৬। খাদ্য ও পানীয় : বঙ্গদেশের যে সকল স্মৃতিনিবন্ধ প্রায়শ্চিত্তবিষয়ক, উহাদের মধ্যে নিষিদ্ধ খাদ্য ও পানীয় সম্বন্ধে বহু তথ্য পাওয়া যায়। শাস্ত্রীয় প্রমাণবলে শূলপাণি নিষিদ্ধ খাদ্যদ্রব্যগুলিকে নিম্নলিখিত শ্রেণীভুক্ত করিয়াছেন;–
(১) জাতিদুষ্ট–স্বভাবতঃ অপকারী; যথা–রসুন, পেঁয়াজ প্রভৃতি।
(২) ক্রিয়াদুষ্ট-–পতিত ব্যক্তির স্পর্শ প্রভৃতি কোন কারণে দূষিত।
(৩) কালদূষিত–পর্যুষিত।
(৪) আশ্রয়দূষিত–ইহার অর্থ স্পষ্ট নহে। মনে হয় ইহা মন্দ আশ্রয় বা পাত্রে রক্ষণ হেতু দূষিত বস্তুকে বুঝায়।
(৫) সংসর্গদুষ্ট–সুরা, রসুন, প্রভৃতি নিষিদ্ধ দ্রব্যের সংসর্গে দূষিত।
(৬) শহৃল্লেখ–বিষ্ঠাতুল্য; যে পদার্থের দর্শনে মনে ঘৃণার উদ্রেক হয়।
‘বৃহদ্ধর্ম্মপুরাণে’ (৩।৫।৪৪-৪৬) অমাবস্যা, পূর্ণিমা, চতুর্দশী, অষ্টমী, দ্বাদশী তিথি, রবিবার এবং রবিসংক্রান্তি ভিন্ন অন্যান্য দিনে মৎস্যভক্ষণের বিধান আছে। এই পুরাণের মতে, রোহিত, শকুল, শফরাদি মৎস্য এবং শুক্লবর্ণ সশল্ক মৎস্য ব্রাহ্মণের ভক্ষ্য।
সিদ্ধ চাউল, মুসুরির ডাল ও মৎস্য ভক্ষণ অন্যান্য প্রদেশের ব্রাহ্মণদের পক্ষে নিষিদ্ধ হইলেও স্মার্ত রঘুনন্দন এইগুলি অনুমোদন করিয়াছেন। হিন্দু যুগে ভবদেব ভট্টও ব্রাহ্মণদের মাছ মাংস খাওয়া সমর্থন করিয়াছেন। [বাংলা দেশের ইতিহাস, প্রথম খণ্ড (তৃতীয় সং) ১৯৪ পৃ.]
বাংলা দেশের স্মৃতিশাস্ত্রে সুরাপান তীব্রভাবে নিষিদ্ধ হইয়াছে। ইহা পঞ্চবিধ মহাপাতকের অন্যতম। পৈষ্টী, গৌড়ী ও মাধ্বী–এই ত্রিবিধ মদ্য সুরা নামে অভিহিত। এই তিন প্রকার সুরা যথাক্রমে, অন্ন, গুড় এবং মধু হইতে জাত। সুরা শব্দের মুখ্যার্থ পৈষ্টী সুরা; ইহা পান করিলে দ্বিজগণের মহাপাতক হয়। অপর দ্বিবিধ সুরা শুধু ব্রাহ্মণের পক্ষে নিষিদ্ধ, অপর দুই দ্বিজবর্ণের পক্ষে নহে। সুরাপান সংক্রান্ত ব্যবস্থা হইতে মনে হয় সমাজে ইহা বহুল পরিমাণে প্রচলিত ছিল। ‘পান’ শব্দের অর্থ, শূলপাণির মতে, ‘কণ্ঠদেশাদধোনয়নম্’ অর্থাৎ গলাধঃকরণ; সুতরাং সুরার স্পর্শে, এমন কি মুখে লইয়া গিলিয়া না ফেলা পর্যন্ত, কোন পাতকের সম্ভাবনা ছিল বলিয়া মনে হয় না।
৭। বিবিধ আচার অনুষ্ঠান : প্রাচীন স্মৃতিতে বহুসংখ্যক সংস্কারের উল্লেখ আছে। মধ্যযুগে ঠিক কয়টি সংস্কার সমাজে প্রচলিত ছিল, তাহা বলা কঠিন। হলায়ুধের ‘ব্রাহ্মণসর্বস্ব’ নামক গ্রন্থে একটি তালিকায় নিম্নলিখিত দশটি সংস্কারের উল্লেখ আছে :
গর্ভাধান, পুংসবন, সীমন্তোন্নয়ন, জাতকর্ম, নামকরণ, নিষ্ক্রমণ, অন্নপ্রাশন চূড়াকরণ, উপনয়ন ও বিবাহ। এই তালিকায় রঘুনন্দন যোগ করিয়াছেন সীমন্তে নিয়নের পরে শোষ্যন্তীহোম এবং উপনয়নের পরে সমাবর্তন। হলায়ূধও এই দুইটির উল্লেখ করিয়াছেন; কিন্তু উক্ত তালিকার অন্তর্ভুক্ত করেন নাই। ইহা হইতে মনে হয়, এই দুইটি সংস্কারকে তেমন প্রাধান্য দেওয়া হইত না।
বিবাহ সম্বন্ধে কয়েকটি বিধিনিষেধ এইরূপ। সাধারণতঃ অশৌচ ধর্ম্মানুষ্ঠানের প্রতিবন্ধক। কিন্তু, বিবাহ আরব্ধ হইবার পরে অশৌচ কোন বাধা সৃষ্টি করিতে পারে না। মলমাসে ধর্মকার্য নিষিদ্ধ। কিন্তু, বিবাহারম্ভের পরে মলমাস বিবাহের অন্তরায় হইতে পারে না। রঘুনন্দন বলিয়াছেন, বিবাহারম্ভের পরে কন্যার রজোদর্শন হইলে বিবাহ পণ্ড হয় না। নান্দীমুখী বা বৃদ্ধিশ্রাদ্ধের দ্বারা বিবাহানুষ্ঠানের সূচনা হয়।
ক্ষুত বা হাঁচি সাধারণতঃ অশুভসুচক বলিয়া বিবেচিত হইলেও বিবাহে ইহা শুভসূচক। বিবাহে যন্ত্রসঙ্গীত ও স্ত্রীলোকের কণ্ঠসঙ্গীত এবং উলুধ্বনি শুভসূচক।
বিবাহস্থলে একটি গাভী বাঁধা থাকিবে। অহণান্তে বর পূর্বনিযুক্ত একজন নাপিতের অনুরোধে উহাকে মুক্ত করিবেন।
যদিও দানমাত্রেই দাতা বসিবেন পূর্বমুখ হইয়া এবং গ্রহীতা হইবেন উত্তরমুখ, তথাপি বিবাহে এই নিয়মের ব্যতিক্রম হয়। ব্যতিক্রম শব্দের অর্থ কেহ কেহ করিয়াছেন এই যে, দাতা হইবেন উত্তরমুখ এবং গ্রহীতা পূর্বমুখ। রঘুনন্দনের মতে, দাতা পশ্চিমমুখ হইবেন।
বিবাহানুষ্ঠানের অঙ্গস্বরূপ রঘুনন্দন জমুলমালিকা বা মুখচন্দ্রিকার উল্লেখ করিয়াছেন। প্রমাণ উদ্ধৃত করিয়া রঘুনন্দন বলিয়াছেন যে, জমুলমালিকা শব্দে বুঝায় সেই প্রথা যাহাতে বর ও কন্যাকে পরস্পরের সম্মুখীন করিয়া তাহাদিগকে পুস্পমাল্যে ভূষিত করা হয়। ইহা হইতে মনে হয়, জম্বুলমালিকা শব্দটি প্রথমে মালা বুঝাইলেও পরে যাহাতে ঐ মালা ব্যবহৃত হইত সেই অনুষ্ঠানকেই বুঝাইত।
বিবাহ সংক্রান্ত সকল অনুষ্ঠান সম্পন্ন হইলে দম্পতি অক্ষারলবণ ভোজ্যদ্রব্য গ্রহণ করিয়া ব্রহ্মচর্য অবলম্বনপূর্বক তিন রাত্রি একত্র হইয়া ভূমিতে শয়ন করিবেন। পারিভাষিক ‘অক্ষারলবণ’ শব্দে নিম্নলিখিত দ্রব্যসমূহকে বুঝায়–গাভীদুগ্ধ, গোদুগ্ধজাত ঘৃত, ধান্য, মুদ্র, তিল, যব, সামুদ্র ও সন্ধব লবণ।
বিবাহের পরে পিত্রালয় হইতে শ্বশুরালয়ে পৌঁছিয়া কন্যা সেইদিন সেখানে অনুগ্রহণ করিবে না। বিবাহিত কন্যার পুত্র না হওয়া পর্যন্ত কন্যার পিতা কন্যাগৃহে আহার করিবেন না।
বঙ্গীয় স্মৃতিশাস্ত্রে বহু ব্রতের বিধান আছে। ব্রতের সংজ্ঞা নির্দেশ করিতে গিয়া শূলপাণি বলিয়াছেন যে, যাহার মূলে আছে সঙ্কল্প এবং যাহা দীর্ঘকালানুপালনীয়’ তাহা ব্রত। জ্ঞাতিগণের জাতশৌচ ও মৃতাশৌচ ধর্মকার্যের প্রতিবন্ধক হইলেও ব্রত আরব্ধ হইলে উহা কোন বাধা সৃষ্টি করিতে পারে না; সঙ্কল্পই ব্রতের আরম্ভ। উপবাস ব্রতের অপরিহার্য অঙ্গ হইলেও অশক্তপক্ষে নিম্নলিখিত দ্রব্যভক্ষণে কোন দোষ হয় না :
