ট্রাইব্যাল-সমাজে বিবাহ-পদ্ধতি সংক্রান্ত আইন-কানুনই সবচেয়ে অমোঘ(২৪০)। বিবাহ-সংক্রান্ত আইন বলতে প্রধানত হলো : ক্লানের ভিতর কাউকে বিয়া করা চলবে না। বিয়ে করতে হবে ক্লানের বাইরে। ভালুক-ক্লানের কেউই ভালুক-ক্লানের কাউরে বিয়ে করতে পারবে না—বিয়ে করতে হবে ভালুক-ক্লানের বাইরে (clan-exogamy)(২৪১).
ট্রাইব্যাল-সমাজের শাসন-পদ্ধতির মূল কথা হলো, পঞ্চায়েৎ বা council। ক্লানের পঞ্চায়েৎ-এ ক্লানের বয়ঃপ্রাপ্ত সকলে একসঙ্গে বসে সিদ্ধান্তে আসবে, প্রত্যেক ক্লানের নির্বাচিত প্রতিনিধি নিয়ে (ফ্রাত্রি-পঞ্চায়েৎ এবং) ট্রাইবের পঞ্চায়েৎ বসবে, প্রতিনিধিদের কাজকর্ম সন্তোষজনক না হলে তাদের প্রতিনিধিত্ব খারিজ করে নতুন প্রতিনিধি নির্বাচন করা হবে(২৪২)। এই ব্যবস্থার দরুনই ট্রাইব্যাল-সমাজে গণতন্ত্রের অমন চূড়ান্ত নিদর্শন এবং, আমরা আগেই আলোচনা করেছি, আমাদের দেশের পুরোনো পুঁথিপত্রে উল্লেখিত গণসমাজের ওই চূড়ান্ত গণতান্ত্রিক আয়োজন দেখেই আধুনিক ঐতিহাসিকেরা এগুলিকে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র বলে ভুল করেছেন।
এবার দেখা যাক, জাতিভেদ-প্রথার মধ্যে ট্রাইব্যাল-সমাজের এই দুটি বৈশিষ্ট্য কী রকম স্পষ্টভাবে টিকে রয়েছে। প্রথমে আমাদের দেশের পিছিয়ে-পড়া মানুষগুলির মধ্যে জাত-প্রথা বা caste-system-এর কথা তোলা যাক, তারপর উচ্চ-বর্ণের প্রসঙ্গে ফেরা যাবে।
পিছিয়ে-পড়া মানুষদের ব্যাপারের রাসেল ও হীরালালের রচনা থেকে উদ্ধৃতি দৃষ্টান্তগুলিরই বিশ্লেষণ করা যাক। অহীর এবং অন্ধ্ নামের য-দুটি জাতের (caste-এর) উল্লেখ করা হয়েছে সে-দুটির মধ্যে প্রথমটির সংগঠন হুবহু মর্গান-বর্ণিত মোহক আর ওনেইডা ট্রাইবের মতোই—এগুলির ক্ষেত্রে ফ্রাত্রি বলে অন্তর্বর্তী বিভাগের পরিচয় নেই, তার বদলে ট্রাইবটি কয়েকটা জন্তু-জানোয়ারের নামধারী ও বহির্বিহাব-মূলক বা exogamous গোষ্ঠীতে বিভক্ত। রাসেল ও হীরালাল-বর্ণিত অন্ধ্ বলে জাতটির সংগঠন হুবহু মর্গান-বর্ণিত সেনেকা বা কেউগা ট্রাইবেরই মতো—ট্রাইবটি প্রথমত দুটি বড়ো ভাগে (ফ্রাত্রি) বিভক্ত এবং প্রত্যেকটি বড়ো ভাগের অন্তর্গত রয়েছে জানোয়ারের-নামধারী বহির্বিবাহ-ভিত্তিক কয়েকটি ছোটোছোটো গোষ্ঠী :
সেনেকা
- ক
- ভালুক
- নেকড়ে
- বীবর
- কাছিম
- খ
- হরিণ
- কাদাখোঁচা
- বক
- বাজ
(ভালুক-গোষ্ঠীর কারুর সঙ্গে ভালুক গোষ্ঠীর কারুর বিয়ে হবে না।)
অন্ধ্
- ক
- বেড়াল
- শুয়োর
- খ
- তিরির
- ইত্যাদি
(বেড়াল গোষ্ঠীর কারুর সঙ্গে বেড়াল-গোষ্ঠির কারুর বিয়ে হবে না।)
জাতভেদ-প্রথার উৎপত্তিতে যে ঠিক কী তা এই তুলনা থেকেই আন্দাজ করা যায় এবং এই থেকেই বুঝতে পারা যায় ভারতবর্ষের পিছিয়ে-পড়া মানুষগুলির মধ্যে জাতিভেদ-প্রথার (caste-system-এর) বর্ণনা দেবার সময় বর্ণনাদাতারা কেন অমন সরাসরি ট্রাইব্যাল-সমাজ-বর্ণনার পরিভাষা ব্যবহার করে থাকেন।
ওই পিছিয়ে-পড়া মানুষগুলির মধ্যে জাতিভেদ-প্রথায় শুধুই যে ট্রাইব্যাল-সমাজের বিবাহ পদ্ধতির পরিচয় টিকে রয়েছে তাই নয়; অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় এমনকি ট্রাইব্যাল-সমাজের শাসন-ব্যবস্থার বা পঞ্চায়েৎ প্রথারও প্রায় পূর্ণাঙ্গ স্বাক্ষর থেকে গিয়েছে(২৪৩) :
Caste discipline is maintained by the members of the community through their recognized leaders…Sometimes they hold offices with well-defined duties, but usually among the functional castes, they form a standing committee, or panchayat which deals with all branched of caste-discipline and other matters affecting the community. The decisions of the panchayat are final and their authority is unquestioned. Minor breaches of caste-rules and restrictions can be expiated by a ceremony of purification and a feast to the fraternity : but for more serious offenses, or for contumacy, the penalty is excommunications. A man against whom this sentence has been pronounced is cut off from all intercourse with his caste-fellows, who will neither eat nor smoke nor associate with him; he is shunned as a leper, and his life is made so miserable that be soon becomes eager to accept any conditions that may be imposed upon him. Should his offence be too heinous to permit of atonement, he is driven to seek admission o some lower caste, or to become a Mohammedan, or to hide himself in the towns, there the trammels of the caste system are weaker and less irksome than in the villages.
অর্থাৎ সংক্ষেপে, সাধারণত জাত-এর আভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা ও শাসনের দায়িত্ব থাকে একটি করে স্থায়ী পঞ্চায়েৎ-এর উপর। এই পঞ্চায়েৎ-এর সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত এবং অলঙ্ঘনীয়। ছোটোখাটো দোষত্রুটির প্রতিকার হিসেবে হয়তো প্রায়শ্চিত্ত ও জ্ঞাতিভোজনই পর্যাপ্ত; কিন্তু যদি মারাত্মক হয় তাহলে পঞ্চায়েৎ বহিস্কারের নির্দেশ দেয়। এইভাবে কেউ জ্ঞাতিচ্যুত বা জাতি-বহিষ্কৃত হলে তার সঙ্গে জাতের বাকি কেউ আর কোনো রকম সম্পর্ক রাখে না এবং ব্যক্তিটির ত্রুটি যদি একেবারেই অমার্জনীয় হয় তাহলে শেষ পর্যন্ত অন্য কোনো নীচ জাতের মধ্যে স্থান নিতে সে বাধ্য হয়,—বা হয়তো, সে ধর্মান্তর গ্রহণ করতে বাধ্য হয়; বা গ্রাম ছেড়ে শহরে—যেখানে জাতের শাসন অপেক্ষাকৃত কম কঠোর,—পালাতে বাধ্য হয়।
আমাদের যুক্তি হলো, এই শাসন-ব্যবস্থা ও শাস্তি-ব্যবস্থা উভয়ের মধ্যেই ট্রাইব্যাল-সমাজের শাসন-ব্যবস্থা ও শাস্তি-ব্যবস্থার অভ্রান্ত ভগ্নাবশেষ দেখতে পাওয়া যায়(২৪৪)। তাই, এদিক থেকেও জাত-ব্যবস্থাকে (caste-system-কে) ট্রাইব্যাল-সমাজের অসমাপ্ত বিলোপের পরিচায়ক বলে অনুমান করবার সুযোগ রয়েছে।
