আইনকানুনের ক্ষেত্রেও ব্রাহ্মণগণের স্ববর্ণ-পক্ষপাতিত্ব এবং শূদ্রের প্রতি বৈষম্যমূলক ব্যবস্থা পরিস্ফুট। রাজা স্বয়ং বিচারকার্য পরিদর্শন করিতে অক্ষম হইলে তিনি প্রতিনিধি নিযুক্ত করিবেন। শাস্ত্রীয় প্রমাণ উদ্ধার করিয়া বঘুনন্দন বলিয়াছেন যে, দুঃশীল’ হইলেও দ্বিজ এইরূপ প্রতিনিধি হইতে পারেন, কিন্তু শূদ্র ‘বিজিতেন্দ্রিয়’ হইলেও এই কাব্যের অযোগ্য।
বিচারে যখন দিব্য প্রমাণের প্রয়োজন হয়, তখন সর্বাপেক্ষা কষ্টকর দিব্যের ব্যবস্থা শূদ্রের জন্য এবং দ্বিজগণের পক্ষে অপেক্ষাকৃত সহজসাধ্য দিব্য প্রযোজ্য।
পুরাণ ও তন্ত্রের প্রভাবে বঙ্গীয় স্মৃতিকারগণ ধর্ম্মাচরণে স্ত্রীলোক এবং শূদ্রকে কিছু কিছু অধিকার দিয়াছেন। তান্ত্রিক দীক্ষালাভের অধিকার স্ত্রীলোক ও শূদ্র উভয়েরই আছে। দেবীপুরাণে’ চণ্ডাল, পুক্কস প্রভুতি অন্ত্যজ জাতিকে দেবীপূজার অধিকার দেওয়া হইয়াছে। দেবীপুরাণের মতে, দেবীপূজায় উচ্চতর নিগুণ ব্যক্তি অপেক্ষা গুণবান্ শূদ্রও শ্রেয়। বঙ্গীয় স্মৃতিকারগণ দুর্গাপূজায় শূদ্রের অধিকার স্বীকার করিয়াছেন। এই প্রসঙ্গে উল্লেখযোগ্য এই যে, বর্ণাশ্রমবহির্ভূত ম্লেচ্ছগণ হিন্দুর অপর কোন পূজাপার্ব্বণের অধিকারী না হইলেও দুর্গাপূজায় তাহাদিগকে অধিকার দেওয়া হইয়াছে।
চারিটি প্রধান বর্ণ ছাড়াও বাংলা দেশে বহু সঙ্কর বর্ণের বাস ছিল। খ্ৰীষ্টীয় এয়োদশ শতকের শেষভাগে বা তাঁহার কিঞ্চিৎ পরবর্তী কালে বাংলা দেশে রচিত বলিয়া বিবেচিত ‘বৃহদ্ধর্ম্মপুরাণে’ (৩১৩) ছত্রিশটি সঙ্কর বর্ণ বা মিশ্র জাতির উল্লেখ আছে। [বাংলা দেশের ইতিহাস, প্রথম খণ্ড (তৃতীয় সং) ১৭৬ পৃ.]
ব্রহ্মচর্য, গার্হস্থ্য, বানপ্রস্থ ও সন্ন্যাস চতুরাশ্রম, এই ক্রমই বঙ্গীয় স্মৃগ্রিন্থসমূহে স্বীকৃত হইয়াছে। কোন একটি আশ্রমে মানুষকে থাকিতে হইবে, কারণ অনাশ্রমী ব্যক্তি অনেক ধর্মকার্যাদি করিবার অযোগ্য। এই প্রসঙ্গে রঘুনন্দনের একটি বিধান উল্লেখযোগ্য। গৃহিণীই গৃহ; সুতরাং, বিবাহের দ্বারা গার্হস্থ্যাশ্রমে প্রবেশ লাভ করা যায়। তাহা হইলে দেখা যায়, বিপত্নীক ব্যক্তি গার্হস্থ্যাশ্রমচ্যুত হয়। কিন্তু, পরিণত বয়সে কেহ বিপত্নীক হইলে তিনি বিবাহ করিতে পারিবেন না; ফলে আমরণ তাঁহাকে অনাশ্রমী থাকিতে হইবে। এই সমস্যার সমাধানকল্পে রঘুনন্দন শাস্ত্রীয় প্রমাণবলে বিধান করিয়াছেন যে, আটচল্লিশ বৎসর বয়ঃক্রমের পরে কেহ বিপত্নীক হইলে তাহাকে বলা হইবে ‘রাশ্রমী। অতএব তিনি অনাশ্রমী বলিয়া পরিগণিত হইবেন না এবং গৃহস্থের কর্তব্যে তিনি অধিকারী হইবেন। এই ব্যবস্থা হইতে মনে হয়, উক্ত বয়সের পরে বিপত্নীক ব্যক্তির বিবাহ তাঁহার অনুমোদিত ছিল না।
৫। নারীর স্থান : বৈদিক যুগে শাস্ত্রাদির চর্চ্চা এবং ধর্ম্মানুষ্ঠান প্রভৃতি কিছুতেই নারীর অধিকার পুরুষের তুলনায় কম ছিল বলিয়া মনে হয় না। বেদে বহু ব্রহ্মবাদিনী স্ত্রী-ঋষির নাম ও তাঁহাদের নামাঙ্কিত সূক্তাদি পাওয়া যায়। উপনিষদেও বিদুষী মহিলাগণ পুরুষগণের সঙ্গে শাস্ত্রীয় বিচারাদিতে অংশ গ্রহণ করিতেন বলিয়া জানা যায়। পরবর্তীকালে কিন্তু এই সকল ব্যাপারে স্ত্রীলোকের অধিকার সম্বন্ধে বৈষম্যমূলক ব্যবস্থা সহজেই আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। স্মৃতিশাস্ত্রের প্রামাণ্য গ্রন্থ ‘মনুসংহিতা’তেই বলা হইয়াছে যে, নারীর পৃথকভাবে করণীয় কোন যাগযজ্ঞ ব্রত উপবাসাদি কিছুই নাই; একমাত্র পতিসেবাই তাঁহার পরম ধর্ম এবং পতি ভিন্ন। তাঁহার যেন কোন সত্তাই নাই। পুরাণগুলিতে আবার অধিকাংশ ব্রতানুষ্ঠানে স্ত্রীলোকেরই অধিকার ঘোষণা করা হইয়াছে; ইহার যথেষ্ট ঐতিহাসিক কারণও বিদ্যমান।
অন্যান্য প্রদেশের স্মৃতিনিবন্ধগুলির ন্যায় বঙ্গীয় স্মৃতিগ্রন্থসমূহেও একদিকে যেমন আছে প্রাচীন স্মৃতির প্রভাব, অপরদিকে তেমনই রহিয়াছে পুরাণের প্রভাব। সুতরাং ব্ৰতাদি ব্যতীত অন্যপ্রকার ধর্ম্মানুষ্ঠানে স্মৃতিনিবন্ধকার স্ত্রীলোককে অধিকার দিয়াছেন বলিয়া মনে হয় না। ব্ৰতাদিতে পতির অনুমতিক্রমে নারীর অধিকার বঙ্গীয় স্মৃতিশাস্ত্রে স্বীকৃত হইয়াছে।
তান্ত্রিক দীক্ষায় কিন্তু বাঙালী শাস্ত্রকার স্ত্রীলোকের অধিকার স্বীকার করিয়াছেন। বাংলাদেশে কুমারীপূজার প্রথা এখনও প্রচলিত আছে। ইহা তান্ত্রিক প্রথা। তন্ত্রসারে কৃষ্ণানন্দ প্রমাণবলে বলিয়াছেন যে, কুমারীপূজা ব্যতিরেকে হোমাদির সম্পূর্ণ ফল পাওয়া যায় না। এক বৎসর হইতে ষোড়শবর্ষ পর্যন্ত বয়স্কা কুমারী পূজিতা হইতে পারে। মহাপদিনে, বিশেষতঃ মহানবমী তিথিতে, কুমারীপূজা অবশ্যকর্তব্য। দেবীপুরাণের মতে, কুমারী কন্যা স্বয়ং দেবীর মূর্ত প্রতীক; সুতরাং, দেবীপূজায় কুমারী পূজা অবশ্যকরণীয়। এই পুরাণে নারী মাত্রেই সবিশেষ শ্রদ্ধার পাত্র।
নারীর প্রতি সমাজের যে চিরন্তন শ্রদ্ধা ও অনুকম্পা, বঙ্গীয় স্মৃতিশাস্ত্রে তাঁহার ব্যতিক্রম দেখা যায় না। একই অপরাধের জন্য পুরুষ অপেক্ষা নারীর লঘুতর দণ্ডের বিধান দেখা যায়। পাপক্ষয়জনক প্রায়শ্চিত্তও স্ত্রীলোকের পক্ষে লঘুতর।
বঙ্গীয় স্মৃতিশাস্ত্রনিবন্ধে রজোদর্শনের পূর্বেই কন্যার বিবাহ অবশ্যকরণীয় বলিয়া নির্দেশ আছে; রজোদর্শনের পরে কন্যার পিত্রালয়ে বাস অতিশয় পাপজনক বলিয়া নিন্দিত হইয়াছে। কিন্তু, ইহাও বলা হইয়াছে যে অপাত্রে বিবাহ অপেক্ষা কন্যার আমরণ পিত্রালয়ে বাসও শ্রেয়। সাধারণতঃ জ্যেষ্ঠা কন্যার পূর্বে কনিষ্ঠা কন্যার বিবাহ তীব্রভাবে নিন্দিত হইয়াছে। কিন্তু রঘুনন্দন স্পষ্টই বলিয়াছেন যে, কুরূপত্বাদি হেতু জ্যেষ্ঠা কন্যার বিবাহে বিলম্ব হইলে কনিষ্ঠার বিবাহে কোন দোষ নাই।
