জল, মূল, ফল, দুগ্ধ, ঘৃত, ব্রাহ্মণের অনুমোদিত বস্তু, আচার্যের অনুমতিক্রমে যে কোন খাদ্যদ্রব্য এবং ঔষধ।
উপবাসে অক্ষম ব্যক্তির রাত্রিতে ভোজনে কোন পাপ হয় না। ঋতুমতী, অন্তঃসত্ত্বা বা অন্যপ্রকারে অশুদ্ধা নারী স্বীয় ব্রতের জন্য প্রতিনিধি নিযুক্ত করিবেন এবং উপবাসাদি কায়িককৃত্য স্বয়ং সম্পাদন করিবেন। ব্রতদিনে নিম্নলিখিত কর্ম বর্জনীয়:
পতিত ও নাস্তিক ব্যক্তির সহিত আলাপ, অন্ত্যজ, পতিতা ও রজঃস্বলা নারীর দর্শন, স্পর্শ ও উহাদের সহিত কথোপকথন, গাত্রাভ্যঙ্গ, তামূলভক্ষণ, দন্তধাবন, দিবানিদ্রা, অক্ষক্রীড়া ও স্ত্রীসম্ভোগ।
যদিও মনুর মতে (৫।৫৫) ব্রতে ও উপবাসে স্ত্রীলোকের অধিকার নাই, তথাপি বাংলা দেশের স্মৃতিকারগণ পতির অনুমতিক্রমে এই সকল কার্যে পত্নীর অধিকার স্বীকার করিয়াছেন।
প্রতি পক্ষের একাদশী তিথিতে গৃহস্থের ও বিধবার উপবাস করণীয়। পুত্রবান গৃহী কৃষ্ণপক্ষে এই উপবাস করিবেন না। যাঁহার পুত্র বৈষ্ণব তিনি কৃষ্ণপক্ষে একাদশীর উপবাস করিতে পারেন। আট বৎসরের ঊর্ধ্বে ও আশী বৎসরের নিম্নে যাহাদের বয়স, তাহাদের উপবাস অবশ্যকরণীয়। একাদশীতে নিরমু উপবাসই বিধেয়। কিন্তু, অশক্তপক্ষে রাত্রিতে নিম্নলিখিত যে কোন দ্রব্য ভক্ষণ করা যায় :
হবিষ্যান্ন, ফল, তিল, দুগ্ধ, জল, ঘৃত, পঞ্চগব্য। এই তালিকায় পূর্ব পূর্ব দ্রব্য অপেক্ষা পর পর দ্রব্য প্রশস্তুতর।
৪
বাস্তব জীবনে ধর্ম ও নীতি
মধ্যযুগে বাংলায় যে হিন্দু ধর্ম প্রচলিত ছিল তাহা প্রাচীন যুগের পৌরাণিক ধর্ম্মেরই স্বাভাবিক বিবর্তন। সাধারণতঃ উপাস্য দেবতা অনুসারে হিন্দুদিগকে পাঁচ ভাগে বিভক্ত করা হয়–বৈষ্ণব, শৈব, শাক্ত, সৌর ও গাণপত্য। যদিও অনেকেই পৃথকভাবে বিষ্ণু, শিব, শক্তি, সূর্য ও গণপতিকে ইষ্টদেব জ্ঞানে পূজা করিতেন তথাপি সাধারণতঃ ব্যবহারিক জীবনে প্রায় সকলেই স্মৃতিশাস্ত্রের নিয়ম অনুযায়ী একত্রে ঐ পঞ্চ দেবতারই পূজা করিতেন। সুতরাং বৈষ্ণব, শৈব ও শাক্ত এই তিনটি প্রধান এবং সৌর ও গাণপত্য এই দুইটি অপ্রধান সম্প্রদায় থাকিলেও সাধারণতঃ হিন্দুদের মধ্যে বেশীর ভাগকেই স্মার্ত পঞ্চোপাসক বলাই যুক্তিসঙ্গত। নিত্য ও নৈমিত্তিক ধর্মকার্যে ‘পঞ্চদেবতাভ্যো নমঃ’ (পঞ্চদেবতাকে প্রণাম মন্ত্র পাঠ করিয়া ফুল জল অর্ঘ্য, প্রভৃতি দ্বারা পঞ্চদেবতার পূজা করিতেন। সাধারণতঃ ইষ্টদেবতার মূর্ত্তি বা প্রতীক কেন্দ্রস্থলে এবং অন্য চারি দেবতার মূর্ত্তি ও প্রতীক চারি কোণে রাখিয়া পূজা করা হইত। এখনও যে গৃহস্থের বাড়িতে প্রত্যহ নারায়ণ শিলা ও মৃৎ-শিবলিঙ্গের পূজা হয় ইহা পঞ্চোপাসনারই চিহ্ন।
এই ধর্ম্মানুষ্ঠানের পদ্ধতি সাধারণভাবে সকল হিন্দুদের সম্বন্ধেই প্রযোজ্য। তবে মধ্যযুগে যে কয়েকটি বৈশিষ্ট্য বিশেষভাবে রূপায়িত হইয়াছিল, অতঃপর তাঁহার সম্বন্ধে আলোচনা করিব।
মহাপ্রভু শ্রীচৈতন্যদেবের আবির্ভাবের ফলে ষোড়শ শতকে বাংলায় এক অভিনব বৈষ্ণব সম্প্রদায়ের অভ্যুত্থান হয়। গোপীগণের কিশোর কৃষ্ণের সহিত ও রাধার লাস্য ও মাধুর্যভাবপূর্ণ লীলাকে কেন্দ্র করিয়া ভগবদ্ভক্তি ও ঈশ্বরপ্রেমের বিকাশ–ইহাই ছিল এই সম্প্রদায়ের বৈশিষ্ট্য। চৈতন্যের পূর্বেও যে এই বৈষ্ণবধর্ম বাংলা দেশে প্রচলিত ছিল জয়দেবের গীতগোবিন্দ ও চণ্ডীদাসের ‘পদাবলী’ তাঁহার সাক্ষ্য দিতেছে। চৈতন্যের জন্মের অল্প কিছুকাল পূর্বে শ্রীমাধবেন্দ্র পুরী এই প্রেমধর্ম প্রচার করিয়াছিলেন। তাঁহার ঊনিশ জন শিষ্যের মধ্যে ঈশ্বরপুরী, পরমানন্দপুরী, শ্রীরঙ্গপুরী, কেশবভারতী ও অদ্বৈত আচার্য প্রভৃতি কয়েকজনের সঙ্গে চৈতন্যের সাক্ষাৎ হইয়াছিল ও ঘনিষ্ঠ সম্বন্ধ জন্মিয়াছিল। কিন্তু তথাপি কৃষ্ণভক্তিমূলক বৈষ্ণবধর্ম চৈতন্যের পূর্বে বিশেষ প্রভাব বিস্তার করে নাই। ‘চৈতন্য ভাগবতে’ [আদি, ২য় অধ্যায়] এ সম্বন্ধে চৈতন্যের অব্যবহিত পূর্বেকার নবদ্বীপের অবস্থা এইভাবে বর্ণিত হইয়াছে।
কৃষ্ণনাম ভক্তি শূন্য সকল সংসার।
প্রথম কলিতে হৈল ভবিষ্য-আচার ॥
ধর্মকর্ম লোক সবে এই মাত্র জানে।
মঙ্গলচণ্ডীর গীতে করে জাগরণে ॥
দম্ভ করি বিষহরি পূজে কোন জন।
পুত্তলি করয়ে কেহ দিয়া বহু ধন ॥
ভট্টাচার্য, চক্রবর্তী, মিশ্র সকলে শাস্ত্র পড়ায় কিন্তু,
“না বাখানে যুগ-ধর্ম কৃষ্ণের কীর্তন ॥
… … …
যেবা সব বিরক্ত তপস্বী অভিমানী।
তা সবার মুখেতেও নাহি হরিধ্বনি ॥
… … …
গীতা ভাগবত যে জানে বা পড়ায়।
ভক্তির ব্যাখ্যান নাহি তাঁহার জিহ্বায় ॥
… … …
সকল সংসার মত্ত ব্যবহার-রসে।
কৃষ্ণ-পূজা বিষ্ণু-ভক্তি কারো নাহি বাসে ॥
বাশুলী পূজয়ে কেহো নানা উপহারে।
মদ্যমাংস দিয়া কেহো যক্ষ পূজা করে ॥
তবে হরিভক্তিপরায়ণ কয়েকজন বৈষ্ণবও নবদ্বীপে ছিলেন–তাঁহাদের অগ্রণী অদ্বৈতাচার্য কৃষ্ণের ভক্তিবিহীন নগরবাসীদের দেখিয়া নিতান্ত দুঃখ পাইতেন। চৈতন্যদেব (১৪৮৬-১৫৩৩ খ্রীষ্টাব্দ) তাঁহার দুঃখ দূর করিলেন। তিনি নবদ্বীপে জন্মগ্রহণ করেন, ২২ বৎসর বয়সে ঈশ্বরপুরীর নিকট দশাক্ষর কৃষ্ণমন্ত্রে দীক্ষিত হন, এবং ইহার দুই বৎসর পরে কেশব ভারতীর নিকট সন্ন্যাস গ্রহণ করেন (১৫১০ খ্রীষ্টাব্দ)। তাঁহার গার্হস্থ্য আশ্রমের নাম ছিল শ্রীবিশ্বম্ভর। দীক্ষাকালে নাম হইল ‘শ্রীকৃষ্ণচৈতন্য, সংক্ষেপে চৈতন্য। সন্ন্যাস গ্রহণের পর তিনি অধিকাংশ সময় পুরীতেই থাকিতেন; কিন্তু উত্তর ও দক্ষিণ ভারতের বহু তীর্থও ভ্রমণ করিয়া ছিলেন। শ্রীকৃষ্ণের লীলাভূমি বৃন্দাবন তখন প্রায় জনশূন্য হইয়া কোনক্রমে টিকিয়াছিল–তিনি আবার ইহাকে বৈষ্ণবধর্ম্মের একটি প্রধান কেন্দ্রে পরিণত করিলেন। দীক্ষা গ্রহণের পরেই নিত্যানন্দ, অদ্বৈত প্রভৃতি ভক্ত ও পার্ষদগণ চৈতন্যকে ঈশ্বরের অবতার বলিয়া ঘোষণা করেন। বৈষ্ণবগণের মতে ভগবানে ভক্তি ও সম্পূর্ণরূপে তাঁহার পদে আত্মসমর্পণ (প্ৰপত্তি) ইহাই মোক্ষলাভের একমাত্র পন্থা। কিন্তু এই নিষ্কাম ভক্তি শান্ত, দাস্য, সখ্য, বাৎসল্য ও মাধুর্য এই পাঁচটি ভাবের মধ্য দিয়া আত্মপ্রকাশ করে। এই মাধুর্য ভাবের প্রতীক কৃষ্ণের প্রতি গোপীদের ও রাধার প্রেম। এই প্রেমের উন্মাদনাই চৈতন্যের জীবনে প্রতিভাত হইয়াছিল। এই প্রেমের উচ্ছ্বাসে তিনি সত্য সত্যই সময় সময় উন্মাদ ও সংজ্ঞাশূন্য হইয়া পড়িতেন এবং এই প্রেম-রস আস্বাদনের প্রকৃষ্ট উপায় স্বরূপ হরিকৃষ্ণ নামসঙ্কীর্তনের প্রচলন করিয়াছিলেন। সপরিকর চৈতন্য বহু লোকজন সমভিব্যাহারে খোল করতালের বাদ্য সহযোগে গৃহে বা রাজপথে নামকীর্তন করিয়া বেড়াইতেন এবং অনেক সময় ভাবাবেগে মূৰ্ছিত হইয়া পড়িতেন। কৃষ্ণের প্রতি রাধিকার প্রেম তিনি নিজের জীবনে আস্বাদন করিতেন। কিন্তু এ প্রেম দিব্য ও দেহাতীত। ইহাই সংক্ষেপে এই অভিনব বৈষ্ণবধর্ম্মের মূলকথা। শ্রীচৈতন্য নিজে কোন তত্ত্বমূলক গ্রন্থ রচনা করেন নাই। তাঁহার সমসাময়িক বৃন্দাবনবাসী ছয়জন গোস্বামী শাস্ত্রগ্রন্থ রচনা করিয়া গৌড়ীয় বৈষ্ণব মতকে একটি দার্শনিক ভিত্তির উপর স্থাপিত করিয়া ইহাকে বিশিষ্ট মর্যাদা দান করিয়াছেন। এই ছয়জন গোস্বামীর নাম-রূপ, সনাতন, জীব, রঘুনাথ দাস, রঘুনাথ ভট্ট ও গোপাল ভট্ট।
