প্রাচীন স্মৃতির প্রমাণ অনুসরণে জীমূতবাহন ‘আধিবেদনিক’ নামক একপ্রকার স্ত্রীধনের ব্যবস্থা করিয়াছেন। পতি অপর পত্নী গ্রহণ করিলে পূর্ব পত্নীকে যে অর্থাদি অবশ্যদান করিবেন উহার নাম ‘আধিবেদনিক’। জীমূতবাহনের পরবর্তী কোন বাঙালী স্মৃতিনিবন্ধকার এই শ্রেণীর স্ত্রীধনের উল্লেখ করেন নাই। অধিকাংশ বাঙালী নিবন্ধকার বল্লালসেনের (খ্রীষ্টীয় ১২শ শতক) পরবর্তী। বল্লাল-প্রবর্তিত কৌলীন্যপ্রথার প্রবর্তনের ফলে সমাজে কুলীনগণ যে মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত হইয়াছিলেন, তাঁহার জন্য একজন কুলীননন্দন অপদার্থ হইলেও বহু স্ত্রী বিবাহ করিতেন। বহু বিবাহ এত ব্যাপক হইয়া পড়িয়াছিল বলিয়াই বোধ হয় ‘আধিবেদনিক’-এর প্রচলন লুপ্ত হইয়াছিল এবং নিবন্ধকারগণও ইহার বিধান করেন নাই।
প্রাচীন স্মৃতির ন্যায় বঙ্গীয় স্মৃতিশাস্ত্রেও অনেক ক্ষেত্রেই পতি হইতে পত্নীর পৃথক সত্তা স্বীকৃত হয় নাই। পতির সহিত বিবাহ-জনিত সম্বন্ধ ব্যতিরেকে স্থাবর সম্পত্তিতে স্ত্রীলোকের কোন অধিকার নাই। উত্তরাধিকারসূত্রে পতির সম্পত্তিতে স্ত্রীর যখন অধিকার জন্মে, তখনও তিনি মাত্র ভোগের অধিকারিণী; ঐ সম্পত্তিতে তাঁহার দান বিক্রয় করিবার অধিকার থাকে না। বিশিষ্ট কতক প্রকার স্ত্রীধনে স্ত্রীলোকের সম্পূর্ণ স্বত্ব স্বীকৃত হইয়াছে।
কোন কন্যা যদি বিবাহের পূর্বেই পিতৃহীন হন, তাহা হইলে তাহাকে বিবাহ দেওয়ার দায়িত্ব তাঁহার ভ্রাতার। এইরূপ ক্ষেত্রে, প্রাচীন স্মৃতি অনুসারে, ভ্রাতা বা ভ্রাতৃগণ ‘তুরীয়ক অংশ’ দান করিয়া বিবাহের ব্যয়ভার বহন করিবেন। যাজ্ঞবল্ক্যর টীকাকার বিজ্ঞানেশ্বরের মতে তুরীয়ক’ শব্দের অর্থ কন্যা পুত্র হইলে পৈতৃক সম্পত্তির যে অংশ লাভ করিতেন তাঁহার চতুর্থাংশ। ‘তুরীয়’-পদের আভিধানিক অর্থও এক-চতুর্থাংশ। জীমূতবাহন ও রঘুনন্দন ‘তুরীয়ক’ পদের অর্থ করিয়াছেন বিবাহোচিত দ্রব্যাদি; ইহা হইতে মনে হয়, বাঙালী স্মার্ত পৈতৃক সম্পত্তিতে কন্যার কোন প্রকার অংশের কল্পনা করিতেও কুণ্ঠিত।
স্বামীর নিকট হইতে পৃথক অবস্থান, ঘুরিয়া বেড়ান, অসময়ের নিদ্রা, অপরের গৃহে বাস প্রভৃতি স্ত্রীলোকের পক্ষে অতিশয় নিন্দনীয়। পতি বিদেশে থাকিলে নারী তাঁহার মঙ্গল প্রার্থনা করিবেন এবং অতিরিক্ত সাজসজ্জা বর্জন করিবেন; কিন্তু সম্পূর্ণরূপে অসজ্জিতা থাকিবেন না, কারণ ঐরূপ অবস্থায় থাকিলে তাহাকে বিধবার ন্যায় মনে হইবে।
স্ত্রীলোকের স্বাতন্ত্র নাই–মনুর এই নির্দেশ অনুসারে স্মৃতিকারগণ যে শুধু ইহলোকে নারীর পতি হইতে স্বাতন্ত্র্য অস্বীকার করিয়াছেন, তাহা নহে, পরলোকেও পতি পত্নীর আত্মার স্বতন্ত্র সত্তা স্বীকার করিতে তাঁহারা কুণ্ঠিত। প্রমাণবলে বঙ্গীয় স্মার্তগণ ব্যবস্থা করিয়াছেন যে, স্ত্রীলোকের মৃত্যুতিথি ভিন্ন অন্য সময়ে তদীয় আত্মার উদ্দেশ্যে পৃথক্ পিণ্ডদান বিধেয় নহে। মৃত্যুতিথি ভিন্ন অন্য সময়ে নিজ নিজ পতির উদ্দেশ্যে প্রদত্ত পিণ্ড হইতেই তাঁহারা স্বীয় অংশ গ্রহণ করিবেন।
বঙ্গীয় স্মৃতিনিবন্ধকারগণের মধ্যে রঘুনন্দনপূর্বযুগের শূলপাণি ও শ্রীনাথ ‘ভ্রাতৃমতী’ কন্যাকে বিবাহ করিতে বলিয়াছেন; ইহার তাৎপর্য এই যে, কন্যা ভ্রাতুমতী হইলে তাঁহার পুত্রিকাপুত্র হইবার আশঙ্কা থাকে না। ‘পুত্রিকাপুত্র’ শব্দটির অর্থ দ্বিবিধ। একটি অর্থে, যে পুত্রিকা সেই পুত্র; অর্থাৎ পুত্রহীন ব্যক্তি কন্যাকেই স্বীয় পুত্ররূপে মনোনীত করিতে পারেন। অপর অর্থে, তিনি সঙ্কল্প করিতে পারেন যে, কন্যার গর্ভে যে পুত্রসন্তান জন্মিবে সে-ই তাঁহার পুত্রস্বরূপ হইবে। মনে হয়, শূলপাণি শ্রীনাথের যুগেও বাংলা দেশে পুত্রিকাপুত্রের প্রচলন ছিল। ইহাদের মতে, পুত্রিকাপুত্রত্বের আশঙ্কা না থাকিলে ভ্রাতৃহীনা কন্যা বিবাহযোগ্যা।
প্রাচীন স্মৃতির অনুসরণক্রমে বঙ্গীয় স্মার্তগণ পৌনর্ভবা কন্যাকে বিবাহের বর্জনীয়া বলিয়া ব্যবস্থা করিয়াছেন। নিম্নলিখিত সাত প্রকার কন্যা পৌনর্ভবা বলিয়া অভিহিত–(১) বাগদত্তা, (২) মনোদত্তা, (৩) কৃতকৌতুকমঙ্গলা, (৪) উদকস্পর্শিতা, (৫) পাণিগৃহীতা, (৬) অগ্নিপরিগতা, (৭) পুনর্ভূভবা। এই বিধান হইতে দেখা যায়, বিধবা ত দূরের কথা, একজনের উদ্দেশ্যে বাগদত্তা কন্যাও অপরের পক্ষে বিবাহের অযোগ্য।
বঙ্গীয় স্মৃতিকারগণের মতে, স্ত্রীর কয়েকটি গুরুতর অপরাধ ছাড়া তাঁহার সঙ্গে স্বামীর সম্পূর্ণরূপে বিচ্ছেদ হয় না। সগোত্রা কন্যার বিবাহ তীব্রভাবে নিন্দিত হইয়াছে। অজ্ঞতাবশতঃ সগোত্রা কন্যাকে বিবাহ করিলে তাঁহার উপর স্বামীর দাম্পত্যাধিকার থাকিবে না। সজ্ঞানে এইরূপ বিবাহের জন্য পত্নীর বর্জন ও চান্দ্রায়ণ প্রায়শ্চিত্ত বিধেয়; কিন্তু এই সকল ক্ষেত্রেই স্ত্রীর ভরণপোষণ স্বামীর অবশ্যকর্তব্য; সুতরাং বিবাহবন্ধন সম্পূর্ণরূপে ছিন্ন হয় না। নিম্নতর বর্ণের ব্যক্তির সহিত সহবাসের ফলে স্ত্রীর গর্ভোৎপত্তি, শিষ্য বা পুত্রের সহিত সহবাস হেতু স্ত্রীর গর্ভোৎপত্তি, স্ত্রীর অন্যবিধ হীন ব্যসনে আসক্তি বা তৎকর্ত্তৃক ধননাশ–এই কয়েকটি ক্ষেত্রে বিবাহবন্ধনের সম্পূর্ণ ছেদন বঙ্গীয় স্মার্তগণের অনুমোদিত বলিয়া মনে হয়। প্রথমোক্ত অপরাধের জন্য স্ত্রী পরিত্যাজ্যা, এমন কি বধ্যাও। উক্তরূপ সহবাসাদির ফলে স্ত্রী যতক্ষণ গর্ভবতী না হইবেন, ততক্ষণ তিনি প্রায়শ্চিত্ত দ্বারা দোষমুক্ত হইতে পারেন। ব্যভিচারিণী পত্নীর ভরণপোষণের কোন ব্যবস্থা দেখা যায় না। ইহা হইতে মনে হয়, স্ত্রীর ব্যভিচারই একমাত্র অপরাধ যাহার ফলে সম্পূর্ণরূপে বিবাহ-বিচ্ছেদ সম্ভবপর।
