এখানে একটি কথা বলা আবশ্যক। স্মৃতি নিবন্ধাদিতে যে সকল বিধিনিষেধ। আছে, উহাদের কতটুকু প্রাচীনতর শাস্ত্রের প্রতিধ্বনিমাত্র এবং কতটুকু তদানীন্তন সমাজের প্রতিচ্ছবি তাহা নির্ণয় করা দুরূহ এবং প্রায় অসম্ভব বলিলেও অত্যুক্তি হয় না।
সুতরাং সমসাময়িক বাংলা সাহিত্যে হিন্দুধর্ম ও সমাজের যে বাস্তব চিত্র প্রতিফলিত হইয়াছে তাহা পৃথকভাবে পরে আলোচিত হইবে।
১। ধর্মচর্যা : বাংলা দেশের স্মৃতিনিবন্ধগুলি হইতে মনে হয়, বাঙালীর জীবনে বার মাসেই পূজা পার্ব্বণ লাগিয়া থাকিত। লক্ষ্য করিবার বিষয় এই যে, বাংলা দেশে মধ্যযুগে বৈদিক যাগযজ্ঞাদির বিশেষ প্রচলন দেখা যায় না। সমাজে ব্রতানুষ্ঠানের ব্যাপক প্রচলন ছিল; এই ব্রত সংক্রান্ত আচার-আচরণে, বিশেষতঃ স্নানদানাদির ক্ষেত্রে পুরাণের যথেষ্ট প্রভাব দেখিতে পাওয়া যায়। বঙ্গীয় স্মৃতিনিবন্ধসমূহে, বিশেষতঃ শূলপাণি হইতে রঘুনন্দন ও গোবিন্দানন্দের কাল পর্যন্ত রচিত গ্রন্থগুলিতে, তন্ত্রের প্রগাঢ় প্রভাব দেখা যায়। বাংলা দেশের পূজাপার্ব্বণে তান্ত্রিক মন্ত্রের প্রয়োগ, তান্ত্রিক মণ্ডল, মুদ্রা, যন্ত্র প্রভৃতির ব্যবহার লক্ষণীয় বৈশিষ্ট্য। জীবনে তান্ত্রিক দীক্ষার অপরিহার্যতাও এই দেশে স্বীকৃত হইয়াছিল।
সমাজে যে সকল সম্প্রদায়ের প্রভাব ছিল, তন্মধ্যে প্রধান শৈব, শাক্ত ও বৈষ্ণব। এই তিনটি প্রধান সম্প্রদায় ছাড়াও বাংলা দেশে সৌর, গাণপত্য, পাশুপত, পাঞ্চরাত্র, কাঁপালিক, কৌল প্রভৃতি বহু সম্প্রদায় বিদ্যমান ছিল। কোন কোন গ্রন্থে বৌদ্ধ, জৈন প্রভৃতি ধর্ম্মাবলম্বিগণেরও উল্লেখ আছে। চিরঞ্জীবের (১৭শ-১৮শ শতক) বিনোদতরঙ্গিণী’ নামক চম্পুকাব্য হইতে মনে হয়, কোন কোন স্থানে নিমন্ত্রণ উপলক্ষে সমবেত বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে ধর্ম সংক্রান্ত তর্ক বিতর্ক হইত। প্রত্যেক সম্প্রদায়েরই বিশিষ্ট আচার-আচরণ এবং স্বকীয় পূজাপার্ব্বণ পদ্ধতি প্রচলিত ছিল। শাক্তগণের মধ্যে দেবী বা শক্তির পূজা প্রধান বলিয়া গণ্য হইত। দেবীপুরাণে শক্তিপূজার বিধান বিস্তৃতভাবে আলোচিত হইয়াছে। রঘুনন্দন এই পুরাণের প্রামাণিকত্ব স্বীকার করিয়াছেন। ‘বৃহদ্ধর্ম্মপুরাণ’, ‘দেবী-ভাগবত’, ‘মহাভাগবত পুরাণ’ প্রভৃতিতে শাক্তগণের ধর্মচর্যা সম্বন্ধে বহু তথ্য নিহিত আছে।
বাংলা দেশে প্রচলিত কালীপূজার প্রবর্তক ছিলেন ‘তন্ত্রসার’-প্রণেতা কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশ। এই দেশে প্রচলিত কালীমূর্ত্তির পরিকল্পনা করিয়াছিলেন কৃষ্ণানন্দ। উক্ত ‘বৃহদ্ধর্ম্মপুরাণে’ কালীর স্তুতিচ্ছলে (৩। ১৬। ৩৭-৪৫) তাঁহাকে ‘মঙ্গলচণ্ডিকা’ আখ্যায় অভিহিত করা হইয়াছে। দেবীভাগবতে’ও (৯। ১। ৮৩ ও ৯। ৪৭। ১ ৩৭ প্রভৃতিতে) দেবীর এক রূপ হিসাবে মঙ্গলচণ্ডীর প্রশস্তি ও পূজার উল্লেখ আছে। পরবর্তী বাংলা সাহিত্যে মঙ্গলচণ্ডী অবলম্বনে বহু আখ্যান উপাখ্যান রচিত হইয়াছিল এবং মঙ্গলচণ্ডীর পূজা অদ্যাবধি এই দেশে ব্যাপকভাবে প্রচলিত আছে।
সম্ভবতঃ এই দেশে রচিত ‘পদ্মপুরাণ’ এবং ‘ব্রহ্মবৈবর্তপুরাণে’ বৈষ্ণবগণের ধর্মকর্ম সম্বন্ধে বহু তথ্য পাওয়া যায়। গৌড়ীয় বৈষ্ণবগণের নিকট রাধা কৃষ্ণের পূর্ণ শক্তি। কিন্তু, ইহাদের প্রধান উপজীব্য ‘ভাগবতপুরাণে’ রাধার স্পষ্ট উল্লেখ নাই। ব্রহ্মবৈবর্তপুরাণে রাধাকে কৃষ্ণের বিলাসকলার কেন্দ্রগত রসস্বরূপ বলিয়া বর্ণনা করা হইয়াছে।
পূজাপার্ব্বণের মধ্যে বাংলা দেশে শারদীয়া পূজা বা দুর্গাপূজা সর্বাপেক্ষা প্রাধান্য লাভ করিয়াছিল। এই দুর্গাপূজার পদ্ধতি বৃহন্নন্দিকেশ্বর’ ও ‘নন্দিকেশ্বরপুরাণ’ দ্বারা প্রভাবিত। স্ব-গৃহ, জীর্ণস্থান, ইষ্টকরচিত স্থান ও দীপস্থিতিবিবর্জিত স্থান প্রভৃতিতে দুর্গাপূজা নিষিদ্ধ ‘স্বগৃহ’ শব্দের অর্থ বোধ হয় নিজের বাসের ঘর। শূলপাণির মতে, ইষ্টকরচিত স্থানে মৃত্তিকাবেদির উপরে দুর্গাপূজা হইতে পারে।
দুর্গার মূর্ত্তি হইবে দশভুজা এবং সিংহহাপরি স্থাপিতা। মূর্ত্তি সাধারণতঃ মৃন্ময়ী হইত। কিন্তু অন্য উপাদানের দ্বারাও উহা নির্মিত হইত বলিয়া মনে হয়; কারণ শূলপাণি বলিয়াছেন যে, মৃন্ময়ী প্রতিমাপক্ষে দেবীর স্নান দর্পণে বিধেয় এবং মূর্ত্তি স্নানযোগ্য হইলে স্নান প্রতিমাতেই করণীয়। সাত্ত্বিকী, রাজসী ও তামসী–এই ত্রিবিধ পূজাই বঙ্গীয় স্মৃতিকারগণের অনুমোদিত বলিয়া মনে হয়। সাত্ত্বিকী পূজায় থাকিবে জপ, যজ্ঞ ও নিরামিষ পূজোপকরণ। রাজসী পূজাতে পশুবলি হইবে এবং পূজোপকরণ হইবে আমিষ। তামসী পূজার ব্যবস্থা কিরাতগণের জন্য; এইরূপ পূজায় জপ, যজ্ঞ বা মন্ত্র নাই এবং পূজোপকরণ মদ্য মাংস প্রভৃতি।
‘কালিকাপুরাণের’ প্রমাণবলে শূলপাণি একপ্রকার সংক্ষিপ্ত দুর্গাপূজার ব্যবস্থা করিয়াছেন; এই ব্যবস্থানুসারে মাত্র পঞ্চোপকরণের দ্বারা দেবীপূজা হইতে পারে, যথা–পুষ্প, চন্দন, ধূপ, দীপ ও নৈবেদ্য। প্রতিকূল আর্থিক অবস্থাদি হেতু যে বহু দ্রব্যাদি দ্বারা পূজা করিতে অক্ষম, তাঁহার পক্ষে কেবল ফুল জল অথবা শুধু জলের দ্বারা পূজার বিধান আছে।
বাংলা দেশে প্রচলিত দুর্গাপূজা সংক্রান্ত আচার অনুষ্ঠানের মধ্যে শত্ৰুবলি এবং শবরোৎসব কৌতূহলোদ্দীপক। ‘দেবীপুরাণ’, ‘কালিকাপুরাণ’ প্রভৃতিতে শত্রুবলির উল্লেখ আছে। সাধারণতঃ মানকচুর পাতায় ঢাকা একটি পুতুলকে বলি দেওয়া হয়। প্রচলিত বিশ্বাস এই যে, ইহা দ্বারা একবৎসর পর্যন্ত শত্রুভয় হইতে মুক্ত থাকা যায়। ‘দুর্গোৎসববিবেক’, ‘দুর্গাপূজাতত্ত্ব’ প্রভৃতি নিবন্ধগুলিতে শত্ৰুবলির উল্লেখ নাই, কিন্তু পরবর্তী কালের বিদ্যাভূষণ ভট্টাচার্য নামক জনৈক অপ্রসিদ্ধ ব্যক্তি কর্ত্তৃক রচিত ‘দুর্গাপূজাপদ্ধতি’তে এই প্রথার উল্লেখ আছে। ইহা হইতে মনে হয়, এই প্রথা বাংলা দেশে কখনও বিলুপ্ত হয় নাই। শূলপাণি, রঘুনন্দন প্রভৃতি নিবন্ধকারগণ সম্ভবতঃ এই অনুষ্ঠানটিতে বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেন নাই।
