নদীটি ক্ষীণতরা।
ছোট গঙ্গা বড় গঙ্গা
ফান ডেন ব্রোক বা রেনেল যে-নামেই এই দুইটি নদীকে অভিহিত করুন না কেন, দেশের ঐতিহ্যে এই নদীদুটির নাম কী ছিল দেখা যাইতে পারে। ফান ডেন ব্রোকের আড়াই শত বৎসর আগে কবি কৃত্তিবাসের কাল (১৩২০ শক=১৪১৫-১৬ খ্ৰী)। কৃত্তিবাসের পিতৃভূমি ছিল বঙ্গে (পূর্ব-বাঙলায়) , তাহার পূর্বপুরুষ নরসিংহ ওঝা বঙ্গ (ভাগ) ছাড়িয়া গঙ্গাতীরে ফুলিয়াগ্রামে আসিয়া বসতি স্থাপন করেন, যে ফুলিয়ার দক্ষিণের পশ্চিমে বহে গঙ্গা তরঙ্গিণী। নিঃসন্দেহে পূর্বোক্ত দক্ষিণবাহিনী নদী আমরা যাহাকে বলি ভাগীরথী (বর্তমান হুগলীনদী) তাহার কথাই কৃত্তিবাস বলিতেছেন। কিন্তু, এই গঙ্গা ছোট গঙ্গা। কারণ, এগারো, পার হইয়া কৃত্তিবাস যখন বারো বৎসরে প্রবেশ করিলেন তখন ‘পাঠের নিমিত্ত গেলাম বড়ো গঙ্গাপার, এবং সেখানে নানা বিদ্যা অর্জন করিয়া তদানীন্তন গৌড়েশ্বর রাজা কংস বা গণেশের সভায় রামায়ণ রচনা করিলেন। নিশ্চিত যে, এই বড় গঙ্গাই পদ্মা। এই কথার আরও সমর্থন পাওয়া যায় কৃত্তিবাস রামায়ণের অন্যতম একটি পুঁথিতে। কৃত্তিবাস নিজ বাল্যজীবনের কথা বলিতেছেন;
পিতা বনমালী মাতা মাণিক [মেনকা] উদরে।
জনম লভিল ওঝা ছয় সহোদরে॥
ছোটগঙ্গা বড়গঙ্গা বড় বলিন্দা [নিঃসন্দেহে, বরেন্দ্র-বরেন্দ্রী] পার।
যথা তথা কর্যা বেড়ায় বিদ্যার উদ্ধার॥
রাঢ়ামধৈ [রাঢ় মধ্যে?] বন্দিনু আচার্য চূড়ামণি।
যার ঠাঁই কৃত্তিবাস পড়িলা আপনি ॥
স্পষ্টতই গঙ্গার দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ববাহিনী দুই প্রবাহকেই কৃত্তিবাস যথাক্রমে ছোটগঙ্গা ও বড়গঙ্গা বলিতেছেন, এবং তদানীন্তন ভাগীরথী-পথের সুন্দর বিবরণ দিতেছেন। সে কথা পরে উল্লেখ করিতেছি। আপাতত এইটুকু পাওয়া গেল যে, পঞ্চদশ শতকের গোড়াতেই পদ্মা বৃহত্তরা নদী, উহাই বড়গঙ্গা। কিন্তু যত প্রশস্ততরা, যত দুৰ্দমা দুর্দান্তই হোক না কেন, ঐতিহ্যমহিমায় কিংবা লোকের শ্রদ্ধাভক্তিতে বড়গঙ্গা ছোটগঙ্গার সমকক্ষ হইতে পারে নাই। হিন্দুর স্মৃতি ঐতিহ্যে গঙ্গার জলই পাপমোচন করে, পদ্মার নয়। গঙ্গা স্নিগ্ধ, পাপহরা, পদ্মা কীর্তিনাশা; পদ্মা ভীষণা ভয়ংকরী উন্মত্তা।
গঙ্গা-ভাগীরথীই যে প্রাচীনতরা এবং পুণ্যতোয়া নদী, ইহাই যে হিন্দুর পরম তীর্থ জাহ্নবী, এই সম্বন্ধে প্রাচীন সংস্কৃত সাহিত্য এবং লিপিমালা একমত। পদ্মাকে গঙ্গা কখনও কখনও বলা হইয়াছে, কিন্তু ভাগীরথী-জাহ্নবী একবারও বলা হয় নাই। বাঙলাদেশের গ্রন্থ ও লিপিই এই প্রসঙ্গে উল্লেখ করিতেছি। ধোয়ীর পবনদূতে ত্ৰিবেণীসংগমের ভাগীরথীকেই বলা হইয়াছে গঙ্গা; লক্ষ্মণসেনের গোবিন্দপুর পট্টোলীতে বর্ধমানভুক্তির বেতডড চতুরকের (হাওড়া জেলার বেতড়) পূর্ববাহিনী নদীটির নাম জাহ্নবী; বল্লালসেনের নৈহাটি লিপিতে গঙ্গা-ভাগীরথীকেই বলা হইয়াছে ‘সুরসরিৎ (স্বৰ্গনদী বা দেবনদী); রাজেন্দ্রচোলের তিরুমালয় লিপিতে উত্তর-রাঢ় পূর্বসীমায় গঙ্গাতীরশায়ী, যে-গঙ্গার সুগন্ধ পুষ্পবাহী জল অসংখ্য তীর্থঘাটে ঢেউ দিয়া দিয়া প্রবাহিত হইত “The Ganga whose waters bearing fragrant flowers dashed against the bathing places”। এই সব bathing places তীর্থঘাট, এবং পুষ্প স্নানপূজার ফুল, সন্দেহ কি! এই পূজা, ভাগীরথীরাই ভাগ্যে জোটে, পদ্মার নয়!
পদ্মা বা বড়গঙ্গার কথা পরে বলার সুযোগ হইবে; ভাগীরথী বা ছোটগঙ্গার কাহিনী আগে শেষ করিয়া লই। যাহাই হউক, পঞ্চদশ শতকে ভাগীরথী সংকীর্ণতোয়া সন্দেহ নাই, কিন্তু তখন তাহার প্রবাহ আজিকার মতো ক্ষীণ নয়; সাগরমুখ হইতে আরম্ভ করিয়া একেবারে চম্পা-ভাগলপুর পর্যন্ত সমানে বড়ো বড়ো বাণিজ্যতরীর চলাচল তখনও অব্যাহত। ফান ডেন ব্রোকের নকশায় এই পথের দুই ধারের নগর বন্দরের এবং পূর্ব ও পশ্চিমাগত শাখা-প্রশাখা নদীগুলির সুস্পষ্ট পরিচয় ‘আছে। নকশা খুলিলেই তাঁহাদের পরিচয় পাওয়া যাইবে, এবং ভাগীরথীই যে সংকীর্ণতর হওয়া সত্ত্বেও প্রধানতর প্রবাহ তাহার প্রমাণ পাওয়া যাইবে। সাম্প্রতিক কালে বহু প্রমাণ-প্রয়োগের সাহায্যে এই প্রবাহের ইতিহাস আলোচিত হইয়াছে। ফান ডেন ব্রোকের কিঞ্চিদধিক দেড়শত বৎসর আগে বিপ্রদাস পিপিলাই তাহার ‘মনসামঙ্গলে এই প্ৰবাহপথের যে বিবরণ দিতেছেন তাহা সুপরিচিত নয়। কাজেই, এখানে তাহা উল্লেখ করা যাইতে পারে। বিপ্রদাসের চাঁদ সওদাগরের বাণিজ্যতরী রাজঘাট, রামেশ্বর পার হইয়া সাগরমুখের দিকে অগ্রসর হইতেছে; পথে পড়িতেছে, অজয়নদী, উজানী, শিবানদী (বর্তমান শিয়ালনালা), কাটোয়া, ইন্দ্ৰাণী,নদী, ইন্দ্ৰঘাট, নদীয়া, ফুলিয়া, গুপ্তিপাড়া, মির্জাপুর, ত্ৰিবেণী, সপ্তগ্রাম (সপ্তগ্রাম যে গঙ্গা-সরস্বতী-যমুনাসংগমে বিপ্রদাস তাহাও উল্লেখ করিতে ভুলেন নাই), কুমারহাট, ডাইনে হুগলী, বামে ভাটপাড়া, পশ্চিমে বোরো, পূর্বে কাকিনাড়া, তারপর মূলাজোড়া, গাঙুলিয়া, পশ্চিমে পাইকপাড়া, ভদ্ৰেশ্বর, ডাইনে চাঁপদানি, বামে ইছাপুর, বাকিবাজার, (ডাইনে) নিমাইতীর্থ (বর্তমান বৈদ্যবাটি?), চানক, মাহেশ, (বামে), খড়দহ, শ্ৰীপাট, ডাইনে রিসিাড়া (রিষড়া), বামে সুকচর, পশ্চিমে কোন্নগর, ডাইনে কোতরং, বামে কামারহাটি, পূর্বে আড়িয়াদহ (এড়েদহ), পশ্চিমে ঘুষুড়ি, তারপর পূর্বকূলে চিত্রপুর (চিৎপুর), কলিকাতা, (পশ্চিমকুলে) বেতড় (দ্বাদশ শতক লিপির বেতডড চতুরক), তারপর (বামে) কালীঘাট, চুড়াঘাট, বারুইপুর, ছত্রভোগ, বদরিকাকুণ্ড, হাথিয়াগড়, চৌমুখী, শতমুখী এবং সর্বশেষে সাগরসংগমতীৰ্থ যেখানে “তীৰ্থকার্য শ্ৰাদ্ধ কৈল পবিত্ৰ তৰ্পণ। তাহার মেলান ডিঙ্গা সংগমে প্রবেশে। তীৰ্থকার্য কৈল রাজা পর[ম] হরিষে।” সাগর-সংগমের নিকট গঙ্গা তো সত্যই চারিমুখে শতমুখে কেন, অসংখ্য খাল-নালায় শাখাপ্রশাখায় বিভক্ত। মহাভারতের বনপর্বের তীর্থযাত্ৰা অধ্যায়ে বর্ণিত আছে, যুধিষ্ঠির পঞ্চশতমুখী গঙ্গার সাগরসংগমে তীর্থস্নান করিয়াছিলেন। যাহা হউক, বিপ্রদাসের উপরোক্ত বর্ণনার সঙ্গে ফান ডেন ব্রোকের নকশার বর্ণনা অনেক ক্ষেত্রেই এক। নদীয়া, মির্জাপুর, ত্রিবেণী (Tripeni), সপ্তগ্রাম (Coatgam), হুগলি (Oegli, পর্তুগীজ বণিকদের Ogulium), কলিকাতা (ফান ডেন ব্ৰোক Collecate এবং Calcutta নামে প্রায় সংলগ্ন দুইটি বন্দরের নাম করিতেছেন–একটি বিপ্রদাসের কলিকাতা এবং অপরটি কালীঘাট বলিয়া মনে হয়) প্রভৃতি নাম পাওয়া যাইতেছে। লক্ষণীয় এই পঞ্চদশ শতকেই বিপ্রদাস হুগলী ও কলিকাতার উল্লেখ করিতেছেন, এবং ইহাই হুগলী ও কলিকাতার সর্বপ্রাচীন উল্লেখ। তবে, সন্দেহ হয়, বিপ্রদাসের মূল-তালিকায় পরবর্তী কালের গায়েনরা হুগলী, কলিকাতা প্রভৃতি নাম সংযোগ করিয়া দিয়াছিলেন; মূল তালিকায় এ-দুটি নাম ছিল, কিনা, সে-বিষয়ে আমার সন্দেহ আছে। পঞ্চদশ শতকে কলিকাতার উল্লেখ সত্যই যথেষ্ট সন্দেহজনক! ১৪৯৫-র (বিপ্রদাসের) পরে এবং ১৬৬০-র (ফান ডেন ব্রোকের) আগে বরা(হ)নগর, চন্দননগর প্রভৃতি বন্দর গড়িয়া উঠিয়াছে; শুধু যে ফান ডেন ব্রোকই ইহাদের উল্লেখ করিয়াছেন তাহা নয়, জাও ডি ব্যারোসের নকশায়ও অগ্রপাড়া (Agrapara), বরাহনগরের (Baranagar) উল্লেখ পাইতেছি, সপ্তগ্রামের (সাতগাঁও—Satigam) সঙ্গে, ইতিহাসের তথ্য তাহাই।। হুগলীও ব্রোকের সময় ফাঁপিয়া উঠিয়াছে।
