এইভাবে তিনি প্রথমে আমার এবং পরে প্রজা-সমিতির গোঁড়া সমর্থক হইয়া উঠেন। দুইদিন আগে যিনি আমাকে মুসলিম সমাজের দুশমন ও যে প্রজা-সমিতিকে ছদ্মবেশী কংগ্রেস মনে করিতেন সেই আমাদের তারিফে তিনি পঞ্চমুখ হইলেন। ইতিপূর্বে বাংলা সরকার মুসলিম শিক্ষা সম্পর্কে রিপোর্ট করিবার জন্য খান বাহাদুর আবদুল মোমিনের নেতৃত্বে এক কমিটি গঠন করিয়াছিলেন। মাত্র কিছুদিন আগে এই কমিটি এ জিলায় তদন্তে আসিয়াছিলেন। তিনজন শিক্ষাবিদের মধ্যে বোধহয় কারো তুলের দরুন আমাকেও সাক্ষী হিসাবে ডাকা হইয়াছিল। আমার যবানবন্দিতে প্রচলিত শিক্ষা-পদ্ধতির আমূল সংস্কার দাবি করি; কারিগরি শিক্ষা প্রবর্তনের সুপারিশ করি, এবং সরকারী শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানে ধর্ম-শিক্ষা প্রচলনের বিরোধিতা করি। ইহাতে মোমিন সাহেব আমার উপর চটিয়া যান। সেই দিন সন্ধ্যায় মুসলিম ইনিষ্টিটিউটে খান বাহাদুর ইসমাইল সাহেবের সভাপতিত্বে এক অভ্যর্থনা সভায় মোমিন সাহেব কঠোর ভাষায় আমার নিন্দা করেন। আমাকে ঐ শহর হইতে বেত মারিয়া বাহির করিয়া দেওয়ার কথা হয়। জনৈক এডিশনাল এস, পি, ও ঐ সভায় বক্তৃতা করেন। তিনি ঐ কাজেরভার নেন।
আমাকে বেত মারিয়া বাহির করা না হইলেও সমাজ আটক করা হইয়াছিল। এই সময় এক মুসলমান জমিদার ভদ্রলোক তার মেয়ের বিয়ায় আমারে দাওয়াত করিলে শহরের মুসলিম নেতারা ঐ ভদ্রলোককে আলটিমেটাম দিয়া আমার নামের দাওয়াতনামা প্রত্যাহার করাইয়াছিলেন।
খান বাহাদুর ইসমাইল সাহেব ছিলেন আদত মহৎ ও ভদ্রলোক। তিনি নিজেই এসব কথা তুলিতেন, আমার আপত্তি সত্ত্বেও বলিয়া যাইতেন। আমি তখন বলিতাম। ‘আজ আর ও-সব কথা তুলিবার দরকার নাই। অবস্থা-গতিকেই ওসব ঘটিয়াছিল।‘ জবাবে তিনি গভীরভাবে বলিতেন : ‘তোমার জন্য দরকার নাই, আমার জন্যই দরকার। আমার একটা বিবেক আছে ত? তাকে সান্ত্বনা দিতে হইবে না?’ আমি বুঝিতাম ভদ্রলোকের ব্যথা কোথায়। তিনি একদিন বলিয়াছিলেন? ‘তোমারে বেত মাইরা বাইর করবার আগে হতভাগা নিমকহারামেরা আমারেই লাথি মাইরা বাইর কৈরা দিছে। পিতৃতুল্য এককালের শক্তিধক্সের বর্তমান মনোভাবকে অতি কৌশলে নাযুক হাতে হ্যাঁগুল করিতে হইত। পারিতামও। করিয়াও ছিলাম। সরকারী পদ মর্যাদার ভক্ত ছাড়াও খান বাহাদুর সাহেবের অনেক ব্যক্তিগত ভক্ত ও অনুসারী ছিলেন। খানবাহদুর সাহেব প্রজা-সমিতিতে যোগ দেওয়ায় এই সব লোক চোখ বুজিয়া প্রজা সমিতির সমর্থক হইয়া উঠিলেন। অনেকে সক্রিয়ভাবেসমিতিতে যোগদিলেন। এতদিন মফস্বলে প্রজা-সমিতির শক্তি সীমাবদ্ধ ছিল। এইবার শহরে তা প্রসারিত হইল।
৫. পুলিশ সুপার টেইলার
ইতিমধ্যে (ডিসেম্বর, ১৯৩১) গোলটেবিল-বৈঠক হইতে নিরাশ হইয়া মহাত্মা গান্ধী দেশে ফিরিয়া আসামাত্র গ্রেফতার হইলেন। কংগ্রেস বেআইনী ঘোষিত হইল (জানুয়ারি, ১৯৩২)। আমি তখনও কংগ্রেসের ভাইস-প্রেসিডেন্ট। ডাঃ সেন ও আমি আরও অল্প কয়েকজন ছাড়া এ জিলার কংগ্রেসের বড়-বড় নেতারা প্রায় সকলেই গ্রেফতার হইলেন। আমরা নিজেদের দলাদলি তুলিয়া অঃ সেনের বাড়িতে সকল উপালের কয়েকজন কংগ্রেসী নেতা পরামর্শ-সতা করিলাম। ডাঃ সেন ও আমি শান্তি রক্ষার আবেদন করিলাম। প্রায় সকলেই একমত হইলাম। কেবলমাত্র দুইজন হিন্দু নেতা সক্রিয় আন্দোলনের জন্য উত্তেজনাপূর্ণ বক্তৃতা করিলেন। কিন্তু অধিকাংশে বিরুদ্ধতায় তাঁদের প্রস্তাব পরিত্যক্ত হইল। পরদিন কোর্টে যাইবার জন্য প্রস্তুত হইয়াছি। এমন সময় একজন ডি. এস. পি. ও একজন ইনস্পেক্টর আসিয়া জানাইলেন, আমাকে তখনি এসপি, সাহেব ডাকিয়াছেন। তাঁরা গাড়ি নিয়াই আসিয়াছিলেন।
ময়মনসিংহে সংগঠন আমি তাঁদের সাথে যাইতে বাধ্য হইলাম। বাড়িতে শোকের ছায়া পড়িল। বৈঠকখানায় অপেক্ষমান মণ্ডলেদের মুখ কাল হইয়া গেল। সকলকে আশ্বাস দিয়া আমি কোর্টে যাওয়ার পোশাকেই এস. পি. সাহেবের কাছে রওয়ানা হইলাম। কি করিয়া জানি না কথাটা প্রচার হইয়া গিয়াছিল। বাড়ি হইতে বাহির হইয়াই দেখিলাম রাস্তার দুপাশে ভিড়। সকলে ধরিয়া লইয়াছিলেন, আমি গ্রেফতার হইয়াছি। অনেকেই রুমাল উড়াইয়া আমাকে বিদায় দিলেন।
এস. পি. মিঃ টেইলার। বড় কড়া লোক বলিয়া মশহর। আমাকে দেখিয়াই তিনি গর্জিয়া উঠিলেন। বুঝিলাম আগের দিনের সভার বিকৃত রিপোর্ট তীর কানে গিয়াছে। গর্জনের উত্তরে গর্জন করা আমার চিরকালের অভ্যাস। আমি তাই করিলাম। দু’চার মিনিটেই আশ্চর্য ফল হইল। টেইলার সাহেব নরম হইলেন। কাজেই আমিও হইলাম। টেবিলের উপর সিগারেটের একটা টিন একরূপ ভরাট ছিল। তিনি আমাকে সিগারেট অফার করিলেন। সিগারেট খাইতে-খাইতে কথা-বার্তা চলিল ঝাড়া পৌনে দুই ঘন্টা। কংগ্রেসের উদ্দেশ্য, দাবি-দাওয়া কার্যক্রম হইতে শুরু কলিয়া বিলাতের কনযাভেটিভ লিবারেল লেবার পার্টির পলিটিকস্ সবই আলোচনা হইল। প্রজা সমিতি ও প্রজা আন্দোলন সম্পর্কে দীর্ঘ আলোচনা হইল। ফলে টেইলার সাহেব শেষ পর্যন্ত স্বীকার করিলেন ভারতবাসীর স্বাধীনতা দাবি ও প্রজাদের আন্দোলন করার অধিকার আছে। তবে কংগ্রেসের বেআইনী ও হিংসাত্মক কার্যকলাপ তিনি কঠোর হস্তে দমন করিতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। আমি তাঁকে বুঝাইলাম আমি এবং আমার মত অনেকেই এক দল কংগ্রেসীর হিংসাত্মক কর্মপন্থার ঘোরতর বিরোধী। শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করা আমরা পক্ষপাতী। তাছাড়া আমি মূলতঃ প্রজা-কর্মী। স্বাধীনতার দাবিতে আমি কংগ্রেসের সমর্থক এইমাত্র। কাজেই শেষ পর্যন্ত প্রজা-সমিতির ও প্রজা আন্দোলনের খুঁটিনাটি ও শান্তি ভংগের কথাও উঠিল। বিভিন্ন স্থানে জমিদার মহাজনের বাড়িতে অগ্নিসংযোগ ও লুটতরাযের তিনি দুই-একটা দৃষ্টান্তও দিলেন। আমি দেখাইলাম, ও ধরনের কার্যে প্রজা সমিতির কোনও সম্পর্ক নাই। বরঞ্চ আমি জমিদার ও মহাজনদের বে-আইনী যুলুমের বহু দৃষ্টান্ত দিলাম। ঐসব ক্ষেত্রে পুলিশের সাহায্য চাহিয়া যে বিপরীত ফল হইয়াছে, তার প্রমান দিলাম। পৌনে দুই ঘন্টা আলাপে রা-টিনটার সবগুলি সিগারেট শেষ হইল। তিনি খালি টিনের দিকে চাহিয়া হাসিয়া বলিলেন : ‘আরেক টিন আনাইব কি?’ আমিও তেমনি হাসিয়া জবাব দিলামঃ ‘তা ত আনিতেই হইবে। বিড়ি-খোর কংগ্রেস-কমীকে বাড়িতে বন্দী করিয়া রাখিবার ইহাই শাস্তি।‘
