যথাসময়ের একটু আগে-পিছে ১৯৪১ সালের অক্টোবর মাসে ধুম-ধামের সাথে ‘নবযুগ’ বাহির হইল। জোরদার সম্পাদকীয় লিখিলাম। সোজাসুজি মুসলিম লীগ বা সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে কিছু বলিলাম না। মুসলিম বাংলার বাংলা দৈনিকের আধিক্যের প্রয়োজনের উপরেই জোর দিলাম। তোখড় সম্পাদকীয় হইল। অমনি জোরের সম্পাদকীয় চলিতে লাগিল। সবাই বাহ্বাহ করিতে লাগিলেন।
কিন্তু আমাদের আসল আশা পূর্ণ হওয়ার আশু কোন সম্ভাবনা দেখা গেল না। আমাদের আসল আশা ছিল হক সাহেবকে মুসলিম লীগ হইতে বাহির করিয়া আনা। আমরা যখন ‘নবযুগের আয়োজন শুরু করি, তখনই হক-জিন্না বিরোধ চরমে উঠিয়াছে। দুই-একদিনের মধ্যেই শুভ কাজটা হইয়া যাইবে, এটাই ছিল আমাদের দৃঢ় প্রত্যয়। বিরোধটা ছিল ভারত সরকার-গঠিত জাতীয় সমর-পরিষদ (ন্যাশন্যাল ওয়ার কাউন্সিল) হইতে হক সাহেবের পদত্যাগ উপলক্ষ করিয়া। ব্যাপারটা অনেকেরই খবরের কাগযে পড়া আছে নিশ্চয়ই। তবু পাঠকদের স্মৃতি ঝালাইবার জন্য সংক্ষেপে ব্যাপারটার পূনরুল্লেখ করিতেছি। ১৯৪১ সালের জুন মাসে ইউরোপীয় যুদ্ধে হিটলারের জয়-জয়কার। অন্যতম প্রধান মিত্রশক্তি ফ্রান্স যুদ্ধে হারিয়া আত্মসমর্পণ করিয়াছে। প্যারিসের আইফেল টাওয়ারে হিটলারের স্বস্তিকা’ পতাকা উড়িতেছে। হিটলারের খ্যাতনামা সেনাপতি ফিল্ড মার্শাল রোমেল মিসরের আল-আমিনের যুদ্ধে বৃটিশ বাহিনীকে পর্যদস্ত করিয়া সুয়েজ খাল ধরে-ধরেন। সমগ্র ইউরোপ জয়ের উল্লাসে উন্মত্ত হইয়া হিটলার এই জুন মাসেই তাঁর এত দিনের মিত্র এবং নিরপেক্ষ সোভিয়েট রাশিয়া আক্রমণ করিয়াছেন। এক মাসের মধ্যে অর্থাৎ জুলাই পার হইবার আগেই মস্কো দখল করিবেন বলিয়া সদম্ভে ঘোষণা করিয়াছেন।
৮. হক সাহেব ও সমর-পরিষদ
আমরা ভারতবাসীরা ইংরেজের পরাজয় কামনাই করিতেছিলাম। হিটলারের পরিণম জয় সম্পর্কেও আমাদের কোন সন্দেহ ছিল না আগে হইতেই। জুন মাসে দেখা গেল স্বয়ং ইংরাজরা ঘাবড়াইয়া গিয়াছে। তার প্রমাণ স্বরূপ ভারতীয় নেতাদেরে, বিশেষতঃ কংগ্রেস ও লীগকে, খুশী করার জন্য বড়লাট তৎপর হইয়া উঠিলেন। বড় লাটের শাসন-পরিষদকে বড় করিয়া বেশির ভাগ ভারতীয় নিবার প্রস্তাব দিলেন। আর যুদ্ধ-পরিচালনা ব্যাপারেও ভারতবাসীর প্রত্যক্ষ যোগাযোগ স্থাপনের পন্থা হিসাবে ‘জাতীয় সমর-পরিষদ’ এই গাল-রা নামে এক কাউন্সিল গঠন করিলেন। ঘোষণায় বলা হইল প্রাদেশিক প্রধানমন্ত্রীরা পদাধিকারের বলে স্বতঃই কাউন্সিলের মেম্বার হইলেন। সে পদ গ্রহণ করিবার জন্য বড় লাট তাঁদেরে পত্র দিলেন। সকলেই তা গ্রহণ করিলেন। সাতটি প্রদেশ হইতে কংগ্রেসীরা আগেই মন্ত্রিত্বে ইস্তফা দিয়াছিলেন। সে সব প্রদেশে লাটের শাসন চলিতেছিল। শুধু বাংলা, আসাম, পাঞ্জাব ও সিন্ধুতে মন্ত্রিসভা চলিতেছিল। কাজেই প্রধানমন্ত্রী হিসাবে শুধু তারাই সমর-পরিষদের মেম্বার হইলেন। এঁরা সবাই মুসলিম লীগের লোক। কাজেই লীগ সভাপতি জিন্না সাহেব এদেরে নির্দেশ দিলেন সমর-পরিষদ হইতে পদত্যাগ করিতে। জিন্না সাহেবের যুক্তি এই যে বৃটিশ সরকার মুসলিম লীগের দাবির ভিত্তিতে আপোস না করা পর্যন্ত মুসলিম লীগ যুদ্ধ প্রচেষ্টায় কোনও সাহায্য করিবে না। মুসলিম লীগের এই সিদ্ধান্তটা ঠিক কংগ্রেসী সিদ্ধান্তের অনুরূপ। কংগ্রেসও ১৯৪০ সালের মার্চ হইতে বিভিন্ন অধিবেশনে এই দাবি করিয়া আসিতেছিল যে বৃটিশ সরকার ভারতের স্বাধীনতার ভিত্তিতে কংগ্রেসের সহিত একটা রফা না করা পর্যন্ত কংগ্রেস যুদ্ধ-প্রচেষ্টায় কোনও সহযোগিতা করিবে না।
৯. মিঃ জিন্নার যুদ্ধ-প্রচেষ্টার বিরোধিতা
মুসলিম লীগেরও এটা নূতন কথা নয়। মুসলিম লীগের পূর্ব সিদ্ধান্ত অনুসারে জিন্না সাহেব ১৯৪০ সালের ১০ই জুন তারিখে এক বিবৃতিতে সমস্ত মুসলিম লীগারদেরে, বিশেষতঃ মুসলিম মন্ত্রীদেরে, যুদ্ধ প্রচেষ্টায় কোন সহযোগিতা না করিবার নির্দেশ দেন। কেউ এ নির্দেশের কোনও প্রতিবাদ করেন নাই। শুধু পাঞ্জাবের প্রধানমন্ত্রী সার সেকান্দর হায়াত খাঁ ১৮ই জুন তারিখে এক বিবৃতি দিয়া বলেন যে মুসলিম লীগের এ অসহযোগের সিদ্ধান্ত বাংলা ও পাঞ্জাবের উপর প্রযোজ্য নহে। বাংলার প্রধানমন্ত্রী হক সাহেব তখন দিল্লি ছিলেন। সম্ভবতঃ তাঁর সাথে পরামর্শ করিয়াই সেকান্দর হায়াত ঐ ব্যাখ্যামূলক বিবৃতি দিয়াছিলেন। যুদ্ধে বাংলা ও পাঞ্জাবের বিশেষ অবস্থা বর্ণনা করিয়াই তিনি ঐ যুক্তিপূর্ণ বিবৃতিটি দিয়াছিলেন। তাতে কংগ্রেস নেতাদের সাথে আপোস আলোচনা চালাইবার জন্য জিন্না সাহেবকে অনুরোধও করিয়াছিলেন। কাজেই আশা করা গিয়াছিল স্বয়ং জিন্না সাহেবের তাতে সম্মতি আছে। কিন্তু পরদিন ২৯শে জুন জিন্ন সাহেব সেকান্দর সাহেবের বিবৃতিকে শিশু-সুলভ ও তার যুক্তিকে হাস্যকর বলিয়া উড়াইয়া দেন এবং সমস্ত মুসলিম লীগারকে যুদ্ধ প্রচেষ্টা হইতে দূরে থাকিতে নির্দেশ দিয়া লীগ সিদ্ধান্তের পুনরাবৃত্তি করেন।
জিন্না সাহেবের এই কড়া বিবৃতির জবাবে হক সাহেব বা সেকান্দর হায়াত সাহেব কেউ কিছু বলিলেন না। কিন্তু জিন্না সাহেবের আদেশ অমান্য করিয়া তাঁরা উভয়ে দিল্লীতে ৭ই জুলাই তারিখে কংগ্রেস সভাপতি মাওলানা আযাদসহ অন্যান্য কংগ্রেসী নেতাদের সাথে সাম্প্রদায়িক মিটমাটের আলোচনা করিলেন।
