সার আব্দুর রহিম, মৌলভী আব্দুল করিম, মৌলভী মুজিবুর রহমান, মওলানা আকরম খাঁ ও মওলানা মনিরুযযামান ইসলামাবাদী প্রভৃতি মুসলিম নেতৃবৃন্দ এবং মিঃ জে. এম. সেনগুপ্ত, মিঃ শরৎ চন্দ্র বসু, মিঃ জে, এম, দাশ গুপ্ত ও ডাঃ বিধান চন্দ্র রায় প্রভৃতি হিন্দু নেতার সহযোগিতায় দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন এই সময় (১৯২৩ এপ্রিল) ঐতিহাসিক ‘বেংগল প্যাক্ট’ নামক হিন্দু-মুসলিম চুক্তিনামা রচনা করেন। তিনি স্বরাজ্য পার্টি ও বংগীয় প্রাদেশিক কংগ্রেস কমিটিকে দিয়া ঐ প্যাক্ট মনযুর করাইলেন। এই প্যাটে ব্যবস্থা করা হয় যে, সরকারী চাকুরিতে মুসলমানরা জন সংখ্যানুপাতে চাকুরি পাইবে এবং যতদিন ঐ সংখ্যানুপাতে (তৎকালে শতকরা ৫৪) না পৌঁছিবে ততদিন নূতন নিয়োগের শতকরা ৮০টি মুসলমানদেরে দেওয়া হইবে। সরকারী চাকুরি ছাড়াও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে, যথা কলিকাতা কর্পোরেশন সমস্ত মিউনিসিপ্যালিটি এবং ডিস্ট্রিক্ট ও লোকাল বোর্ডসমূহে, মুসলমানরা ঐ হারে চাকুরি পাইবে। প্যাক্টের বিরোধী হিন্দু নেতারা বলিতে লাগিলেন যে, দেশবন্ধু স্বরাজ্য দলে এবং কংগ্রেস কমিটিতে প্যাক্ট পাস করাইতে পারিলেও কংগ্রেসের প্রকাশ্য সম্মিলনীতে পারিবেন না। তাই প্রাদেশিক কংগ্রেসের প্রকাশ্য সম্মিলনীতে এই প্যাক্ট গ্রহণ করাইবার উদ্দেশ্যে তিনি ১৯২৪ সালের জুন মাসে সিরাজগঞ্জ এই সম্মিলনীর অধিবেশন আহবান করিলেন। মওলানা মোহাম্মদ আকরম খাঁ সাহেব এই প্রকাশ্য অধিবেশনের সভাপতি নির্বাচিত হইলেন। এইসব কারণে দেশবন্ধু মুসলমানদের মধ্যে খুবই জনপ্রিয়। আমি নীতিগতভাবে কংগ্রেসের ‘নোচেঞ্জার’ দলের সমর্থক হইয়াও শুধু এই কারণে দেশবন্ধুর একজন ভক্ত অনুরক্ত।
মওলানা ইসলামাবাদী সাহেবের ‘ছোলতানে’ সাব-এডিটরি নেওয়ার পর জানিতে পারি যে, মৌঃ ইসমাইল হোসেন সিরাজী সাহেবও ছোলতানের অংশীদার। মওলানা সাহেবই কলিকাতায় থাকিয়া ‘ছোলতান’ সম্পাদনা করিতেন। সিরাজী সাহেব সময় সময় কলিকাতা আসিয়া ইসলামাবাদী সাহেবের মেহমান হইতেন। উভয়েই পুরামাত্রায় স্বাধীনতা আন্দোলনের পক্ষপাতী হইলেও সিরাজী সাহেব সিরাজগঞ্জ সম্মিলনীর ব্যাপারে কংগ্রেসের বিরুদ্ধতা করিতেছেন বলিয়া কলিকাতায় খবর আসে। সাম্প্রদায়িক হিন্দু কংগ্রেস নেতারা ঐ প্যাক্টের দরুন দেশবন্ধুর বিরোধী। সিরাজগঞ্জের আঞ্জুমনী মুসলিম-নেতারা ঐতিহ্যগতভাবেই কংগ্রেস-বিরোধী। এই দুই দল মিলিয়া সিরাজগঞ্জ কংগ্রেস সম্মিলনী ভন্ডুল করিবার চেষ্টা করিতেছেন। সিরাজী সাহেব এদের দলে যোগ দিয়াছেন। অথচ মওলানা ইসলামাবাদী সাহেব দেশবন্ধুর ও সম্মিলনীর পুরা সমর্থক। তাঁরই নির্দেশ ও উৎসাহে আমি দেশবন্ধুর বেংগল প্যাকটের সমর্থক এবং দেশবন্ধু বিরোধী কংগ্রেস নেতাদের সাম্প্রদায়িক সংকীর্ণতার নিন্দায় অনেকগুলি সম্পাদকীয় লিখিয়াছি। শ্যামসুন্দর চক্রবর্তীর মত ত্যাগী আজীবন-নির্যাতিত বাগ্মী নেতার তীব্র রসনা, পাঁচকড়ি বন্দ্যোপাধ্যায়ের মত শক্তিশালী লেখকের চাঁছাল কলম, ‘অমৃত বাজার’ পত্রিকার মত বিপুল প্রচারিত দৈনিকের পৃষ্ঠা দিনরাত দেশবন্ধুর বিরুদ্ধ প্রচারণায় নিয়োজিত। তাঁদের মূলকথা এই যে, দেশবন্ধু বাংলাদেশ মুসলমানদের কাছে বেচিয়া দিয়াছেন। এদের সংঘবদ্ধ বিরুদ্ধতা ঠেলিয়া দেশবন্ধু কর্পোরেশনের সাধারণ নির্বাচনে (১৯২৪ এপ্রিল) জয়ী হইয়াছেন। নিজে মেয়র নির্বাচিত হইয়াছেন। জনপ্রিয় তরুণ মুসলিম নেতা শহীদ সুহরাওয়ার্দীকে ডিপুটি মেয়র করিয়াছেন। সুভাষ বাবুকে চীফ একযিকিউটিভ অফিসার ও হাজী আবদুর রশিদ সাহেবকে ডিপুটি একযিকিউটিভ অফিসার করিয়াছেন এবং অনেক মুসলমান গ্র্যাজুয়েট এম. এ.-কে রাতারাতি কর্পোরেশনের মোটা বেতনের দায়িত্বপূর্ণ চাকুরি দিয়াছেন। কলিকাতা কর্পোরেশনের মত হিন্দু-প্রধান প্রতিষ্ঠানে মুসলমানদের পক্ষে রাতারাতি অত ভাল চাকুরি পাওয়া কল্পনারও অগোচর ছিল। কাজেই সাম্প্রদায়িক হিন্দুরা দেশবন্ধু আয়োজিত সিরাজগঞ্জ কনফারেন্স পন্ড করিবার চেষ্টা করিবে এটা স্বাভাবিক। আঞ্জুমনওয়ালারাও যা কিছু কংগ্রেসী সবটার অন্ধ বিরুদ্ধতা করিবে এটাও আশ্চর্য নয়। কিন্তু সিরাজী সাহেবের মত স্বাধীনতাকামী কংগ্রেস সমর্থক সংগ্রামী রাজনৈতিক নেতা একাজ করিতেছেন কেন ইহা কলিকাতাস্থ নেতৃবৃন্দের কাছে এরূপ দুর্বোধ্য ছিল।
৩. সিরাজগঞ্জ কনফারেন্স
তাই দেশবন্ধু ও মওলানা আকরম খাঁর কথামত মওলানা ইসলামাবাদী সাহেব আমাকে সিরাজী সাহেবের নিকট পাঠান। কংগ্রেস সম্মিলনীর এক সপ্তাহ আগে এঁদের-দেওয়া রাহা খরচ লইয়া আমি সিরাজগঞ্জ গেলাম। বেংগল প্যাকটের মুদ্রিত শর্তাবলী, দেশবন্ধুর বিভিন্ন বক্তৃতার অসংখ্য কপি, প্যাকটের সমর্থনে আমি ‘ছোলতানে’ যে সব সংখ্যায় প্রবন্ধ লিখিয়াছিলাম সেই সব সংখ্যার যত কপি পাওয়া
গেল তার সব এবং ‘ছোলতানের’ সর্বশেষ সংখ্যার হাজার খানি কপির এক বিরাট বস্তা সংগে নিলাম। গিয়া উঠিলাম সিরাজী সাহেবের বাড়ি বাণীকুঞ্জে। সিরাজী সাহেব গরিব হইলেও মেহমানদারিতে তাঁর মোজ-মর্যি ছিল একদম বাদশাহী। তাছাড়া আমাকে খুবই স্নেহ করিতেন। আমাকে তিনি সাদরে অভ্যর্থনা করিলেন এবং থাকা খাওয়ার সুবন্দোবস্ত করিলেন। কিন্তু চা-নাশতা খাওয়ার সময়েই বুঝিয়া ফেলিলাম, ‘ছোলতানের’ সাম্প্রতিক লেখাসমূহের জন্য তিনি আমার উপর বেশ খাপ্পা হইয়াছেন। গত দুই-তিন মাস তিনি কলিকাতা যান নাই। কাজেই তাঁর সর্বশেষ রাজনৈতিক মতামত আমার জানা ছিল না। কথাবার্তায় বুঝিলাম, তিনি কংগ্রেসের বিরুদ্ধে অনেক দূর আগাই গিয়াছেন। স্থানীয় ‘নোচেঞ্জার’ কংগ্রেসী ও আঞ্জুমনী নেতাদের সহায়তায় তিনি প্রকাশ্যভাবে অনেক কাজ করিয়া ফেলিয়াছেন।
