অবশ্যই, কোনো-কোনো লেখক স্বীকার করছেন, দেশের পিছিয়ে-পড়া মানুষগুলির মধ্যে জাতিভেদ-প্রথার যে পরিচয় তা ট্রাইব্যাল-সংগঠনেরই রূপান্তর মাত্র। এমনকি caste of the tribal type
(!) বা ট্রাইব্যাল-ধরনের জাত বলে শব্দ ব্যবহারও চোখে পড়ে(২৪৫) :
…there are totemistic clans which are found amongst the castes of the tribal type. The totem is some animal or vegitable formerly held in reverence by the members of the clan and associated with some taboo; but by the time a tribe has developed into a caste, the origin of the name has generally been forgotton, and the same itself transformed.
অর্থাত, ট্রাইব-ধরনের জাতগুলির মধ্যে টোটেম্-বিশ্বাসমূলক ক্লান রয়েছে। ক্লানের সভ্যরা যে-জন্তু বা গাছগাছড়াকে আগে শ্রদ্ধা করতো এবং যেগুলির সঙ্গে কিছু কিছু নিষেধের সম্পর্ক ছিলো সেইগুলিই হলো টোটেম্। কিন্তু একটি ট্রাইব উন্নত হতে হতে জাত-এ পরিণত হবার পর এই টোটেম্-মূলক নামটির উৎস সাধারণত বিস্মৃত হয় এবং নামটি বদলে যায়।
এই ধরনের মতবাদের বিরুদ্ধে নানান আপত্তি ওঠে।
প্রথমত, এখানে caste of the tribal type বা ট্রাইব্যাল-ধরনের জাত বলে এক রকম বিশিষ্ট জাতের কথা বলা হচ্ছে। আর ধরেই নেওয়া হচ্ছে যে, যে-কথা বা যে-বৈশিষ্ট্য এই নির্দিষ্ট জাতগুলি সম্বন্ধে প্রযোজ্য তা থেকে সাধারণভাবে জাতিভেদ-প্রথার রহস্য বোঝবার চেষ্টাটা সঙ্গত হবে না। এবং এই ইঙ্গিতটিই হলো আলোচ্য মন্তব্যের প্রধান দুর্বলতা। কেননা, দেশের ওই পিছিয়ে-পড়া মানুষগুলির মধ্যে ট্রাইব্যাল-সংগঠন ও জাত-সংগঠনের সীমারেখা অস্পষ্ট বলেই বা জাতিভেদ-প্রথাটি অন্যান্য ক্ষেত্রে যে-রকম কঠিনভাবে দানা বেঁধেছে ও একেবারে স্বতন্ত্র একটি প্রথার রূপ পেয়েছে তার অভাব বলেই,—এইখান থেকে মূলসূত্র পেয়ে জাতিভেদ-প্রথার অন্যান্য দৃষ্টান্তগুলিকে বোঝবার সম্ভাবনা সত্যিই রয়েছে।
দ্বিতীয়ত, লেখন বলছেন by the time a tribe has developed into a caste, ইত্যাদি। এ-কথার তাৎপর্য ঠিক কী? লেখক কি সাধারণ নিয়ম হিসেবে ট্রাইবের পক্ষে কাস্ট-এ পরিণত হবার কথা বলেছেন? কিন্তু যদি এটা সমাজ-বিকাশের কোনো সাধারণ নিয়মই হয় তাহলে অন্যান্য দেশের ক্ষেত্রেও জাত-প্রথা দেখা দেয়নি কেন?
এই তথাকথিত ট্রাইব্যাল ধরনের জাত-গুলির বৈশিষ্ট্য বিচার করেই যে উচ্চ-বর্ণগুলির রহস্য অনুসন্ধান করবার অবকাশ আছে তার নমুনা উল্লেখ করা যায়। উক্তি জাতগুলির প্রধান বৈশিষ্ট্য হিসেবে কয়েকটি বিষয়ের দিকে আমাদের দৃষ্টি আকৃষ্ট হওয়ার দরকার : ১) প্রত্যেকটি জাতের মধ্যে ছোটোছোটো কয়েকটি করে গোষ্ঠী রয়েছে। ২) এই গোষ্ঠীগুলি বহির্বিবাহমূলক বা exogamous : গোষ্ঠীর অন্তর্গত কেউই অপর কাউরে বিয়ে করতে পারবে না। ৩) গোষ্ঠীগুলির নামকরনের মধ্যে টোটেম্-বিশ্বাসের চিহ্ন থেকে গিয়েছে।
ব্রাহ্মণাদি উচ্চ-বর্ণের মধ্যেও ছোটো ছোটো গোষ্ঠী রয়েছে। এগুলিকে বলা হয় গোত্র। গোত্র মানে ঠিক কী, তা নির্ণয় করবার জন্য আধুনিক বিদ্বানেরা বহু গবেষণা করেছেন(২৪৬) এবং এ-বিষয়েও কোনো সন্দেহ নেই যে, এখনো অনেক গবেষণা বাকি আছে। কিন্তু গবেষক যদি ট্রাইব্যাল-সমাজ সম্বন্ধে সাধারণভাবে জানতে-পারা জ্ঞানের উপর নির্ভর করে এগোতে রাজি না হন তাহলে তাঁর পক্ষে অজস্র উক্তির জটিলতায় দিক্ভ্রান্ত হবার সম্ভাবনা থাকে। কেননা, “বৌধায়ন, আপস্তন্ব, সত্যাষাঢ়, কুটিল, ভরদ্বাজ, লৌগাক্ষি, কাত্যায়ন ও আশ্বলায়ন প্রভৃতি রচিত শৌতসূত্রে, মৎস্যপুরাণে, ভারতাদি ইতিহাসে ও মনু প্রভৃতি প্রণীত স্মৃতিসমূহে অল্পবিস্তর গোত্রের বিবরণ আছে, কিন্তু ইহার অনেক স্থলেই এক গ্রন্থের সহিত অপর গ্রন্থের বিরোধ বা মতভেদ দেখিতে পাওয়া যায়, সাধারণে সহজে তাহার প্রকৃত অর্থ গ্রহণ করতে পারে না”(২৪৭)। এবং, পুরুষোত্তমের গোত্রপ্রবরমঞ্জরী, ধনঞ্জয়ের ধর্মপ্রদীপ, বালম্ভট্ট ও মহাদেবদৈবজ্ঞের গোত্রপ্রবর, বিষ্ণুপণ্ডিতের গোত্রপ্রবরদীপ, অনন্তদেব, আপদেব, কেশব, জীবদেব, নারায়ণভট্ট, ভট্টোজি, মাধবাচার্য ও বিশ্বনাথদেব রচিত গোত্রপ্রবর নির্ণয়, লক্ষনণভট্টের প্রবররত্ন, গোত্রপ্রবরভাস্কর এবং কমলাকরের গোত্রপ্রবরদর্পণ প্রভৃতি গ্রন্থও(২৪৮) গবেষকের জটিলতা-বোধ দূর করতে পারবে না; কেননা, অনেক পরের যুগে রচিত বলেই এই গ্রন্থগুলির মূল চেষ্টা হলো পরের যুগের সমাজব্যবস্থাকে ও শাসনব্যবস্থাকে ন্যায়সঙ্গত বলে প্রতিপন্ন করা(২৪৯)।
অতএব ভেবে দেখা যাক, ট্রাইব্যাল-সংগঠন সম্বন্ধে সাধারণভাবে জানতে-পারা তথ্যের দিক থেকে গোত্র-র মূল লক্ষণগুলি বিচার করে গোত্র-ব্যবস্থার উৎস সম্বন্ধে কোনো কথা অনুমান করা যায় কি না।
১। সগোত্র বিবাহ নিষেধ : “মনু প্রভৃতি স্মৃতি-প্রণেতাগণ, বৌধায়ণ, আপস্তম্ব প্রভৃতি সূত্রকারগণ ও মৎস্য প্রভৃতি পুরাণকার সকলেই সগোত্র-বিবাহ নিষেধ করিয়াছেন। ভ্রান্তি অথবা অপর কোনো কারণে সগোত্রে বিবাহ করিলে যথানিয়মে প্রায়শ্চিত্ত করিতে হয়, প্রায়শ্চিত্তের পরে সেই স্ত্রীর সহিত মাতার ন্যায় ব্যবহার করিবে। কখনও তাহাকে গ্রহণ করিবে না, এবং সেই স্ত্রীও তাহাকে আপন সন্তানের ন্যায় দেখিবে।”(২৫০)
