জ্যোষ্ঠা ভগ্নীর বিবাহের পূর্বে কনিষ্ঠার বিবাহও অত্যন্ত নিন্দনীয়।
৩। পাপ ও প্রায়শ্চিত্ত : পাপ দুই প্রকার–বিহিত কর্ম না করা এবং নিন্দিত কর্ম করা। পাপের ফলও দুই প্রকার–মৃত্যুর পর নরকে বাস অথবা জীবিত কালে পান, ভোজন ও বিবাহাদি ব্যাপারে সমাজে অচল হইয়া থাকা। ইচ্ছাকৃত বা অনিচ্ছাকৃত এই উভয়বিধ পাপের প্রায়শ্চিত্তের ফল সম্বন্ধে যাজ্ঞবল্ক্যস্মৃতি’র একটি বচন (৩।৫।২২৬) বিতর্কের সৃষ্টি করিয়াছে। বচনটি এই :
প্রায়শ্চিত্তৈরপৈত্যেনো যদজ্ঞানকৃতং ভবেৎ।
কামতো ব্যবহার্য বচনাদিহ জায়তে ॥
দ্বিতীয় পংক্তিতে ‘ব্যবহার্য’ পদের স্থলে ‘অব্যবহার্য’ পাঠ ধরিয়া শূলপাণি শ্লোকটির অর্থ করিয়াছেন যে, অজ্ঞানকৃত পাপ প্রায়শ্চিত্তের দ্বারা দূরীভূত হয়; কিন্তু জ্ঞানকৃত পাপ ইহা দ্বারা অপগত হইলেও পাপকর্মকারী সমাজে অব্যবহার্য থাকিবে।
প্রায়শ্চিত্ত শব্দটি প্রায়’ ও ‘চিত্ত’ এই দুইটি পদের দ্বারা গঠিত; ‘প্রায়’ অর্থাৎ তপ ও ‘চিত্ত’ বলিতে বুঝায় নিশ্চয়। অতএব প্রায়শ্চিত্ত শব্দে বুঝায় এমন তপশ্চর্যা যাহাদ্বারা পাপক্ষালন হইবে বলিয়া নিশ্চিতভাবে জানা যায়। প্রাচীন শাস্ত্রীয় প্রমাণমূলে রঘুনন্দন মনোজ্ঞ উপমার সাহায্যে প্রায়শ্চিত্তের ফল বুঝাইবার চেষ্টা করিয়াছেন। তিনি বলিয়াছেন–
ক্ষার, উত্তাপ, প্রচণ্ড আঘাত ও প্রক্ষালনের ফলে যেমন মলিন বস্ত্র পরিষ্কৃত হয়, তেমন ভাবেই তপশ্চর্যা, দান ও যজ্ঞের দ্বারা পাপী পাপমুক্ত হয়।
পাপকারীর বয়স, বর্ণ, সে পুরুষ বা স্ত্রী ইত্যাদি বিচেনায় প্রায়শ্চিত্তের তারতম্য হয়।
ব্ৰহ্মহত্যা, সুরাপান, ভেয়, গুবঙ্গনাগমন এবং এই চতুর্বিধ পাপাঁচরণকারীর সহিত সংসর্গ-–এই পাঁচটি মহাপাতক বা গুরুতর পাপ বলিয়া স্বীকৃত হইয়াছে। দ্বিজবর্ণের কোন ব্যক্তি সজ্ঞানে সুরাপান করিলে মৃত্যুই তাঁহার প্রায়শ্চিত্ত; বিকল্প ব্যবস্থানুসারে চতুর্বিংশতিবার্ষিক ব্রত অনুষ্ঠেয়। ব্রাহ্মণ কর্ত্তৃক অজ্ঞানে সুরাপানের প্রায়শ্চিত্ত দ্বাদশবার্ষিক ব্রত; তাহা সম্ভবপর না হইলে ১৮০টি দুগ্ধবতী গাভী দান।
নরহত্যা প্রসঙ্গে বলা হইয়াছে যে, শুধু হত্যাকারীই দোষী নহে। নিম্নলিখিত ব্যক্তিগণও অপরাধী :
(১) অনুমন্তা–(ক) যে হত্যাকারীকে এই বলিয়া আশ্বাস দেয় যে, অপর যে ব্যক্তি বাধা দিলে হত্যা সম্ভবপর হইবে না তাহাকে সে রোধ করিবে। (খ) যে হত্যাকারীকে বিরত করিবার চেষ্টা করে না।
(২) অনুগ্রাহক–(ক) যে বধ্য ব্যক্তিকে অন্যমনস্ক করে। (খ) বধ্যব্যক্তির সাহায্যার্থে আগমনকারী ব্যক্তিকে যে বাধা দেয়।
(৩) নিমিত্তী–(ক) যৎকর্ত্তৃক ক্রোধোৎপাদন হেতু কোন ব্যক্তি স্বীয় প্রাণনাশে কৃতসঙ্কল্প হয়।
(৪) প্রযোজক–(ক) যে অনিচ্ছুক ব্যক্তিকে হত্যায় প্রবৃত্ত করে। (খ) হত্যায় প্রবৃত্ত ব্যক্তিকে যে উৎসাহ দেয়।
কোন ব্যক্তি কর্ত্তৃক সদুদ্দেশ্যে কৃত কর্মের ফলে কেহ নিহত হইলে ঐ ব্যক্তি নরহত্যার অপরাধে অপরাধী হয় না; অর্থাৎ হত্যা মাত্রই গুরুতর অপরাধ নহে, যদি তাহাতে হত্যার অভিসন্ধি না থাকে।
প্রায়শ্চিত্ত প্রসঙ্গে বঙ্গীয় স্মৃতিশাস্ত্রে তন্ত্রতা ও প্রসঙ্গ নামক দুইটি নীতি স্বীকৃত হইয়াছে। একই প্রকার পাপাঁচরণ পুনঃ পুনঃ করিয়া এবার মাত্র প্রায়শ্চিত্ত করিলেই পাপমুক্ত হওয়া যায়-এই নীতির নাম তন্ত্রতা। এক ব্যক্তি গুরুতর ও লঘুতর পাপ করিয়া গুরুতর পাপের প্রায়শ্চিত্ত করিলেই লঘুতর পাপ হইতেও মুক্ত হইবে-এই নীতির নাম প্রসঙ্গ।
পূর্বে বলা হইয়াছে যে, মহাপাতকীর সংসর্গেও মহাপাতক জন্মে। নিম্নলিখিতরূপ সংসর্গ পাপজনক :–
এক শয্যায় শয়ন, একাসনে উপবেশন, এক পংক্তিতে অবস্থান, ভাণ্ড বা পক্বান্নের মিশ্রণ, পাতকীর জন্য যজ্ঞসম্পাদন, অধ্যাপক, সহভোজন,
বৈবাহিক বা যৌনসম্পর্ক, ভাষণ, স্পর্শন সহযান ইত্যাদি। পাতকীর জন্য যজ্ঞসম্পাদন, পাতকীর সহিত বৈবাহিক বা যৌন সংসর্গ, পাতকীর উপনয়ন ও পাতকীর সহভোজন–এইরূপ সংসর্গ সদ্য পাতিত্যজনক। নিম্নলিখিতরূপ সংসর্গ একবৎসর কালের জন্য হইলে পাতিত্যজনক হয় :
পাতকীর সহিত এক পংক্তিতে ভোজন, একাসনে উপবেশন, এক শয্যায় শয়ন ও সহযান।
প্রাচীন স্মৃতির প্রমাণানুসারে বঙ্গীয় স্মৃতিতে অতিকৃচ্ছ, চান্দ্রায়ণ, তপ্তকৃচ্ছ, পরাক, প্রাজাপত্য, সান্তপন প্রভৃতি বিবিধ প্রায়শ্চিত্তমূলক ব্রতের ব্যবস্থা আছে। নানা কারণে এইরূপ ব্ৰতানুষ্ঠান সকলের পক্ষে সম্ভবপর নহে বলিয়া ধেনুসঙ্কলন বা ব্রতের পরিবর্তে ব্রাহ্মণকে ধেনুদানের ব্যবস্থা আছে; ব্রতভেদে দেয় ধেনুর সংখ্যা বিভিন্নরূপ।
৪। বর্ণাশ্রম-ব্যবস্থা : হিন্দুসমাজ ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য ও শূদ্র এই চতুর্বর্ণের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত। এই চারিবর্ণের জন্যই বঙ্গীয় স্মৃতিনিবন্ধসমূহে বিধিনিষেধ লিপিবদ্ধ আছে। এই প্রসঙ্গে বিশেষভাবে লক্ষণীয় এই যে, জীবনের প্রতি পদক্ষেপেই ব্রাহ্মণবর্ণের প্রাধান্য স্থাপনের প্রয়াস স্মৃতিনিবন্ধগুলির পাতায় পাতায় রহিয়াছে। ব্রাহ্মণ উচ্চতম বর্ণ। কিন্তু অপর দুইটি দ্বিজবর্ণের, অর্থাৎ ক্ষত্রিয় ও বৈশ্যের তুলনায়ও শূদ্রের স্থান সমাজে অতিশয় হেয়।
শূদ্রের বেদপাঠের অধিকার নাই এবং বিভিন্ন সংস্কারের মধ্যে এক বিবাহ ভিন্ন অন্য কোন সংস্কারে শূদ্র অধিকারী নহে। অপর সকল বর্ণেরই স্বকীয় গোত্র আছে, কিন্তু শূদ্রের নিজস্ব কোন গোত্র নাই। উচ্চবর্ণের কোন ব্যক্তি কতক প্রকার হেয় কার্য করিলে শূদ্রবৎ পরিগণিত হইবেন। যেমন ঋতুমতী কন্যাকে বিবাহ করিলে তাঁহার পতি শূদ্রতুল্য বলিয়া পরিগণিত হইবেন; তাঁহার সহিত কথোপকথনও নিন্দনীয় হইবে। কয়েকটি মাত্র দ্রব্য ভিন্ন ক্ষুদ্র কর্ত্তৃক প্রস্তুত খাদ্যদ্রব্য ব্রাহ্মণের পক্ষে নিষিদ্ধ। বিনা জলে শূদ্রপক্ব এবং শূদ্র কর্ত্তৃক প্রস্তুত ক্ষীর ব্রাহ্মণ ভোজন করিতে পারেন। রঘুনন্দনের মতে, শূদ্র কর্ত্তৃক প্রস্তুত দধি ও শক্ত ব্রাহ্মণের ভক্ষ্য।
