বঙ্গীয় স্মৃতিনিবন্ধসমূহে বিবিধ দশমীকৃত্যের মধ্যে শবরোৎসবের ব্যবস্থা আছে। এই ব্যবস্থানুসারে জনগণ পরস্পরকে অশ্রাব্য ভাষায় গালাগালি করিবে। যে এইরূপ গালাগালি অপরকে করিবে না এবং যাহাতে অপরে গালাগালি করিবে না, তাহারা উভয়েই দেবীর বিরাগভাজন হইবে। ‘শবরোৎসব’ শব্দটির তাৎপর্য বিশ্লেষণ প্রসঙ্গে জীমূতবাহন বলিয়াছেন যে, ইহাতে শবরের ন্যায় সমস্ত শরীর পত্রাদি দ্বারা আবৃত ও কর্দমলিপ্ত করিয়া গীত ও বাদ্য করিতে হয়।
বঙ্গীয় স্মৃতিশাস্ত্রকারগণের মতে, বিভিন্ন মাসে নিম্নলিখিত ধর্ম্মানুষ্ঠান ও আচার প্রধান :
বৈশাখ–প্রাতঃস্নান, ব্রাহ্মণকে জলঘটদান, মসূরসহ নিষপত্র ভক্ষণ, বিষ্ণুকে শীতলজলে স্নান করান।
জ্যৈষ্ঠ–অরণ্যষষ্ঠী, সাবিত্রীব্রত ও দশহরা।
আষাঢ়–চাতুর্মাস্য ব্রত।
শ্রাবণ–মনসাপূজা।
ভাদ্র–জন্মাষ্টমীব্রত ও অনন্তব্রত।
আশ্বিন–দুর্গাপূজা, কোজাগরী লক্ষ্মীপূজা।
কার্তিক–প্রাতঃস্নান, দীপান্বিতায় দিনে উপবাস ও পার্ব্বণশ্রাদ্ধ, সন্ধ্যায় পিতৃপুরুষের উদ্দেশ্যে উল্কাদান প্রভৃতি; দূতপ্রতিপদ, ভ্রাতৃদ্বিতীয়া।
অগ্রহায়ণ–নবান্নশ্রাদ্ধ।
পৌষ–এই মাসে উল্লেখযোগ্য কোন অনুষ্ঠানের বিধান নাই।
মাঘ–রটম্ভীচতুর্দশী, শ্রীপঞ্চমীতে সরস্বতীপূজা, মাঘী সপ্তমীতে প্রাতঃস্নান ও সূর্যোপাসনা, বিধানসপ্তমীব্রত, আরোগ্যসপ্তমীব্রত, ভীষ্মষ্টমীতে ভীষ্মপূজা।
ফাল্গুন–শিবরাত্রিব্রত।
চৈত্র–শীতলাপূজা, বারুণীস্নান, অশোকাষ্টমী, রামনবমীব্রত, মদনত্রয়োদশী ও মদনচতুর্দশী তিথিতে পুত্রপৌত্রাদির সৌভাগ্য কামনায় এবং সমস্ত বিপথ হইতে ত্রাণলাভের আকাঙ্ক্ষায় মদনদেরের পূজা কর্তব্য। রঘুনন্দনের মতে, এই পূজায় মদনদেরের প্রীত্যর্থে অশ্লীল ভাষার প্রয়োগ বিধেয়।
বর্তমান প্রসঙ্গ শেষ করিবার পূর্বে কয়েকটি তান্ত্রিক অনুষ্ঠানের কথা বলা আবশ্যক। ‘তন্ত্রসারে’ শত্রুর অনিষ্টকল্পে বিদ্বেষণ, উচ্চাটন, অভিচার প্রভৃতি কতক অনুষ্ঠানপদ্ধতি লিপিবদ্ধ আছে। বশীকরণ পদ্ধতিও এই গ্রন্থে আলোচিত হইয়াছে। এই সকল অনুষ্ঠানে জনসাধারণের বিশ্বাস ও আচার-আচরণ প্রতিফলিত হইয়াছে।
শ্রাদ্ধ হিন্দুগণের একটি বিশেষ ধর্ম্মানুষ্ঠান। শ্রাদ্ধ বলিতে ঠিক কি বুঝায়, এই সম্বন্ধে বাঙালী স্মৃতিকারগণ প্রাচীন স্মৃতির বচনাদি আলোচনা করিয়া নিজস্ব সংজ্ঞা নির্দেশ করিয়াছেন। শূলপাণির মতে, সম্বোধন পদের দ্বারা আহূত উপস্থিত পিতৃপুরুষগণের উদ্দেশ্যে হবিত্যাগের নাম শ্রাদ্ধ। রঘুনন্দন বলিয়াছেন যে, বৈদিক প্রয়োগাধীন আত্মার উদ্দেশ্যে শ্রদ্ধাপূর্বক অন্নাদি দানের নাম শ্রাদ্ধ। শ্রাদ্ধের উপযুক্ত স্থান ও সময়, শ্রাদ্ধকর্ত্তার পক্ষে বর্জনীয় কর্ম, শ্রাদ্ধে নিমন্ত্রণযোগ্য ব্যক্তি, শ্রাদ্ধে। দেয় অথবা বর্জনীয় খাদ্যদ্রব্য, শ্রাদ্ধের অধিকারী ব্যক্তি-ইত্যাদি বিষয়ে নিয়মাবলী স্মৃতিশাস্ত্রে বিস্তৃতভাবে লিখিত আছে।
২। নীতিবোধ : বঙ্গীয় স্মৃতিকারগণ বিবিধ ব্যসনকে তীব্রভাবে নিন্দা করিয়াছেন। অবৈধ যৌনসম্বন্ধের প্রতি তাঁহাদের দৃষ্টি সতর্ক। এইরূপ সম্বন্ধের মধ্যে গুর্বঙ্গনাগমন সর্বাপেক্ষা নিন্দিত। ‘গুর্বঙ্গনা’ শব্দের অর্থ, বাংলাদেশের স্মৃতিকারগণের মতে, মাতা। মাতার সপত্নী, ভগ্নী, আচাৰ্যকন্যা, আচাৰ্যানী এবং স্বীয় কন্যা প্রভৃতির সহিত যৌনসংসর্গও গুবঙ্গনাগমনের তুল্য। যে কোন লোকের পক্ষে নিঃসম্পর্কিত ব্যক্তির স্ত্রী, নিম্নতরবর্ণের স্ত্রীলোক, রজকপত্নী, রজস্বলা নারী ও গর্ভবতী নারীর সহিত সহবাস এবং ব্রহ্মচারীর পক্ষে যে কোন নারীর সহিত সহবাস প্রায়শ্চিত্তাহঁ; কিন্তু গুবঙ্গনাগমনজনিত পাপের তুলনায় ইহাদের সঙ্গে যৌনসম্পর্কের পাপ লঘুতর; গো প্রভৃতি ইতর প্রাণীর সহিত যোনিসম্পর্কও পাপজনক বলিয়া গণ্য হইয়াছে।
আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গীতে যাহা নীতিবিগর্হিত এমন কতক ব্যাপার এই দেশের স্মৃতিকারগণের সমর্থন লাভ করিয়াছিল বলিয়া মনে হয়। দাসী ও অবিবাহিতা নারীর সহিত যৌনসংযোগ অন্ততঃ শূদ্রের পক্ষে অবৈধ বিবেচিত হইত না বলিয়া মনে হয়; কারণ, ‘দায়ভাগে’ (৯।২৯) জীমূতবাহন শূদ্রের ঔরসে ও দাসীর অথবা অপর অবিবাহিতা নারীর গর্ভে জাত পুত্রের জন্য পিতার অনুমতিক্রমে পৈতৃক সম্পত্তির একটি ভাগের ব্যবস্থা করিয়াছেন। সুতরাং, দেখা যায় এইরূপ জারজ পুত্র সমাজে স্বীকৃত হইত।
প্রাচীন স্মৃতির অনুসরণে বঙ্গীয় স্মৃতিতেও বিবাহ-বন্ধন অত্যন্ত সুদৃঢ় বলিয়া বিবেচিত হইয়াছে। স্ত্রীর একমাত্র অসতীত্ব ভিন্ন অপর কোন কারণে পতি তাহাকে সম্পূর্ণরূপে পরিত্যাগ করিতে পারিতেন না। স্ত্রী অপর কতক অপরাধে তিনি পতির সহাবস্থানে বঞ্চিত হইতেন বটে, কিন্তু গ্রাসাচ্ছাদনে বঞ্চিত হইতেন না।
দুর্গাপূজা প্রসঙ্গে শবরোৎসবের উল্লেখ পূর্বে করা হইয়াছে। অশ্রাব্য ভাষায় গালাগালি এই উৎসবের অঙ্গ। মনে হয়, ইহা অনার্য প্রভাবের একটি নিদর্শন।
জ্যেষ্ঠভ্রাতার পূর্বে কনিষ্ঠ ভ্রাতার বিবাহ বাঙালী স্মৃতিকারগণ গুরুতর অপরাধ বলিয়া গণ্য করিয়াছেন। এইরূপ বিবাহ এত পাপজনক যে, ইহার সঙ্গে সংযুক্ত সকলেই, এমন কি পুরোহিত পর্যন্ত, পতিত হইবেন। জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা যদি পতিত বা বেশ্যাসক্ত, দুরারোগ্য ব্যাধিযুক্ত এবং মূক, অন্ধ, বধির প্রভৃতি না হন, তাহা হইলে তাঁহার অনুমতিক্রমে বিবাহ করিলেও কনিষ্ঠ ভ্রাতা অপরাধী হইবেন। বিধবা-বিবাহ ত দূরের কথা; একজনের উদ্দেশ্যে বাগদত্তা কন্যাও অপরের বিবাহের অযোগ্যা।
