বাঙলার এই নদীগুলি সমগ্র পূর্ব-ভারতের দায় ও দায়িত্ব বহন করে। উত্তর ভারতের প্রধানতম দুইটি নদীর-গঙ্গা ও ব্ৰহ্মপুত্রের—বিপুল নদীজলধারা, পলিপ্রবাহ, এবং পূর্ব-যুক্তপ্রদেশ, বিহার ও আসামের বৃষ্টিপাতপ্রবাহ বহন করিয়া সমুদ্রে লইয়া যাইবার দায়িত্ব বহন করিতে হয় বাঙলার কমনীয় মাটিকে। সেই মাটি সর্বত্র এই সুবিপুল জলপ্রবাহ বহন করিবার উপযুক্ত নয়। এই জলপ্রবাহ নূতন ভূমি যেমন গড়ে, মাঠে যেমন শস্য ফলায়, তেমনই ভূমি ভাঙেও, শস্য বিনাশও করে। বাঙালী ক্ৰোধাভরে পদ্মাকে বলিয়াছে কীর্তিনাশা, পদ্মা বাঙালীর অনেক কীর্তিই নষ্ট করিয়াছে সত্য-করিবে না-ই বা কেন? গঙ্গা-ব্ৰহ্মপুত্র-মেঘনার সুবিপুল জলধারা নিম্নতম প্রবাহে সে একা বহন করে, তাহাতে আসিয়া নামে প্রচুর বৃষ্টিপ্রবাহ, নিম্নভূমির সাগরপ্রমাণ বিল-হাওরের অগাধ জলরাশি। দুৰ্দম মত্ততার অধিকার তাহার না। থাকিলে থাকিবে কাহার? এবং, সেই মত্ততা নরম নমনীয় নূতন মাটির উপর। ফল যাহা হইবার তাহাই হইয়াছে ও হইতেছে। অথচ, এই মেঘনা-পদ্মাই তো আবার স্বর্ণশস্যের আকার; এই পদ্মার দুই তীরেই তো বাঙলার ঘনতম মনুষ্য বসতি, সমৃদ্ধ ঐশ্বর্যের লীলা। মানুষ যদি পদ্মা-মেঘনাকে বশে আনিতে না পারিয়া থাকে, সে যদি আপন দুবুদ্ধিবশে ইহাদের মত্ততাকে আরও নির্মম আরও দুরন্ত করিয়া থাকে, তবে সেই দোষ পদ্মা-মেঘনার নয়। কিন্তু, ইতিহাস আলোচনায় এসব জল্পনা হয়তো অবান্তর!
উপাদান
বাঙলার ভূ-প্রকৃতিতে নদীর খাত যুগে যুগে পরিবর্তিত হওয়া, পুরাতন নদী মজিয়া মরিয়া যাওয়া, নূতন নদীর সৃষ্টি কিছুই অস্বাভাবিক ব্যাপার নয়। ষোড়শ শতক হইতে আরম্ভ করিয়া উনবিংশ শতকের শেষ, এই চারি শতাব্দীর মধ্যে বাঙলার প্রধান-অপ্রধান ছোটবড় কত নদনদী যে কতবার খাত বদলাইয়াছে, কত পুরাতন নদী মরিয়াছে, কত নূতন নদীর সৃষ্টি হইয়াছে তাহার কিছু কিছু হিসাব পাওয়া যায় বাঙলার সমসাময়িক ভূমি-নকশায়। বর্তমান বাঙলায় নদীগুলির যে প্রবাহপথ, আকৃতি-প্রকৃতি এখন আমরা দেখিতেছি, একশত বৎসর পূর্বেও এইসব নদনদীর এই প্রবাহপথ, আকৃতি-প্রকৃতি ছিল না। ষোড়শ ও অষ্টাদশ শতকের মধ্যে Jao de Barros (1550), Gastaldi (1561), Hondivs (1614), Cantelli da Vignolla (1683), Van den Broucke (1660), G. Delisle(1720-1740), Izzak Tirion (1730), F. de Witt (1726), de l’ Auville (1752), Thornton, Rennel (1764-1776) প্রভৃতি পর্তুগীজ, ডাচ ও ইংরাজ বণিক রাজকর্মচারী ও পণ্ডিতেরা বাঙলা ও ভারতবর্ষের অনেকগুলি নকশা রচনা করিয়াছিলেন। মধ্যযুগে বাঙলার নদনদী ও জনপদগুলির ক্রমপরিবর্তমান আকৃতি, পুরাতন নদীর মৃত্যু, নূতন নদীর জন্ম-সমস্তই এই নকশাগুলিতে ধরিতে পারা যায়। আমাদের চোখের উপর এই পরিবর্তন এখনও চলিতেছে; যমুনার খাতে ব্ৰহ্মপুত্রের নূতনতর প্রবাহ, ভৈরব, কুমার প্রভৃতি নদীর আসন্ন মৃত্যু ইত্যাদি তো সমসাময়িক কালের কথা। পঞ্চদশ-ষোড়শ শতক হইতে নানা পরিবর্তনের ভিতর দিয়া নদনদীগুলির-এবং সঙ্গে সঙ্গে জনপদগুলিরও-ক্রমপরিণতি এখন অনেকটা স্পষ্ট। শুধু নকশাগুলিতেই নয়, ইবন বতুতা (1328-1354), বারনি (চতুর্দশ শতক), রালফ ফিচ (Ralph Fitch, 1583-91), Fernandes (1598), Fonseca (1599) প্রভৃতি বিদেশী পর্যটকদের বিবরণী, বিজয়গুপ্তের ‘মনসামঙ্গল’,মুকুন্দরামের ‘চণ্ডীমঙ্গল’, বিপ্রদাসের ‘মনসামঙ্গল’, কৃত্তিবাসের ‘রামায়ণ’, গোবিন্দদাসের ‘কড়চা’, ভারতচন্দ্রের ‘অন্নদামঙ্গল’ জাতীয় সাহিত্যগ্রন্থ এবং মুসলমান লেখকদের সমসাময়িক ইতিহাসেও এই পরিবর্তনের চেহারা ধরিতে পারা কঠিন নয়। সাম্প্রতিক কালে নদীমাতৃক বাঙলার এই ক্রমপরিবর্তমান আকৃতি-প্রকৃতি সম্বন্ধে আলোচনাও যথেষ্ট হইয়াছে। কাজেই এখানে সে-সব কথার পুনরালোচনা করিয়া লাভ নাই। যোড়শ শতকের পরেই শুধু নয়, আগেও বাঙলার প্রধান প্রধান নদনদীগুলি যুগে যুগে এই ধরনের পরিবর্তনের মধ্য দিয়া গিয়াছে, এমন অনুমান কিছুতেই অসংগত নয়; তাহার কিছু কিছ প্রমাণও আছে। কারণ, প্রাচীন সাহিত্যে, টলেমির নকশায় ও প্রাচীন লিপিমালায় বাঙলার দুই-চারিটি নদনদীর প্রবাহপথ সম্বন্ধে যে-ইঙ্গিত পাওয়া যায় তাহা বর্তমান প্রবাহপথ তো নয়ই, সপ্তদশ ও অষ্টাদশ শতকের প্রবাহপথের সঙ্গেও তাহার মিল নাই। অষ্টাদশ শতকে রেনেলের, সপ্তদশ শতকে ফান ডেন ব্রোকের এবং ষোড়শ শতকে জাও ডি বারোসের নকশায় নদনদীগুলির গতিপথ অনেকটা পরিষ্কার দেখানো হইয়াছে। এই তিন নকশার তুলনামূলক আলোচনা করিয়া পশ্চাৎক্রম অনুসরণ করিলে হয়তো মধ্যযুগপূর্ব বাঙলার নদনদীর চেহারা ধরিতে পারা খানিকটা সহজ হইবে। টলেমির নকশা (দ্বিতীয় শতক) নানা দোষে দুষ্ট, ঐতিহাসিকদের কাছে তাহা অজ্ঞাত নয়। সুতরাং সেই নকশার উপর খুব বেশি নির্ভর করা চলে না; তবু কিছু কিছু ইঙ্গিত পাওয়া একেবারে অসম্ভব না-ও হইতে পারে।
গঙ্গা ভাগীরথী
গঙ্গা ভাগীরথী লইয়াই আলোচনা আরম্ভ করা যাইতে পারে। রাজমহলের সোজা উত্তর পশ্চিমে গঙ্গার তীর প্রায় ঘেষিয়া তেলিগড় ও সিক্রিগলির সংকীর্ণ গিরিবর্ত্ম–বাঙলার প্রবেশপথ। এই পথের প্রবেশদ্বারেই যেন লক্ষ্মণাবতী-গৌড়, পাণ্ডুয়া, টাণ্ডা, রাজমহল মধ্যযুগে বহুদিন একের পর এক বাঙলার রাজধানী ছিল তাহা অনুমান করা কঠিন নয়; সামরিক ও রাষ্ট্ৰীয় কারণেই তাহা প্রয়োজন হইয়াছিল। এই গিরিবর্ত্ম। দুইটি ছাড়িয়া রাজমহলকে স্পর্শ করিয়া গঙ্গা বাঙলার সমতল ভূমিতে আসিয়া প্রবেশ করিয়াছে। ফান ডেন ব্রোকের (১৬৬০) নকশায় দেখিতেছি, রাজমহলের কিঞ্চিৎ দক্ষিণ হইতে আরম্ভ করিয়া, মুর্শিদাবাদ-কাশিমবাজারের মধ্যে গঙ্গার তিনটি দক্ষিণ-বাহিনী শাখার জল কাশিমবাজারের একটু উত্তর হইতে একত্র বাহিত হইয়া সোজা দক্ষিণবাহিনী হইয়া চলিয়া গিয়াছে সমুদ্রে, বর্তমান গঙ্গাসাগর-সংগমতীর্থে। কিঞ্চিদধিক এক শতাব্দী পর রেনেলের নকশায় দেখিতেছি, রাজমহলের দক্ষিণ পূর্বে তিনটি বিভিন্ন শাখা একটি মাত্র শাখায় রূপান্তরিত এবং তাঁহাই (সুতি হইতে গঙ্গাসাগর) দক্ষিণবাহিনী গঙ্গা। যাহাই হউক, রেনেল কিন্তু এই দক্ষিণবাহিনী নদীটিকে গঙ্গা বলিতেছেন না; তিনি গঙ্গা বলিতেছেন। আর একটি প্রবাহকে, যে প্রবাহটি অধিকতর প্রশস্ত, জীবন্ত এবং দুৰ্দম, যেটি পূর্ব দক্ষিণবাহিনী হইয়া বর্তমান বাঙলার হৃদয়দেশের উপর দিয়া তাহাকে দ্বিধাবিভক্ত করিয়া বহু শাখায় বিভক্ত হইয়া সমুদ্রে অবতরণ করিয়াছে, আমরা যাহাকে বলি পদ্মা। ফান ডেন ব্রোক এবং রেনেল দুজনের নকশাতেই দেখিতেছি গঙ্গার সুবিপুল জলধারা বহন করিতেছে পদ্মা; দক্ষিণবাহিনী
