২। গোত্রান্তর্গত সকলেরই পূর্বপুরুষ এক। পাণিনি(২৫১) বলছেন, “অপত্যং পৌত্রপ্রভৃতি গোত্রম্”। কথাটাকে আর একটু সরল করবার জন্যে ব্যাখ্যাকার(২৫২) বলছেন, “জনস্য পৌত্র-প্রপৌত্র-বৃদ্ধপ্রপৌত্রাদি অন্তরাপত্যং গোত্রম্ উচ্যতে। গোরাপত্যম্ অন্তরাপত্যম্ ব্যবহিতাপত্যম্ পৌত্র-প্রপৌত্র-বৃদ্ধপ্রপৌত্র-প্রভৃতিকম্ ইতি যাবৎ।…অনন্তরাপত্যম্ অব্যবহিতাপত্যং পুত্রঃ কন্যা চ উচ্যতে”। গোত্রান্তর্গত সকলে একই পূর্বপুরুষের বংশধর।
৩। গোত্রনামগুলির মূলে টোটেম্-বিশ্বাসের পরিচয়। পুরোনো পুঁথিপত্রে বহু গোত্রের নাম পাওয়া যায় এবং বৌধায়ন-এর রচনা(২৫৩) থেকেই বোঝা যায় এককালে সত্যিই প্রায় অসংখ্য গোত্র ছিলো। এই নামগুলি প্রায়ই জন্তু-জানোয়ার বা গাছগাছড়ার নাম থেকে এসেছে, তাই এগুলি যে আদিতে টোটেম-বিশ্বাসের সঙ্গে সংযুক্ত ছিলো সে-বিষয়ে সন্দেহ নেই। ব্রাহ্মণাদি উচ্চ-বর্ণেরই অন্তর্গত কয়েকটি বিখ্যাত গোত্রনামের নমুনা দেখা যাক : ভরদ্বাজ (ভরত পাখি থেকে), গোতম (গোরু থেকে), কাশ্যপ (কাছিম থেকে), শুনক (কুকুর থেকে), মৌদ্গল্য (মাগুর মাছ থেকে), কৌশিক (পেঁচা থেকে), শাণ্ডিল্য (পাখি থেকে), বাৎস (বাছুর থেকে), মাণ্ডুকেয় (ব্যাঙ থেকে), দার্ভায়ন (দূর্বাঘাস থেকে), তৈত্তিরীয় (তিতির পাখি থেকে),—ইত্যাদি ইত্যাদি(২৫৪)। অবশ্যই, পরবর্তী যুগে রচিত মতবাদের দরুন গোত্রগুলির এই টোটেমিক উৎসের কথাটা অনেকাংশেই ঢাকা পড়ে গিয়েছে—তখন থেকে কশ্যপ প্রমুখকে কল্পনা করা হয়েছে কোনো-এক আদি-ঋষি হিসেবেই,—কাশ্যপ গোত্রের সকলেই যেন সেই ঋষিটির বংশধর। কিন্তু এ-কল্পনা যে কৃত্রিম ও অর্বাচীন তা দেখতে পাওয়া কঠিন নয় : ওই ধরনের নাম শুধুমাত্র উচ্চবর্ণের মধ্যে চোখে পড়ে না, আজো আমাদের দেশের ট্রাইব্যাল ও আধা-ট্রাইব্যাল সমাজের মধ্যে ক্লান-নাম ও গোত্রনাম হিসেবেই টিকে আছে(২৫৫)। রিজলি তাঁর ভারতবর্ষের মানুষ সম্বন্ধে বিখ্যাত বইটিতে ফর্দ করে দিয়েছেন, আমাদের দেশের পিছিয়ে-পড়ে-থাকা মানুষদের মধ্যে কতো গোত্রনামের উৎস জন্তু-জানোয়ার বা গাছগাছড়ার নাম থেকে। বৌধায়ন প্রমুখের গ্রন্থেও সেকালের অজস্র গোত্রনামের পরিচয় পাওয়া যায়(২৫৬)। এই দুটি ফর্দকে পাশাপাশি রেখে তুলনা করে দেখলে গোত্র-ব্যবস্থার উৎপত্তি-সংক্রান্ত সমস্যার উপর আলোকপাত হতে পারে।
গোত্র প্রসঙ্গে প্রধানত তিনটি বৈশিষ্ট্যের উল্লেখ করা গেলো। এই বৈশিষ্ট্যগুলির দিকে লক্ষ্য রাখলে এ-বিষয়ে কোনো সন্দেহই থাকে না যে, এমন কি উচ্চ-জাতি বা উচ্চ-বর্ণের বেলাতেও ট্রাইব্যাল-সমাজের ক্লান বা গেন্স্ নামের ছোটোছোটো মানবগোষ্ঠীগুলি থেকেই এই গোত্রগুলির উৎপত্তি হয়েছিলো। আধুনিক লেখকদের মধ্যে অনেকেই প্রায় বাধ্য হয়ে ‘গোত্র’ কথাটির প্রতিশব্দ হিসেবে ক্লান শব্দই ব্যবহার করে থাকেন(২৫৭)। কিন্তু ঠিক এই কারণেই ট্রাইব্যাল-ধরনের-জাত (caste of the tribal type) নাম দিয়ে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র প্রকারের কোনো জাতের কথা কল্পনা না করে বরং অনুমান করা উচিত যে, দেশের ওই পিছিয়ে-পড়া মানুষগুলির মধ্যে জাত-সংগঠন সংক্রান্ত যে-কথা অমন স্পষ্টভাবে দেখতে পাওয়া যাচ্ছে সেই কথাটিকেই মূলসূত্র হিসেবে ব্যবহার করে উচ্চ-বর্ণগুলির মধ্যে জাতিভেদ-প্রথা সংক্রান্ত যে-কথা জটিল, অস্পষ্ট ও আব্ছা হয়ে রয়েছে তা বোঝবার অবকাশ সত্যিই আছে। অথচ, সমাজের নিচু-মহলের মানুষগুলির কাছ থেকে মূলসূত্র পেয়ে উঁচু-মহলের মানুষগুলির মধ্যে একই প্রথার রহস্য বোধবার চেষ্টা সাধারণত করা হয় না। তাই, বৌদ্ধ-যুগের ভারতবর্ষে জাতিভেদ-প্রথার রূপটিকে বিশ্লেষণ করবার সময় রিচার্ড ফিক্-এর(২৫৮) মতো বিদ্বানও যদিও স্পষ্টই দেখছেন, নিচু-মহলের মানুষ-গুলির বেলায়—জাতকের গল্পে যাদের হীনজাতীয় বা হীন-সিপ্পনি বলা হয়েছে—জাতিব্যবস্থাটা ট্রাইব্যাল ব্যবস্থামাত্রই, তবুও তিনি উচ্চ-বর্ণগুলির বেলায় স্বতন্ত্র ধরনের মূলসূত্র অনুসরণ করে জাতিভেদপ্রথার রহস্য-উদ্ঘাটন করবার চেষ্টা করেছেন।
অবশ্যই আপত্তি উঠবে, জাতিভেদ-প্রথার আলোচনায় শুধুমাত্র এই বিবাহ-ব্যবস্থার উপর দৃষ্টি রাখলে সে-আলোচনা একপেশে এবং অসম্পূর্ণ হবে। কেননা, বিবাহ-ব্যবস্থা যদিও জাতিভেদ-প্রথার একটি মূল-বৈশিষ্ট্য তবুও তার আর একটি বৈশিষ্ট্য হলো বৃত্তি বা পেশার অপরিবর্তনীয়তা। এরই দরুন, কথার কাজ হিসেবে জাত-ব্যবসায় কথাটির উৎপত্তি হয়েছে। অর্থাৎ, জাতিভেদ-প্রথার আর একটি মূল লক্ষণ হলো, কেউই জন্মগত পেশা ছেড়ে অন্য পেশা গ্রহণ করতে পারবে না।
উত্তরে বলা যায়, প্রথমত, বৃত্তির অপরিবর্তনীয়তা জাতিভেদ-প্রথার একটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ হলেও বিবাহ-প্রথার মতো মৌলিক লক্ষণ নয়। ফিক্(২৫৯) প্রমুখ পণ্ডিতেরাই দেখাচ্ছেন, বৃত্তির অপরিবর্তনীয়তা সেকালের সম্পূর্ণ অলঙ্ঘনীয় ছিলো না, একালেও নয়। তাছাড়া, জৈনদের মধ্যেও জাতিভেদ-প্রথা আছে, কিন্তু তার বৈশিষ্ট্য হিসেবে বৃত্তির অলঙ্ঘনীয়তা চোখে পড়ে না(২৬০); তার বদলে প্রধানতম বৈশিষ্ট্য হিসেবে ওই বিবাহ-ব্যবস্থাই দেখা যায়। তাই উভয়-বৈশিষ্ট্যের মধ্যে বিবাহ-বিধিকেই তুলনায় বেশি মৌলিক মনে করা যেতে পারে।
