভারতে সমাদর লাভ করিয়াছিল। কিন্তু সাধারণ নরনারীর দৈহিক সম্ভোগের যে বাস্তব চিত্র বর্তমান যুগে সাহিত্যে ও সমাজে হেয় ও অশ্লীল বলিয়া পরিগণিত হয়, তাঁহার নগ্নরূপও জয়দেব অঙ্কিত করিয়াছেন। গীতগোবিন্দের দ্বাদশ সর্গে রাধাকৃষ্ণের কামকেলির যে বর্ণনা আছে বর্তমান কালে কোন গ্রন্থে তাহা থাকিলে গ্রন্থকার দুর্নীতি প্রচারের অপরাধে আদালতে দণ্ডিত হইতেন। চণ্ডীদাসের ‘শ্রীকৃষ্ণকীর্তন সম্বন্ধে একজন বৈষ্ণবসাহিত্যের মহারথী লিখিয়াছেন যে “আদিরসের ছড়াছড়ি থাকায় কাব্যখানি প্রায় Pornography পর্যায়ে পড়িয়াছে।” [ডাঃ বিমানবিহারী মজুমদার – ষোড়শ শতাব্দীর পদাবলী সাহিত্য, ২৮৪ পৃ.] শুধু তাহাই নহে। এই কাব্যে বর্ণিত কৃষ্ণের চরিত্র বিশ্লেষণ করিয়া তিনি লিখিয়াছেন–কবির কৃষ্ণ কামুক, কপট, মিথ্যাবাদী, অতিশয় দাম্ভিক এবং প্রতিহিংসাপরায়ণ … রাধাকৃষ্ণের প্রণয় কাহিনীর ইহা অত্যন্ত বিকৃত রূপ। এমন কি কৃষ্ণকীর্তনের নায়ক কৃষ্ণ বারংবার রাধাকে বলিয়াছেন যে তাঁহার দেহসম্ভোগের জন্যই তিনি (কৃষ্ণ) পৃথিবীতে অবতার হইয়া জন্মিয়াছেন (অবতার কৈল আহ্মে তোর রতি আসে)।” [ডাঃ বিমানবিহারী মজুমদার – ষোড়শ শতাব্দীর পদাবলী সাহিত্য, ২৬৪-৬৫ পৃ.] অনেক পণ্ডিতের মতে এই কৃষ্ণকীর্তন চৈতন্যের জন্মের অল্প পূর্বেই রচিত। সুতরাং জয়দেব হইতে আরম্ভ করিয়া তিনশত বৎসর যাবৎ রাধাকৃষ্ণের প্রেমের ছদ্ম আবরণে কামের নগ্নরূপ ও পরকীয়া প্রেমের মাহাত্ম বৈষ্ণবধর্মকে কলুষিত করিয়াছিল। অবশ্য চণ্ডীদাসের পদাবলীতে ও অন্যত্র বিশুদ্ধ উচ্চপ্রেমের আদর্শও চিত্রিত হইয়াছে। উচ্চাঙ্গ ভক্তিরসেরও যে অভাব আছে এমন নয়। অর্থনীতির একট মূলসূত্র এই যে যদি খাঁটি ও মেকী টাকা একত্র বাজারে চলে তবে ক্রমে ক্রমে খাঁটি টাকা লোপ পায়। চণ্ডীদাস গাহিয়াছেন “রজকিনী প্রেম নিকষিত হেম কামগন্ধ নাহি তাহে।” কিন্তু সাধারণ মানুষ ‘রজকিনী প্রেম’ এই দুটি কথার উপর যতটা জোর দিয়াছে, কামগন্ধহীন’ প্রেমের উপর ততটা নহে। চণ্ডীদাসের পদাবলী ও ‘শ্রীকৃষ্ণকীর্তন একসঙ্গে প্রচারিত ও এক কবির লেখা হইলেও (এ বিষয়ে কেহ কেহ সন্দেহ করেন) কৃষ্ণকীর্তনের রাধাকৃষ্ণই জনপ্রিয় হইবেন ইহা সম্পূর্ণ স্বাভাবিক।
