দ্বিতীয়ত, বৃত্তির অপরিবর্তনীয়তা বলে লক্ষণটির ব্যাখ্যাও একই দিক থেকে পাওয়া অসম্ভব নয়। কেননা, ট্রাইব্যাল সমাজের উচ্চতর পর্যায়ে দেখতে পাওয়া যায় এক-একটি ক্লানের মধ্যে এক-একটি বৃত্তি স্থিরনিশ্চয় হয়ে আসবার লক্ষণ(২৬১)। বস্তুত, মধ্যযুগের ইয়োরোপের গিল্ড প্রথার উৎপত্তিতে ট্রাইব্যাল-সমাজের এই বৈশিষ্ট্যটিই ছিলো। অধ্যাপক জর্জ টম্সন(২৬২) লিখছেন,
. . as Gronbech has shown, the guild is descended from the clan. The only structural difference between them is that membership of ihe guild is not determined by birth, except m so far as the son becomes eligible by following his father’s vocation; and even the primitive clan commonly admits strangers by adoption Since the craft clan is a widespread feature of the higher stages of tribal society, there is no difficulty in supposing that it existed in primitive Attica; and even if it did not, at least there existed the primitive clans out of which the craft clans subsequently developed.
অর্থাৎ, গ্রন্বেক্ দেখিয়েছেন, ক্লান থেকেই গিল্ড-এর জন্ম। মধ্যযুগের গিল্ড কারিকর-ক্লানেরই উচ্চতর পর্যায়মাত্র। দু’-এর গড়নে একমাত্র তফাত হলো, গিল্ড-এর অন্তর্ভূক্ত হওয়ার ব্যাপারটা জন্মগত নয়; তবে পিতার বৃত্তি অনুসরণ করে অবশ্য পুত্রও গিল্ডের অন্তর্ভূক্ত হতে পারে। আদিম ক্লানগুলিও বাইরের লোককে প্রায়ই ক্লানের মধ্যে গ্রহণ করে। যেহেতু ট্রাইব্যাল-সমাজের উচ্চতর পর্যায়ে কারিকর-ক্লান বহুলভাবেই চোখে পড়ে সেইহেতু প্রাচীনকালের এ্যাট্টিকাতেও যে তা ছিলো সে-কথা কল্পনা করতে বাধা নেই; আর তা যদি নাও থেকে থাকে তাহলে অন্তত আদিম ক্লান নিশ্চয়ই ছিলো, যা থেকে পরবর্তী সময়ে কারিকর-ক্লানের উৎপত্তি হয়েছে।
কারিকর-ক্লানের বেলায় বৃত্তিটা জন্মগত, মধ্যযুগের ইয়োরোপীয় সামন্ত-সমাজে তা নয়। কিন্তু আমাদের দেশে উৎপাদন পদ্ধতির অগ্রগতি ট্রাইব্যাল-সমাজকে স্বাভাবিকভাবে ধ্বংস করে সামন্ত-সমাজের নতুন ভিত্তি স্থাপন করেনি। ইয়োরোপীয় অর্থে সামন্ত-সমাজ আমাদের দেশে খুব সম্ভব সত্যিই দেখা দেয়নি। তাই ইয়োরোপীয় অর্থে গিল্ডও বোধহয় নয়। আমাদের দেশের সমাজে উচ্চতর পর্যায়ের বৃত্তি-ব্যবস্থাটা ট্রাইব্যাল-সমাজের উচ্চতর পর্যায়ের কারিকর-ক্লানের মতোই প্রধানত জন্মগত ও অলঙ্ঘনীয় হয়ে থেকেছিলো। একেও ট্রাইব্যাল-সমাজের অসম্পূর্ণ বিলোপের পরিণাম মনে করবার অবকাশ আছে।
জাতিভেদ-প্রথার অন্যান্য নানা বৈশিষ্ট্যেরও এই দিক থেকেই ব্যাখ্যা পাওয়া অসম্ভব নয়। যেমন ধরা যায়, একত্রে খাওয়া-দাওয়ার ব্যাপারে বাছ-বিচারের কথা। এর মধ্যেও ট্রাইব্যাল-সমাজেরই ধ্বংসাবশেষ খুঁজে পাওয়া যায়। কেননা, ট্রাইব্যাল-সমাজেও পংক্তিভোজন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার। বস্তুত, রিস্ ডেভিড্স্(২৬৩) স্বীকার করছেন, জাতিভেদ-প্রথার বিবাহভিত্তিমূলক লক্ষণটির মতোই পংক্তিভোজন সংক্রান্ত এই লক্ষণটিতেও প্রাচীন সমাজেরই স্বাক্ষর রয়েছে।
আগেই বলেছি, আধুনিক অনেক লেখকদের রচনাতেই এ-কথা স্বীকৃত হতে দেখা যায় যে, ট্রাইব্যাল-সংগঠন-এর বৈশিষ্ট্য থেকেই জাতিভেদ-প্রথার বৈশিষ্ট্যগুলির উৎপত্তি হয়েছে। এদিক থেকে, এমিএল সেনা-র(২৬৪) রচনাই বোধহয় সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য—বিশেষ করে এই কারণে যে জাতিভেদ-প্রথার বৈশিষ্ট্য-ব্যাখ্যায় তিনিও ওই বিবাহ-বিধিমূলক লক্ষণটির উপরই সবচেয়ে বেশি জোর দিয়েছেন। কিন্তু ট্রাইব্যাল-সংগঠন থেকে ঠিক কীভাবে জাতিভেদ-প্রথার উৎপত্তি হয়েছে এ-প্রশ্নের মীমাংসা এখনো হয়নি। অথচ, এই প্রশ্নটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। কেননা, আদিতে ট্রাইব্যাল-সমাজ শুধু আমাদের দেশেই ছিলো না; সবদেশেই এবং অনিবার্যভাবেই ছিলো। কিন্তু জাতিভেদ-প্রথা অন্যান্য দেশে দেখা যায় না। তাই একে ট্রাইব্যাল-সমাজের স্বাভাবিক পরিণাম বলে মনে করবার সুযোগও সত্যিই নেই।
এখানে বিশেষ করে আর একটি বিষয়ের দিকে নজর রাখতে হবে। ট্রাইব্যাল-সমাজের পরিপ্রেক্ষিতে ট্রাইব্যাল-সমাজের ব্যবস্থাগুলি ছিলো উদ্দেশ্যমূলক—এগুলি মানুষকে বাঁচাতে সাহায্য করেছে। কিন্তু এই ব্যবস্থাগুলিই জাতিভেদ-প্রথার বৈশিষ্ট্য হিসেবে রূপান্তরিত হবার পর হয়ে দাঁড়িয়েছে জীবনের পরিপন্থী,—বাচবার পথে সবচেয়ে বড়ো বাধা। জাতিভেদ-প্রথাটি আমাদের জাতীয়-জীবনের পথে যে কী প্রচণ্ড বাধার রূপ ধারণ করেছিলো তা বিশদভাবে ব্যাখ্যা করবার প্রয়োজন নেই; এ-বিষয়ে দেশপ্রেমিকদের সহস্র উক্তি এবং আমাদের মতো সাধারণ দেশবাসীদের তিক্ততম অভিজ্ঞতা রয়েছে(২৬৫)। মার্ক্স্(২৬৬) বলেছিলেন, ভারতবর্ষের উন্নতি ও শক্তিলাভের পথে সবচেয়ে বড়ো বাধা হলো এই জাতিভেদ-প্রথা এবং দেশে উৎপাদন-পদ্ধতির উন্নততর পর্যায়ের প্রচলনই এই চূড়ান্ত বাধাটিকে ভাঙতে পারবে :
Modern industry, resulting from the railway system, will dissolve he hereditary division of labour, upon which rest the Indian castes, those decisive impediments to Indian progress and Indian power.
অর্থাৎ, রেল-ব্যবস্থা প্রসূত আধুনিক শ্রমশিল্প জন্মগত শ্রমবিভাগকে বিনষ্ট করবে; এই শ্রমবিভাগের উপরই প্রতিষ্ঠিত হলো ভারতবর্ষের উন্নতির ও শক্তিলাভের পথে চূড়ান্ত বাধাস্বরূপ জাতিভেদ-প্রথা।
আমাদের যুকি হলো, ট্রাইব্যাল-সমাজের বৈশিষ্ট্যগুলি ট্রাইব্যাল-সমাজের প্রাণশক্তি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে বিরুদ্ধে পরিবেশে গ্রথিত হলে পর আদি-তাৎপর্যের দিক থেকে সেগুলি বিপরীতে পর্যবসিত হতে বাধ্য হয়। এককালে যা-ছিলো উদ্দেশ্যমূলক, তাই হয়ে দাঁড়ায় উদ্দেশ্য-বিরোধী। এবং এই কারণেই আমরা বলতে চাই, জাতিভেদ-প্রথা নিয়ে যাঁরা গবেষনা করছেন তাদের পক্ষে ট্রাইব্যাল-সমাজ, সে-সমাজের বৈশিষ্ট্য, এবং এই বৈশিষ্ট্যগুলির আদি-তাৎপর্য সংক্রান্ত স্পষ্ট জ্ঞান থাকা দরকার।
